রেললাইনে ছেড়ে দেওয়া হল কুনকি হাতি! ‘লাইভ টেস্ট’-এ পাশ অত্যাধুনিক IDS, ডুয়ার্সে গজরাজ বাঁচাতে বড় সাফল্য

ডুয়ার্সের রেললাইনে হাতির মৃত্যু রুখতে বসানো IDS-এর কার্যকারিতা যাচাইয়ে কুনকি হাতি দিয়ে লাইভ পরীক্ষা চালাল বনদফতর। হাতি লাইনে উঠতেই মিলল সতর্কবার্তা। জানুন পুরো ঘটনা।

একদিকে ঘন জঙ্গল, অন্যদিকে সেই জঙ্গল চিরে চলে যাওয়া রেললাইন। ডুয়ার্সের এই রেলপথে ট্রেনের ধাক্কায় হাতি-সহ বন্যপ্রাণীর মৃত্যুর ঘটনা দীর্ঘদিনের উদ্বেগের কারণ। এবার সেই সমস্যা মোকাবিলায় প্রযুক্তির সাহায্য নিচ্ছে রেল ও বনদফতর। লাটাগুড়ি থেকে বড়দিঘি পর্যন্ত রেললাইনে বসানো হয়েছে অত্যাধুনিক ইনট্রুশন ডিটেকশন সিস্টেম (IDS)। কিন্তু যন্ত্রটি আদৌ ঠিকমতো কাজ করছে কি না, তা নিশ্চিত করতে এবার কুনকি হাতিকে সামনে রেখেই করা হল ‘লাইভ টেস্ট’। আর সেই পরীক্ষায় মিলেছে আশাব্যঞ্জক ফল।

কুনকি হাতি দিয়ে কীভাবে হল পরীক্ষা?

ডুয়ার্সের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাওয়া রেললাইনে হাতির আনাগোনা নতুন কিছু নয়। ফলে শুধু যন্ত্র বসিয়ে রাখলেই হবে না, সেটি বাস্তবে কোনও হাতির উপস্থিতি শনাক্ত করতে পারছে কি না, তা পরীক্ষা করাও জরুরি।এই কারণেই বনদফতরের পক্ষ থেকে কুনকি হাতিকে রেললাইন পার করিয়ে IDS-এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় দেখা যায়, হাতি রেললাইনের নির্দিষ্ট এলাকায় প্রবেশ করতেই সিস্টেম থেকে সতর্কবার্তা পাওয়া যাচ্ছে।অর্থাৎ, বাস্তবে হাতির গতিবিধি শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে অত্যাধুনিক এই প্রযুক্তি। ফলে ভবিষ্যতে বন্য হাতির দল রেললাইনে উঠে পড়লে দ্রুত সতর্ক হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কী এই IDS প্রযুক্তি?

IDS বা Intrusion Detection System মূলত রেললাইনের আশপাশে বন্যপ্রাণীর উপস্থিতি শনাক্ত করার জন্য তৈরি একটি প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা।

এই সিস্টেমে রয়েছে—

থার্মাল ক্যামেরা

ইনফ্রারেড সেন্সর

লেজার সেন্সর

জঙ্গলের হাতি করিডোরের কাছাকাছি কোনও হাতি বা বন্যপ্রাণী রেললাইনের দিকে এগিয়ে এলে এই সেন্সর ও ক্যামেরাগুলি তার গতিবিধি শনাক্ত করতে পারে। এরপর সেই তথ্য দ্রুত সংশ্লিষ্ট কন্ট্রোল রুমে পৌঁছে যায়।

ট্রেনের চালকও পাবেন সতর্কবার্তা

এই প্রযুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, শুধু বনদফতর নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী ট্রেনের লোকোপাইলট এবং গার্ডের কাছেও সতর্কবার্তা পৌঁছনোর ব্যবস্থা রয়েছে।ফলে রেললাইনে হাতির উপস্থিতি সম্পর্কে আগে থেকেই জানা গেলে ট্রেনের গতি কমানো বা প্রয়োজন অনুযায়ী ব্রেক কষার সুযোগ পাওয়া যাবে। এর ফলে হাতির সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হতে পারে।বনদফতরের আধিকারিকদের মতে, দ্রুত সতর্কবার্তা পাওয়াই এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা।

‘হাতি লাইনে উঠতেই সিগন্যাল’, জানাল বনদফতর

গরুমারা বন্যপ্রাণ বিভাগের ডিএফও দ্বিজপ্রতিম সেন জানিয়েছেন, লাটাগুড়ি থেকে বড়দিঘি পর্যন্ত জঙ্গলের ভিতর রেললাইনে বসানো IDS কুনকি হাতির মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়েছে। পরীক্ষায় হাতি লাইনে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই সিগন্যাল পাওয়া গিয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।এর ফলে প্রাথমিক পরীক্ষায় প্রযুক্তিটি প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করছে বলেই মনে করছে বনদফতর।

শুধু IDS নয়, বসেছে AI ক্যামেরাও

হাতি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তায় শুধু IDS-এর উপর নির্ভর করছে না প্রশাসন। চালসা থেকে চাপড়ামারি পর্যন্ত রেললাইনের ধারে বসানো হয়েছে AI-ভিত্তিক ক্যামেরা।এই ক্যামেরায় হাতির ছবি বা গতিবিধি ধরা পড়লে সেই সংক্রান্ত সতর্কবার্তা বনদফতরের কন্ট্রোল রুমে পৌঁছনোর ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে একদিকে রেললাইনে সরাসরি প্রাণীর উপস্থিতি শনাক্ত করবে IDS, অন্যদিকে AI ক্যামেরার মাধ্যমেও নজরদারি চলবে।দুই ধরনের প্রযুক্তির সমন্বয়ে হাতি ও ট্রেনের সংঘর্ষের ঝুঁকি আরও কমানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই উদ্যোগ?

ডুয়ার্সের জঙ্গল হাতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। একইসঙ্গে এই অঞ্চলের জঙ্গলের ভিতর দিয়ে চলে গিয়েছে রেললাইন। ফলে হাতির চলাচলের পথে ট্রেন চলাচল করায় মাঝেমধ্যেই দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়।পরিবেশপ্রেমীদের বক্তব্য, ডুয়ার্সে হাতির সংখ্যা আগের তুলনায় বৃদ্ধি পাওয়ায় এই সমস্যা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। হাতির দল রেললাইনে উঠে পড়লে দ্রুত ট্রেন থামানো বা গতি কমানোর সুযোগ না পেলে বড়সড় প্রাণহানি ঘটতে পারে।এই পরিস্থিতিতে IDS এবং AI ক্যামেরার মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে আগে থেকেই সতর্ক হওয়া গেলে হাতির প্রাণ বাঁচানোর পাশাপাশি ট্রেন দুর্ঘটনার ঝুঁকিও কমানো সম্ভব হতে পারে।

প্রযুক্তির পরীক্ষায় স্বস্তি রেল ও বনদফতরে

কুনকি হাতিকে দিয়ে করা পরীক্ষায় IDS-এর সিগন্যাল সঠিক সময়ে পাওয়ায় আপাতত স্বস্তিতে বনদফতর। তবে এই প্রযুক্তির দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিয়মিত নজরদারি ও বাস্তব পরিস্থিতিতে ব্যবহারের মাধ্যমে আরও ভালোভাবে বোঝা যাবে।তবুও প্রাথমিক পরীক্ষার ফলাফল যে আশাব্যঞ্জক, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। ডুয়ার্সের রেলপথে হাতি মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক ঘটনা কমাতে প্রযুক্তির এই ব্যবহার ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

ডুয়ার্সের জঙ্গলপথে রেললাইনে হাতির মৃত্যু রুখতে বসানো হয়েছে অত্যাধুনিক ইনট্রুশন ডিটেকশন সিস্টেম বা IDS। এই প্রযুক্তি বাস্তবে কতটা কার্যকর, তা যাচাই করতে এবার কুনকি হাতিকে রেললাইন পার করিয়ে অভিনব ট্রায়াল চালাল বনদফতর। পরীক্ষায় হাতি লাইনে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই সতর্কবার্তা পাওয়ায় প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে আশাবাদী রেল ও বনদফতর।

Leave a comment