ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেইর রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন

ইর রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। ৪ জুলাই শুরু হওয়া অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্বে প্রায় ২ কোটি মানুষের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে এবং ভারত সরকারের অংশগ্রহণ নিয়ে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।

ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেইর রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যকে ঘিরে প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। অনুষ্ঠান ৪ জুলাই শুরু হবে এবং ৯ জুলাই খামেনেইকে মাশহাদের ইমাম রেজা দরগাহ প্রাঙ্গণে দাফন করা হবে।

ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, শেষকৃত্যের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সারা দেশ থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে। তেহরান, কুম ও মাশহাদে অনুষ্ঠিতব্য বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রায় ২ কোটি মানুষ অংশ নিতে পারেন বলে অনুমান করা হচ্ছে। এমনটি হলে এটি বিশ্বের বৃহত্তম জনসমাগমভিত্তিক শোকানুষ্ঠানগুলোর একটি হবে।

আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেই ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলায় নিহত হন। তাঁর শেষকৃত্য ৪ মার্চ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তবে ওই সময় অঞ্চলে চলমান সামরিক উত্তেজনা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়।

ইরানি কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সে সময় দেশ যুদ্ধসদৃশ পরিস্থিতির মুখোমুখি ছিল এবং বৃহৎ পরিসরের জনসমাগমের আয়োজন সম্ভব ছিল না। নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতির পর নতুন তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে।

শেষকৃত্যের কর্মসূচি ৪ জুলাই তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হবে। সেখানে খামেনেইর মরদেহ সর্বসাধারণের শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হবে এবং বিপুল জনসমাগমের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এরপর মরদেহ ধর্মীয় শহর কুমে নেওয়া হবে, যেখানে বিশেষ ধর্মীয় কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে।

শেষ পর্যায়ে মরদেহ মাশহাদে নেওয়া হবে। ৯ জুলাই ইমাম রেজা দরগাহ প্রাঙ্গণে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর দাফন সম্পন্ন হবে। অনুষ্ঠানে ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামরিক নেতারা উপস্থিত থাকবেন।

ইরানের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আমন্ত্রণ জানানোর পর বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনায় এসেছে। তবে ভারত সরকার এখনও জানায়নি যে প্রধানমন্ত্রী নিজে অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন, নাকি ভারতের পক্ষ থেকে অন্য কোনো প্রতিনিধি দল পাঠানো হবে।

পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের জন্য এই সিদ্ধান্ত কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ হবে। ভারতের সঙ্গে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল—তিন দেশেরই কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। সে কারণে শেষকৃত্যে অংশগ্রহণের বিষয়ে নয়াদিল্লি সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

এর আগে ২০২৪ সালের মে মাসে ইরানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার পর ভারত একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল তেহরানে পাঠিয়েছিল। সে সময় ভারত এক দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করেছিল এবং তৎকালীন উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড় শেষকৃত্যে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।

খামেনেইকে মাশহাদে দাফনের সিদ্ধান্তকে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। মাশহাদ ইরানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর এবং শিয়া মুসলমানদের অন্যতম পবিত্র ধর্মীয় কেন্দ্র।

এখানে অবস্থিত ইমাম রেজার দরগাহ বিশ্বের বৃহত্তম ইসলামী ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। শিয়া মুসলিম ঐতিহ্য অনুযায়ী ইমাম রেজা অষ্টম ইমাম এবং প্রতি বছর সেখানে কোটি কোটি ভক্ত সমবেত হন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পবিত্র স্থানের প্রাঙ্গণে খামেনেইকে দাফন করা হলে তাঁর নাম শিয়া ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আরও দৃঢ়ভাবে যুক্ত হবে। তাঁদের মতে, এই সিদ্ধান্ত ইরানের ধর্মীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক ঐতিহ্যের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ।

শেষকৃত্য অনুষ্ঠান আয়োজন ও নিরাপত্তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)-এর ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, এত বড় আয়োজনের জন্য বিস্তৃত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তেহরান পৌরসভার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক উপপ্রধান মোহাম্মদ আলি তাওয়াক্কোলিজাদেহ জানান, খামেনেইর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কয়েক দিনব্যাপী জনসাধারণের শ্রদ্ধাঞ্জলি কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে। দেশজুড়ে শোকসভা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং বিশেষ প্রার্থনারও আয়োজন করা হবে।

নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর আশঙ্কা, বিপুল জনসমাগমের কারণে যান চলাচল, জননিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। এ কারণে বিশেষ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রস্তুত করা হয়েছে।

ইসলামী প্রথা অনুযায়ী সাধারণত মৃত্যুর এক বা দুই দিনের মধ্যে দাফন সম্পন্ন করা হয়। সে দৃষ্টিকোণ থেকে খামেনেইর শেষকৃত্যে কয়েক মাসের বিলম্বকে অস্বাভাবিক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে ইরানি কর্মকর্তাদের বক্তব্য, যুদ্ধ, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং বৃহৎ জনসমাগমের প্রস্তুতির কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকার চেয়েছিল, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের নাগরিক এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত প্রতিনিধিরা যেন শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনে অংশ নিতে পারেন।

ইরানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহোল্লাহ খোমেনির ১৯৮৯ সালের শেষকৃত্য এখনও বিশ্বের বৃহত্তম জনসমাগমপূর্ণ শেষযাত্রাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। সে সময় প্রায় ১ কোটি মানুষ এতে অংশ নিয়েছিলেন।

বিপুল জনসমাগমের কারণে বিভিন্ন স্থানে পদদলিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তত আটজন নিহত এবং হাজারো মানুষ আহত হয়েছিলেন। অনুষ্ঠানটি আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ জনশোক কর্মসূচি হিসেবে বিবেচিত হয়।

এবার ইরানি কর্মকর্তারা আশা করছেন, খামেনেইর শেষকৃত্যে এর চেয়েও বেশি মানুষ অংশ নিতে পারেন। সম্ভাব্য ২ কোটি মানুষের অংশগ্রহণ বিবেচনায় রেখে প্রশাসন নিরাপত্তা ও জনসমাগম নিয়ন্ত্রণে বিস্তৃত প্রস্তুতি নিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় খামেনেইর মৃত্যুর পর পশ্চিম এশিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এসেছে। ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বে এই পরিবর্তন আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য, নিরাপত্তা কৌশল এবং কূটনৈতিক সমীকরণকে প্রভাবিত করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, খামেনেইর শেষকৃত্য শুধু একটি ধর্মীয় বা জাতীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি ইরানের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা, শিয়া বিশ্বের মধ্যে তার প্রভাব এবং আঞ্চলিক অবস্থান প্রদর্শনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হতে পারে। এ কারণে জুলাইয়ে অনুষ্ঠেয় এই কর্মসূচির দিকে আন্তর্জাতিক মহলের নজর রয়েছে।

 

Leave a comment