শখ থেকেই শুরু, এখন বিদেশে রমরমিয়ে ব্যবসা! কাটোয়ার যুবকের হাতে তৈরি শোলার সাজ পৌঁছচ্ছে আমেরিকা-সুইডেনে

পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়ার যুবক সুমিত সাহা কোনও প্রশিক্ষণ ছাড়াই শোলার কারুকাজে গড়েছেন সফল ব্যবসা। তাঁর হাতে তৈরি শোলার সাজ এখন মরিশাস, আমেরিকা ও সুইডেনসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। জানুন অনুপ্রেরণার এই সাফল্যের গল্প।

একসময় কৌতূহলবশত শুরু হয়েছিল শোলার কারুকাজ শেখার চেষ্টা। সেই ছোট্ট আগ্রহই আজ এনে দিয়েছে আন্তর্জাতিক পরিচিতি। পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়ার যুবক সুমিত সাহা প্রমাণ করে দিয়েছেন, সাফল্যের জন্য সবসময় বড় পুঁজি বা পারিবারিক ব্যবসার প্রয়োজন হয় না। কোনও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই নিজের মেধা, নিরলস পরিশ্রম এবং শিল্পের প্রতি ভালোবাসাকে পুঁজি করে তিনি গড়ে তুলেছেন এক সফল উদ্যোগ। বর্তমানে তাঁর হাতে তৈরি শোলার সাজ শুধু বাংলাতেই নয়, বিদেশের বিভিন্ন দেশ থেকেও পাচ্ছে বিপুল সাড়া। ছোট শহরের এই যুবকের সাফল্যের গল্প আজ বহু স্বপ্নবাজ তরুণ-তরুণীর কাছে অনুপ্রেরণার নাম। 

স্কুলপথের কৌতূহল থেকেই শুরু শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন

কাটোয়ার তাঁতিপাড়ার বাসিন্দা সুমিত সাহার ছোটবেলা কেটেছে সাধারণ পরিবেশে। পরিবারের কেউ শোলার কাজ বা প্রতিমা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। কিন্তু ছোট থেকেই শিল্পের প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ ছিল।স্কুলে যাওয়ার পথে প্রতিমাশিল্পীদের কাজ দেখে মুগ্ধ হতেন তিনি। সেই মুগ্ধতাই একদিন তাঁকে নিজের হাতে একটি ছোট দুর্গামূর্তি গড়ে তোলার অনুপ্রেরণা দেয়। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর শিল্পী হয়ে ওঠার পথচলা।

সমস্যাই দেখাল নতুন পথ

নিজের তৈরি প্রতিমা সাজাতে গিয়ে একসময় সমস্যার মুখোমুখি হন সুমিত। বাজার থেকে তৈরি সাজ কেনার পরিবর্তে তিনি নিজেই শোলার সাজ বানানোর সিদ্ধান্ত নেন।কোনও প্রশিক্ষণ ছাড়াই বারবার চেষ্টা, ভুল থেকে শিক্ষা এবং নিরন্তর অনুশীলনের মাধ্যমে তিনি শিখে ফেলেন শোলার সূক্ষ্ম কারুকাজ। ধীরে ধীরে সেই শখই পরিণত হয় দক্ষতায়, আর দক্ষতা হয়ে ওঠে পেশা।

২০২২ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রথম পদার্পণ

সুমিতের জীবনের সবচেয়ে বড় মোড় আসে ২০২২ সালে। সেই বছর প্রথমবার তাঁর তৈরি শোলার সাজ বিদেশে রপ্তানি হয়। মরিশাসে পাঠানো সেই প্রথম অর্ডারই খুলে দেয় নতুন সম্ভাবনার দরজা।এরপর একের পর এক বিদেশি ক্রেতার আগ্রহ বাড়তে থাকে। বর্তমানে তাঁর তৈরি শোলার সাজ নিয়মিতভাবে পৌঁছে যাচ্ছে আমেরিকা, সুইডেনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।

বিদেশের দুর্গাপুজোয় কাটোয়ার শিল্প

প্রবাসী বাঙালিদের দুর্গাপুজো এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এখন ব্যবহৃত হচ্ছে সুমিতের তৈরি শোলার সাজ। একটি ছোট শহর থেকে তৈরি শিল্পকর্ম আন্তর্জাতিক মঞ্চে জায়গা করে নেওয়ায় গর্বিত তিনি।শুধু ব্যবসায়িক সাফল্য নয়, বিদেশে বসবাসকারী বাঙালিদের কাছে বাংলার ঐতিহ্য পৌঁছে দিতে পারাটাকেই নিজের সবচেয়ে বড় অর্জন বলে মনে করেন এই তরুণ শিল্পী।

শিল্পের প্রতি ভালোবাসাই সাফল্যের চাবিকাঠি

সুমিতের কথায়, প্রতিটি কাজ তিনি অত্যন্ত যত্ন নিয়ে করেন। তাঁর লক্ষ্য শুধু পণ্য বিক্রি নয়, বরং এমন শিল্পকর্ম তৈরি করা যা ব্যবহারকারীর মনে আনন্দ এনে দেয়।এই নিষ্ঠা এবং কাজের প্রতি ভালোবাসাই তাঁকে প্রতিযোগিতার বাজারে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। বিদেশি ক্রেতাদের কাছেও তাঁর কাজের কদর ক্রমশ বাড়ছে।

তরুণ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার গল্প

সুমিত সাহার সাফল্য দেখিয়ে দিয়েছে, বড় শহরে জন্মানো বা পারিবারিক ব্যবসার উত্তরাধিকার থাকা সাফল্যের একমাত্র শর্ত নয়। ইচ্ছাশক্তি, ধৈর্য এবং নিজের প্রতিভার উপর বিশ্বাস থাকলে ছোট শহরের একজন যুবকও আন্তর্জাতিক বাজারে নিজের জায়গা তৈরি করতে পারেন।আজ কাটোয়ার এই শিল্পীর সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং বাংলার ঐতিহ্যবাহী শোলা শিল্পেরও এক বড় স্বীকৃতি।

পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়ার যুবক সুমিত সাহা কোনও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই শোলার কারুকাজে তৈরি করেছেন নিজের পরিচয়। প্রতিমা সাজানোর শখ থেকেই শুরু হওয়া যাত্রা আজ আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে গিয়েছে। মরিশাস থেকে আমেরিকা, সুইডেন— বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে তাঁর হাতে তৈরি শোলার সাজ।

Leave a comment