পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ২০২১ সালের নন্দীগ্রাম বিধানসভা নির্বাচনের সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পায়ে লাগা চোট নিয়ে বিতর্ক ফের সামনে এসেছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সম্প্রতি দাবি করেছেন, সেই সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পায়ে ফ্র্যাকচার বা ডিসলোকেশনের কোনও প্রমাণ ছিল না। এর পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনজীবী তাঁর কথিত মেডিক্যাল রেকর্ড প্রকাশ্যে আসা নিয়ে SSKM হাসপাতাল এবং সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য আধিকারিকদের আইনি নোটিস পাঠিয়েছেন।
বিতর্কটি এখন শুধু ২০২১ সালের চোটের প্রকৃতি নিয়ে সীমাবদ্ধ নেই। প্রধান প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি কীভাবে সংশ্লিষ্ট সরকারি আধিকারিকদের কাছে পৌঁছল এবং অনুমতি ছাড়া সেগুলি কীভাবে প্রকাশ্যে এল। এই ঘটনাকে ঘিরে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী রাজনীতি, মেডিক্যাল গোপনীয়তা এবং সরকারি নথির ব্যবহারের বিষয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
৩ অক্টোবর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, তাঁর কাছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ২০২১ সালের চোট সংক্রান্ত একটি মেডিক্যাল রিপোর্ট রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ১১ মার্চ ২০২১-এর রেডিওলজি রিপোর্টে পায়ে ফ্র্যাকচার বা ডিসলোকেশনের কোনও প্রমাণ নথিভুক্ত ছিল না। এই দাবির ভিত্তিতে অধিকারী অভিযোগ করেন, বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারের সময় মমতার পায়ের চোটকে অতিরঞ্জিত করে দেখানো হয়েছিল।
অধিকারী আরও জানান, রাজ্য সরকার এই বিষয়ে নতুন করে তদন্ত করবে। তবে কোনও নির্দিষ্ট পরীক্ষার সময় মেডিক্যাল রিপোর্টে ফ্র্যাকচার দেখা যায়নি—এই দাবি নিজে থেকেই চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করে না যে কোনও ব্যক্তির অন্য কোনও চোট ছিল না। চোটের সম্পূর্ণ প্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের পরীক্ষা, অন্যান্য মেডিক্যাল রিপোর্ট এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত নথিও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ফলে বর্তমান বিতর্কে রাজনৈতিক দাবি এবং চিকিৎসাগত সিদ্ধান্তকে পৃথকভাবে দেখা প্রয়োজন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনজীবী অর্ক নাগ SSKM হাসপাতাল, বাঙ্গুর ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস এবং রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের সঙ্গে যুক্ত আধিকারিকদের আইনি নোটিস পাঠিয়েছেন। নোটিসে কথিতভাবে জানতে চাওয়া হয়েছে, মমতার ২০২১ সালের মেডিক্যাল রেকর্ড কীভাবে শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পৌঁছল এবং পরে কীভাবে তা প্রকাশ্যে এল।
নোটিসে আরও প্রশ্ন তোলা হয়েছে, কোনও সরকারি দফতর বা তদন্তকারী সংস্থা যদি বৈধভাবে নথিগুলি সংগ্রহ করে থাকে, তাহলে সেগুলি প্রকাশ করার অনুমতি ছিল কি না। পাশাপাশি, রেকর্ড প্রকাশের বিষয়ে কোনও আদালতের নির্দেশ ছিল কি না, তাও জানতে চাওয়া হয়েছে।
মমতার পক্ষ থেকে উত্থাপিত বিষয়টির কেন্দ্রে রয়েছে রোগীর মেডিক্যাল তথ্যের গোপনীয়তা বজায় রাখার দায়িত্ব কার ছিল।
মামলায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, অধিকারীর কাছে থাকা বলে যে নথির কথা বলা হয়েছে, সেটি মূল মেডিক্যাল রেকর্ড ছিল, নাকি তার কোনও প্রতিলিপি। মমতার আইনজীবী কথিতভাবে এই বিষয়েও ব্যাখ্যা চেয়েছেন।
মেডিক্যাল রেকর্ডে রোগীর ব্যক্তিগত এবং স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য থাকে। এই ধরনের নথি প্রকাশ্যে আসার বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি রোগীর গোপনীয়তা এবং চিকিৎসা পেশার সঙ্গে যুক্ত দায়িত্বের বিষয়ও হতে পারে।
হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্য দফতরের পক্ষ থেকে আইনি নোটিসের বিস্তারিত সরকারি জবাব পাওয়ার পরই স্পষ্ট হবে, কোন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নথিগুলি প্রকাশ্যে এসেছে।
এই বিতর্ক ১০ মার্চ ২০২১-এর সেই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত, যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নন্দীগ্রামে বিধানসভা নির্বাচনের প্রচার করছিলেন। তখন তিনি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পাশাপাশি তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থীও ছিলেন।
মমতা অভিযোগ করেছিলেন, প্রচারের সময় ভিড়ের মধ্যে তাঁকে ধাক্কা দেওয়া হয়। এর পর তিনি গাড়ির খোলা দরজায় ধাক্কা খান এবং তাঁর বাম পায়ে চোট লাগে। ঘটনার পর তাঁকে কলকাতার SSKM হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
সেই সময় তাঁর চোট পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রচারের একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে ওঠে। পরে মমতাকে পায়ে প্লাস্টার এবং হুইলচেয়ারে নিয়ে নির্বাচনী প্রচার করতে দেখা যায়। শুভেন্দু অধিকারী সেই নির্বাচনে নন্দীগ্রাম থেকে বিজেপির প্রার্থী ছিলেন এবং তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নির্বাচনে পরাজিত করেন। ফলে দুই নেতার মধ্যে রাজনৈতিক সংঘাতের এই বিষয়টি আগে থেকেই অত্যন্ত সংবেদনশীল ছিল।
২০২১ সালে SSKM হাসপাতালে মমতাকে ভর্তি করার পর চিকিৎসকেরা তাঁর বাম পা ও গোড়ালিতে চোটের পাশাপাশি শরীরের অন্যান্য অংশে চোট এবং ব্যথার কথাও জানিয়েছিলেন। পরে তাঁকে প্লাস্টার করে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
সাম্প্রতিক বিতর্কে শুভেন্দু অধিকারী যে রিপোর্টের উল্লেখ করেছেন, তাতে কথিতভাবে একটি নির্দিষ্ট রেডিওলজি পরীক্ষায় ফ্র্যাকচার বা ডিসলোকেশন না পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই নথিকে সেই সময়ের সম্পূর্ণ মেডিক্যাল রেকর্ড এবং অন্যান্য পরীক্ষার প্রেক্ষাপটে দেখা প্রয়োজন।
তাই শুধুমাত্র একটি রিপোর্টের ভিত্তিতে চোটের সম্পূর্ণ প্রকৃতি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর ক্ষেত্রে চিকিৎসাগতভাবেও সতর্কতা প্রয়োজন।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চোটের পরও হুইলচেয়ারে নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছিলেন। এই ঘটনা নির্বাচনী প্রচারে আবেগ এবং রাজনীতি—দুই ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলেছিল।
শেষ পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃতীয়বার মুখ্যমন্ত্রী হন। তবে নন্দীগ্রাম আসনে তাঁকে শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজিত হতে হয়।
এখন পাঁচ বছর পর একই চোট সংক্রান্ত নথি প্রকাশ্যে আসা এবং তা নিয়ে রাজনৈতিক অভিযোগ পুরনো নির্বাচনী বিতর্ককে ফের সামনে নিয়ে এসেছে।
তৃণমূল কংগ্রেস শুভেন্দু অধিকারীর দাবিগুলি খারিজ করেছে। দলটি বিষয়টিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেছে এবং অভিযোগ করেছে, উপনির্বাচনের আবহে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার জন্য বিষয়টি সামনে আনা হচ্ছে।
অন্যদিকে অধিকারীর বক্তব্য, তাঁর কাছে থাকা নথি তাঁর অভিযোগকে প্রমাণ করে এবং রাজ্য সরকার এই বিষয়ে তদন্ত করবে। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, বিষয়টির সঙ্গে যুক্ত আরও নথি সামনে আসতে পারে।
ফলে বিতর্কটি এখন দুটি পৃথক প্রশ্নকে ঘিরে রয়েছে—২০২১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চোট নিয়ে প্রকাশ্যে দেওয়া দাবিগুলি মেডিক্যাল রেকর্ডের সঙ্গে মেলে কি না এবং সংশ্লিষ্ট রেকর্ড সঠিক হলে সেগুলি কীভাবে প্রকাশ্যে এল।
রাজনৈতিক অভিযোগের বাইরে এই মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল মেডিক্যাল গোপনীয়তা। কোনও রোগীর স্বাস্থ্য সংক্রান্ত রেকর্ডে ব্যক্তিগত এবং সংবেদনশীল তথ্য থাকে। তাই সংশ্লিষ্ট নথি কে সংগ্রহ করেছিল, কোন অধিকারের ভিত্তিতে সংগ্রহ করেছিল এবং সেগুলি প্রকাশ করার অনুমতি কে দিয়েছিল, তা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
মমতার আইনি নোটিস এই প্রশ্নকেই কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্য দফতরকে এখন জানাতে হবে, রেকর্ডের সুরক্ষা এবং তার কথিত প্রকাশের ক্ষেত্রে কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল।
মামলার পরবর্তী গতিপথ মূলত দুটি বিষয়ের উপর নির্ভর করবে। প্রথমত, সংশ্লিষ্ট মেডিক্যাল রেকর্ডের প্রামাণিকতা এবং তার সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট। দ্বিতীয়ত, নথিগুলি কী পরিস্থিতিতে প্রকাশ্যে এসেছে।
সরকার বা তদন্তকারী সংস্থা ২০২১ সালের ঘটনার নতুন করে তদন্ত করলে তার ফলাফল রাজনৈতিক দাবির তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে। একইভাবে, হাসপাতাল বা স্বাস্থ্য দফতর যদি স্পষ্ট করে জানায় যে কোন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মেডিক্যাল রেকর্ড বাইরে এসেছে, তাহলে মেডিক্যাল গোপনীয়তা সংক্রান্ত বিতর্কের বিষয়টিও স্পষ্ট হতে পারে।
এই মুহূর্তে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চোট সম্পূর্ণভাবে সাজানো ছিল বা বাস্তব ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো তাড়াহুড়ো হবে। প্রকাশ্যে থাকা রিপোর্টে শুভেন্দু অধিকারীর অভিযোগ এবং মমতার পক্ষের আপত্তি রয়েছে। তবে পুরো বিতর্কের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কোনও সক্ষম তদন্ত অথবা প্রামাণিক মেডিক্যাল রেকর্ডের বিস্তৃত পর্যালোচনার পরেই নেওয়া সম্ভব।










