Green Hero: ‘গাছ লাগাই না, গাছ বাঁচাই’! ৮ বছরের নিরলস লড়াইয়ে গুসকরার শিক্ষকই আজ বাংলার আসল সবুজ সৈনিক

পূর্ব বর্ধমানের গুসকরার শিক্ষক বিশ্বজিৎ মৈত্র গত ৮ বছর ধরে পাঁচ হাজারেরও বেশি গাছ রোপণ ও সংরক্ষণ করেছেন। পরিবেশ রক্ষায় তাঁর অনন্য উদ্যোগের গল্প জানুন বিস্তারিত।

পরিবেশ দিবসে যখন চারদিকে গাছ লাগানোর বার্তা শোনা যায়, তখন পূর্ব বর্ধমানের এক শিক্ষক নীরবে দেখিয়ে চলেছেন অন্য এক পথ। তাঁর বিশ্বাস, শুধু চারা রোপণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না, বরং সেই গাছকে বাঁচিয়ে রাখাটাই সবচেয়ে বড় কাজ। সেই ভাবনা নিয়েই বছরের পর বছর ধরে সবুজ রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন গুসকরার শিক্ষক বিশ্বজিৎ মৈত্র।

শিক্ষকতার পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষার ব্রত

বিশ্বজিৎ মৈত্র দীর্ঘ ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে তিনি দিগনগর হাটতলা সিলভার জুবিলী ইনস্টিটিউশনে শিক্ষকতা করছেন। তবে স্কুলের গণ্ডির বাইরেও তাঁর আরেকটি পরিচয় রয়েছে। আউশগ্রাম জঙ্গলমহল এলাকায় তিনি পরিচিত ‘গাছ পাগল’ নামে। একসময় যে নাম ব্যঙ্গের প্রতীক ছিল, আজ সেটিই সম্মানের পরিচয় হয়ে উঠেছে।

‘আমি গাছ লাগাই না, গাছ বাঁচাই’

বিশ্বজিৎবাবুর দর্শন অন্যদের থেকে আলাদা। তিনি মনে করেন, গাছ লাগিয়ে ছবি তুলে চলে যাওয়া পরিবেশ রক্ষার প্রকৃত কাজ নয়। তাঁর কথায়, “আমি গাছ লাগাই না, গাছ বাঁচাই।” তাই চারা রোপণের পরও দীর্ঘদিন ধরে তার পরিচর্যা, জল দেওয়া, সুরক্ষাব্যবস্থা তৈরি করা এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যান তিনি। যতদিন না গাছ নিজের শক্তিতে দাঁড়াতে পারে, ততদিন তার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন।

পাঁচ হাজারেরও বেশি গাছের অভিভাবক

গত কয়েক বছরে তাঁর উদ্যোগে পাঁচ হাজারেরও বেশি গাছ রোপণ ও সংরক্ষণ করা হয়েছে। বট, অশ্বত্থ, নিম, মেহগনি, কৃষ্ণচূড়া, কদম, ছাতিম, শাল, জাম ও আম-সহ নানা প্রজাতির গাছ তিনি লাগিয়েছেন। গাছের সুরক্ষার জন্য সবসময় তাঁর সঙ্গে থাকে সাবল, হাতুড়ি, পেরেক, বাঁশ, নেট ও কঞ্চির মতো প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম।

নিজের নার্সারি, বিনামূল্যে চারা বিতরণ

পরিবেশ রক্ষার কাজকে আরও সংগঠিত করতে তিনি নিজেই একটি নার্সারি গড়ে তুলেছেন। সেখানে সবসময় প্রায় দুই হাজার চারা মজুত থাকে। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, ক্লাব এবং পরিবেশপ্রেমীরা তাঁর কাছ থেকে বিনামূল্যে চারা সংগ্রহ করেন। আউশগ্রাম, মঙ্গলকোট, ভাতার, গলসি-সহ পূর্ব বর্ধমানের বিস্তীর্ণ এলাকায় আজ তাঁর হাতে গড়া সবুজের ছাপ স্পষ্ট।

উপহাস থেকে সম্মান—এক দীর্ঘ যাত্রা

এই পথ মোটেও সহজ ছিল না। শুরুতে বহু মানুষের কটাক্ষ, বিদ্রূপ ও উপহাস সহ্য করতে হয়েছে তাঁকে। অনেকেই তাঁকে ‘গাছ পাগল’ বলে ঠাট্টা করতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলেছে। আজ এলাকার মানুষ তাঁর কাজের প্রশংসা করেন। সহকর্মীরাও আর্থিক সাহায্য এবং গাছ সংরক্ষণের সামগ্রী দিয়ে পাশে দাঁড়ান।

জলবায়ু সংকটের সময়ে এক অনুপ্রেরণার নাম

বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণ বিশ্বজুড়ে বড় উদ্বেগের কারণ। এমন সময় বিশ্বজিৎ মৈত্রের মতো মানুষের উদ্যোগ প্রমাণ করে, একজন সচেতন নাগরিকও সমাজে বড় পরিবর্তন আনতে পারেন। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা শুধু গাছ বাঁচাচ্ছে না, পরিবেশ সচেতনতারও এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তৈরি করছে।

পেশায় শিক্ষক, নেশায় পরিবেশরক্ষক। পূর্ব বর্ধমানের গুসকরার বাসিন্দা বিশ্বজিৎ মৈত্র গত আট বছর ধরে নিরলসভাবে গাছ রোপণ ও পরিচর্যার কাজে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। শুধু গাছ লাগানো নয়, সেই গাছকে বড় করে তোলাই তাঁর মূল লক্ষ্য। ইতিমধ্যেই তাঁর উদ্যোগে পাঁচ হাজারেরও বেশি গাছ রোপণ ও সংরক্ষিত হয়েছে, যা তাঁকে এলাকায় ‘গ্রিন হিরো’ হিসেবে পরিচিতি এনে দিয়েছে।

Leave a comment