জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানে তাকাইচি তিন দিনের সরকারি সফরে বুধবার সন্ধ্যায় নয়াদিল্লিতে পৌঁছেছেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এটি তাঁর প্রথম ভারত সফর। ২ জুলাই তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ১৬তম ভারত-জাপান বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেবেন। বৈঠকে দুই নেতা বিশেষ কৌশলগত ও বৈশ্বিক অংশীদারিত্বের সামগ্রিক পর্যালোচনা করবেন এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার দিকনির্দেশনা নিয়ে আলোচনা করবেন।
এই সফরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা, সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সাপ্লাই চেইন, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সহযোগিতাসহ একাধিক কৌশলগত বিষয় আলোচনার এজেন্ডায় রয়েছে। সূত্র অনুযায়ী, বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্র পর্যালোচনা করা হবে।
ভারত সফরকালে প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি ভারত-জাপান বিজনেস ফোরামেও অংশ নেবেন। অনুষ্ঠানে জাপানের ১৫০-রও বেশি শিল্পপতি ও বিনিয়োগকারী উপস্থিত থাকবেন। এই মঞ্চের মাধ্যমে দুই দেশের সরকার বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বাণিজ্যিক সহযোগিতা জোরদার এবং নতুন শিল্প অংশীদারিত্বকে উৎসাহিত করার ওপর গুরুত্ব দেবে।
ফোরামে উচ্চপ্রযুক্তি উৎপাদন, অটোমোবাইল, ইলেকট্রনিক্স, ডিজিটাল প্রযুক্তি, সবুজ জ্বালানি এবং উদীয়মান প্রযুক্তিতে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভারত সরকারের মতে, জাপানি বিনিয়োগ দেশের উৎপাদন খাত এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শীর্ষ সম্মেলনের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হবে ভারত ও জাপানের মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য সম্প্রসারণের পরিকল্পনা। দুই দেশ এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে, যার মাধ্যমে বাণিজ্যিক লেনদেন সরাসরি ভারতীয় রুপি ও জাপানি ইয়েনে সম্পন্ন করা যাবে। প্রস্তাবটি চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থার আওতায় জাপানি সংস্থাগুলি ভারতের ব্যাংকে বিশেষ হিসাব খুলে সরাসরি রুপি ও ইয়েনে অর্থপ্রদান করতে পারবে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ের ব্যয় কমবে, অর্থপ্রদানের প্রক্রিয়া দ্রুত হবে এবং সংস্থাগুলির সময় ও ব্যয় উভয়ই হ্রাস পাবে। বিশ্বজুড়ে একাধিক দেশ স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে এবং ভারত-জাপানের এই পদক্ষেপও সেই দিকেই একটি উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের প্রস্তাব প্রথম সামনে আসে ২০২৫ সালের আগস্টে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জাপান সফরের সময়। সে সময় দুই দেশ আগামী দশ বছরের জন্য একটি যৌথ ভিশন নথি প্রকাশ করে, যেখানে পেমেন্ট ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
বর্তমানে জাপানের অর্থ মন্ত্রক ২০২৬ অর্থবছরের মধ্যে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক (RBI)-এর সঙ্গে একটি সহযোগিতা চুক্তির খসড়া নিয়ে কাজ করছে, যাতে এই ব্যবস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা যায়। এর মাধ্যমে দুই দেশের আর্থিক সহযোগিতা আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভারত গত কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে রুপির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে। ২০২২ সালের জুলাইয়ে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক স্পেশাল রুপি ভোস্ত্রো অ্যাকাউন্ট (SRVA) ব্যবস্থা চালু করে, যার মাধ্যমে বিদেশি ব্যাংকগুলি ভারতীয় ব্যাংকে বিশেষ হিসাব খুলে রুপিতে বাণিজ্য করতে পারে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৩০টি দেশের ১২৩টি বিদেশি ব্যাংকের জন্য ভারতের ২৬টি ব্যাংকে ১৫৬টি বিশেষ রুপি ভোস্ত্রো অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। এই ব্যবস্থার লক্ষ্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিদেশি মুদ্রার ওপর নির্ভরতা কমানো এবং ভারতীয় রুপির গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করা।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত ও জাপানের মধ্যে প্রায় ২৭.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য হয়েছে। ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে জাপান ভারতে ৩.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ করেছে।
জাপান আগামী দশ বছরে ভারতে ৬১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই বিনিয়োগ মূলত সেমিকন্ডাক্টর, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, উচ্চপ্রযুক্তি উৎপাদন, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে করা হবে। বর্তমানে ভারতে প্রায় ১,৪০০টি জাপানি সংস্থা কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যার উল্লেখযোগ্য অংশ উৎপাদন খাতের সঙ্গে যুক্ত।
ভারত-জাপান সহযোগিতা শুধু বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মুম্বই-আহমেদাবাদ উচ্চগতির রেল প্রকল্প দুই দেশের সহযোগিতার অন্যতম প্রধান উদাহরণ, যেখানে জাপান আর্থিক সহায়তা এবং শিনকানসেন প্রযুক্তি সরবরাহ করছে।
এ ছাড়া সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন, গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, বৈদ্যুতিক গতিশীলতা, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও দুই দেশ সহযোগিতা বাড়াচ্ছে। বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য নিয়ে ২০২৫ সালে সেমিকন্ডাক্টর ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ নিয়ে দুই দেশ একটি বিশেষ কৌশলগত সংলাপও শুরু করে।
প্রধানমন্ত্রী মোদি ও প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির বৈঠকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হবে। দুই নেতা স্বাধীন ও নিয়মভিত্তিক সামুদ্রিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং কোয়াডের আওতায় সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন।
এ ছাড়া প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, যৌথ সামরিক মহড়া, সাইবার নিরাপত্তা, উন্নত প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা সম্পর্কিত বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সানে তাকাইচির প্রথম ভারত সফরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, স্থানীয় মুদ্রায় অর্থপ্রদান, সেমিকন্ডাক্টর সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সমন্বয়সহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হবে। প্রস্তাবিত চুক্তিগুলিতে সম্মতি হলে তা ভারত ও জাপানের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরও এগিয়ে নিতে সহায়ক হতে পারে।









