বড় বড় থিমের পুজো, ঝাঁ-চকচকে মণ্ডপ আর বারোয়ারি আয়োজনের ভিড়েও কিছু পুজো নিজের ইতিহাস আর ঐতিহ্যের জোরেই আলাদা হয়ে থাকে। মুর্শিদাবাদের কান্দির ছাতিনাকান্দির গুপিবাবুর বাড়ির দুর্গাপুজো তেমনই এক প্রাচীন আয়োজন। প্রায় সাড়ে তিনশো বছর ধরে চলে আসা এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রাজবাড়ির ইতিহাস এবং এক বিশেষ কামান দাগার রীতি। আজ রাজপাট নেই, জমিদারিও নেই, কিন্তু অষ্টমীর সন্ধিপুজোয় সেই কামানের আওয়াজ এখনও জানান দেয় পুজোর গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের।
৩৫০ বছরের পুরনো পুজো, নামেই আজও গুপিবাবুর মা
কান্দি শহরের প্রাচীন দুর্গাপুজোগুলির মধ্যে অন্যতম ছাতিনাকান্দির এই পুজো। স্থানীয়দের কাছে দেবী পরিচিত ‘গুপিবাবুর মা’ বা ‘গুপিবাবুর পুজো’ নামে।প্রায় ৩৫০ বছর ধরে রাজবাড়িতে দেবীর আরাধনা হয়ে আসছে। সময় বদলেছে, জমিদারি প্রথার অবসান হয়েছে, বদলে গিয়েছে সামাজিক পরিস্থিতিও। কিন্তু পুজোর প্রতি মানুষের টান এতটুকুও কমেনি। দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে বহু মানুষ এখনও এই প্রাচীন পুজো দেখতে ছুটে আসেন।
বোধনের দিন থেকেই শুরু হয় বিশেষ আচার
এই পুজোয় দুর্গাপুজোর মূল পর্ব শুরু হওয়ার আগেই বিশেষ আচার-অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যায়। পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী, মহালয়ার আগে বোধনের দিন পঞ্চমুণ্ডির আসনে ঘট বসিয়ে দেবীর পুজোর সূচনা হয়।এরপর পঞ্চমী পর্যন্ত ওই বোধন ঘটেই দু’বেলা পুজো চলে। মহালয়ার দিন হয় দেবীর চক্ষুদান। পঞ্চমীর দিন বিশেষ সাজে দেবীকে পাটে তোলা হয়। তারপর শুরু হয় মূল দুর্গাপুজোর আনুষ্ঠানিকতা।
সন্ধিপুজোর আগে আজও দাগা হয় কামান
এই পুজোর সবচেয়ে আকর্ষণীয় ঐতিহ্য হল সন্ধিপুজোর সময় কামান দাগার রীতি। প্রায় ৩৫০ বছর ধরে এই প্রথা চলে আসছে বলে স্থানীয়দের দাবি।কথিত আছে, একসময় ছাতিনাকান্দির গুপিবাবুর বাড়ি থেকে কামানের শব্দ শোনা গেলেই আশপাশের গ্রামগুলিতে সন্ধিপুজো শুরু করা হত। অর্থাৎ একটি কামানের আওয়াজই ছিল একসময় পুজোর সময় জানান দেওয়ার সংকেত।রাজকীয় সেই রীতির অনেকটাই এখন ইতিহাস হলেও কামান দাগার ঐতিহ্য এখনও ধরে রেখেছে এই পুজো।
সপ্তমী থেকে নবমী ভক্তদের ভিড়
শুধু ঐতিহ্যের জন্যই নয়, দেবীর দর্শন করতেও পুজোর কয়েকদিন বিপুল মানুষের সমাগম হয়। সপ্তমী, অষ্টমী এবং নবমীতে বহু ভক্ত গুপিবাবুর বাড়ির পুজোয় উপস্থিত হন।স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এই পুজোর আবেগ এতটাই গভীর যে বড় বারোয়ারি বা থিম পুজোর ভিড়েও তাঁরা অন্তত একদিন এই বাড়ির দেবীকে দেখতে আসেন।
দশমীতে নিকটবর্তী দিঘিতে বিসর্জন
পুজোর শেষ দিনেও রয়েছে নিজস্ব রীতি। দশমীর দিন বিকেলে দেবীকে নিকটবর্তী একটি দিঘিতে বিসর্জন দেওয়া হয়। কয়েকশো বছরের পুরনো পুজোর সমাপ্তিও তাই ঐতিহ্য মেনেই সম্পন্ন হয়।
রাজপাট নেই, তবু কমেনি মানুষের টান
একসময় এই পুজোর সঙ্গে জমিদারি ও রাজকীয় পরিবেশের যোগ ছিল। এখন সেই জমিদারি নেই, নেই আগের রাজপাটও। কিন্তু স্থানীয় মানুষের কাছে গুপিবাবুর বাড়ির মা এখনও একই রকম আপন এবং জাগ্রত।কান্দিবাসীর বিশ্বাস, দুর্গাপুজোর চারদিনের মধ্যে অন্তত একদিন গুপিবাবুর মাকে দর্শন না করলে যেন পুজোই সম্পূর্ণ হয় না। তাই সময়ের সঙ্গে পুজোর আয়োজন বদলালেও দেবীর প্রতি মানুষের টান আজও একই রয়ে গিয়েছে।
মুর্শিদাবাদের কান্দির ছাতিনাকান্দির গুপিবাবুর বাড়ির দুর্গাপুজো প্রায় ৩৫০ বছরের পুরনো। জমিদারি প্রথা বহু আগেই বিলুপ্ত হয়েছে, রাজকীয় জৌলুসও আগের মতো নেই। কিন্তু আজও সন্ধিপুজোর সময় কামান দাগার ঐতিহ্য অটুট। কথিত আছে, একসময় সেই কামানের শব্দ শুনেই আশপাশের গ্রামগুলিতে শুরু হয়ে যেত সন্ধিপুজো।










