চোখে আলো নেই, জীবনে নেই নির্দিষ্ট আয়ের নিশ্চয়তা। তবুও ভক্তির পথে কোনও বাধাই তাঁকে থামাতে পারেনি। মালদার বামনগোলা ব্লকের চাঁদপুর অঞ্চলের নন্দিনাদহের বাসিন্দা মুকুন্দ ঘরামি প্রায় সাড়ে চার দশক ধরে নিজের বাড়িতেই করে চলেছেন মা দুর্গার পুজো। পুরোহিতের সাহায্য ছাড়াই স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে দেবীর আরাধনা করেন তিনি। তাঁর দাবি, প্রায় ৪৫ বছর আগে এক রাতে স্বপ্নে মা দুর্গা তাঁকে পুজো করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই থেকেই শুরু।
ছোটবেলায় কলেরায় হারিয়েছিলেন দৃষ্টিশক্তি
মুকুন্দ ঘরামির জীবনে ছোটবেলাতেই নেমে এসেছিল বড় বিপর্যয়। কলেরায় আক্রান্ত হয়ে তিনি হারান চোখের দৃষ্টি। এরপর নানা প্রতিকূলতার মধ্যেই জীবন কাটাতে হয়েছে তাঁকে। নির্দিষ্ট কোনও আয়ের উৎস না থাকলেও নিজের বিশ্বাস ও ভক্তিকে কখনও দুর্বল হতে দেননি।আজ দৃষ্টিশক্তি না থাকলেও দেবীর পুজোর যাবতীয় কাজে নিজের মতো করে যুক্ত থাকেন তিনি।
স্বপ্নে নাকি মিলেছিল পুজোর নির্দেশ
মুকুন্দ ঘরামির কথায়, প্রায় ৪৫ বছর আগে এক রাতে স্বপ্নে মা দুর্গা তাঁকে পুজো করার নির্দেশ দেন। কিন্তু দৃষ্টিহীন অবস্থায় কীভাবে সেই পুজো করবেন, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন তিনি।তাঁর দাবি, স্বপ্নেই দেবী তাঁকে আশ্বস্ত করেন। বড় কোনও আয়োজনের প্রয়োজন নেই, জল ও ফুল দিয়েই করা যাবে মায়ের আরাধনা। সেই বিশ্বাসকে সম্বল করেই শুরু হয় তাঁর দুর্গাপুজো।
প্রথম দিকে সাড়া মেলেনি গ্রামবাসীর কাছ থেকে
পুজো শুরু করার পর প্রথমদিকে খুব বেশি মানুষের সহযোগিতা বা সাড়া পাননি মুকুন্দবাবু। কিন্তু তাতে নিজের সংকল্প থেকে একবারও সরে আসেননি তিনি। ধীরে ধীরে তাঁর পুজোর কথা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।প্রতিমা তৈরির সামর্থ্য নিয়েও একসময় সমস্যায় পড়তে হয়েছিল তাঁকে। তখন এক মৃৎশিল্পী তাঁর বাড়িতে এসে প্রতিমা তৈরি করে দেন। মুকুন্দ ঘরামির দাবি, সেই শিল্পীও স্বপ্নে নির্দেশ পেয়েই তাঁর কাছে এসেছিলেন।
স্ত্রীকে পাশে নিয়েই চলে পুজোর আয়োজন
পুজোর কাজে মুকুন্দ ঘরামির সবচেয়ে বড় সঙ্গী তাঁর স্ত্রী বিষ্ণুপ্রিয়া ঘরামি। দু’জনে মিলে মানুষের কাছ থেকে সহযোগিতা সংগ্রহ করে পুজোর আয়োজন করেন। অর্থাভাব থাকলেও প্রতি বছর কোনওভাবে পুজোর ব্যবস্থা হয়ে যায়।বিষ্ণুপ্রিয়া ঘরামির কথাতেও উঠে এসেছে স্বামীর সেই দীর্ঘ ভক্তির কথা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, স্বপ্নাদেশের পর থেকেই তাঁরা এই পুজো করে আসছেন এবং এখনও সেই ধারাই বজায় রয়েছে।
আজও বাড়িতে দেবীর নিত্যপুজো
বর্তমানে মুকুন্দ ঘরামির বাড়িতে রয়েছে কংক্রিটের তৈরি মা দুর্গার একটি মূর্তি। প্রতিদিন সেই মূর্তির সামনে স্বামী-স্ত্রী মিলে পুজো ও সেবা করেন। দেবীর আরাধনার যাবতীয় দায়িত্বও মূলত তাঁদের দু’জনের উপরেই।বড় মণ্ডপ, জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন কিংবা পুরোহিত—কিছুই তাঁদের পুজোর মূল বিষয় নয়। তাঁদের কাছে বিশ্বাস এবং নিষ্ঠাই সবচেয়ে বড়।
মানুষের সহযোগিতাতেই এগিয়ে চলেছে ৪৫ বছরের পুজো
প্রতি বছর স্থানীয় মানুষের সহযোগিতার উপর নির্ভর করেই পুজোর আয়োজন করেন মুকুন্দ ও বিষ্ণুপ্রিয়া। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই পুজো এখন এলাকার মানুষের কাছেও পরিচিত।দৃষ্টিশক্তি হারিয়েও মুকুন্দ ঘরামির এই একনিষ্ঠ সাধনা অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার। প্রতিকূলতা যতই থাকুক, বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে তিনি যে ভাবে পুজোর ধারা বজায় রেখেছেন, সেটিই এই দুর্গাপুজোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য।
শৈশবে কলেরায় আক্রান্ত হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছিলেন মালদার বামনগোলার মুকুন্দ ঘরামি। নির্দিষ্ট আয়ও নেই। কিন্তু প্রায় ৪৫ বছর আগে স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পর থেকে নিজের বাড়িতে পুরোহিত ছাড়াই করে চলেছেন মা দুর্গার আরাধনা। স্ত্রী বিষ্ণুপ্রিয়া ঘরামিকে সঙ্গে নিয়ে বিশ্বাস ও মানুষের সহযোগিতায় আজও সেই পুজোর ধারা বজায় রেখেছেন তিনি।











