Idol Maker: ২৬ বছর স্নান করেননি, তবু খালি চোখে গড়েন দেবীর নিখুঁত মুখ! শোককে শক্তি করে আজও প্রতিমা গড়েন ৮৫ বছরের শিল্পী

রানাঘাটের ৮৫ বছরের মৃৎশিল্পী প্রকাশ পাল ২০০০ সালের ব্যক্তিগত শোকের পর থেকে ২৬ বছর স্নান করেননি। বয়সের ভার সত্ত্বেও আজও খালি চোখে গড়েন নিখুঁত দুর্গাপ্রতিমা।

দুর্গাপুজোর আগে মৃৎশিল্পীদের পাড়ায় যখন শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা তুঙ্গে, তখন রানাঘাটের পালপাড়ার এক শিল্পীর জীবনকাহিনি ছুঁয়ে যাচ্ছে সকলকে। বয়স ৮৫ পেরিয়েছে, শরীরেও বয়সের ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু মাটির সঙ্গে সম্পর্ক এখনও অটুট। হাতে তুলি বা কোনও আধুনিক মাপজোকের সাহায্য ছাড়াই খালি চোখে দেবীর মুখের নিখুঁত অবয়ব ফুটিয়ে তুলছেন প্রকাশ পাল। তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ২৬ বছরের এক গভীর শোকের ইতিহাসও।

২০০০ সালের সেই ঘটনার পরই বদলে যায় জীবন

প্রকাশ পালের জীবনে ২০০০ সাল একটি গভীর ছাপ রেখে গিয়েছে। সেই বছর ঘটে যাওয়া এক ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের কথা তিনি বিস্তারিতভাবে বলতে চান না। তবে তাঁর নিজের কথায়, সেই ঘটনার পর থেকেই তিনি স্নান করা বন্ধ করে দেন।দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে তাঁর এই সিদ্ধান্ত বদলায়নি। সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও সেই পুরনো শোক যেন এখনও তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। পরিবারের বা পরিচিত কারও মৃত্যু কিংবা অশৌচের সময়ও তিনি স্নান করেন না বলে জানা গিয়েছে।

শোকের কথা মুখে না আনলেও কাজে তার ছাপ

নিজের যন্ত্রণা নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করতে খুব একটা আগ্রহী নন এই প্রবীণ শিল্পী। বরং ব্যক্তিগত কষ্টকে নিজের মধ্যেই রেখে দিয়েছেন। সেই বেদনার কথা না বলে তিনি যেন মাটির সঙ্গে নিজের সম্পর্ককেই আরও গভীর করে তুলেছেন।প্রতিমা তৈরির কাজই তাঁর কাছে হয়ে উঠেছে এক ধরনের অবলম্বন। বয়সের ভার শরীরে এলেও মাটির কাজ থেকে নিজেকে পুরোপুরি সরিয়ে রাখতে পারেননি তিনি।

৮৫ বছর বয়সেও খালি চোখে গড়েন দুর্গাপ্রতিমা

প্রকাশ পালের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন দক্ষ মৃৎশিল্পী। বয়স ৮৫ হলেও এখনও দুর্গাপুজোর মরশুমে একের পর এক প্রতিমা গড়ে চলেছেন। খালি চোখেই দেবীর মুখের গড়ন, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং প্রতিমার সামগ্রিক সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলার দক্ষতা রয়েছে তাঁর।প্রতি বছর কাজ শেষ করার পর তাঁর মনে হয়, হয়তো এটাই শেষবার। এবার আর প্রতিমা গড়বেন না। কিন্তু পরের বছর মাটির টান আবার তাঁকে ফিরিয়ে আনে কর্মশালায়। মাটির সোঁদা গন্ধ আর সৃষ্টির আনন্দ যেন তাঁকে অবসর নিতে দেয় না।

সাধারণ জীবনযাপন, পছন্দ নিরামিষ খাবার

প্রকাশ পালের জীবনযাপনও বেশ সাদামাটা। নিজের কথায়, দীর্ঘদিন স্নান না করলেও দৈনন্দিন কাজকর্মে বিশেষ অসুবিধা হয় না। খাবারের ক্ষেত্রেও তাঁর পছন্দ সহজ-সরল। নিরামিষ খাবারই বেশি পছন্দ করেন তিনি। অবসর সময়ে গান শুনতেও ভালোবাসেন।তবে এই সাধারণ জীবনযাপনের আড়ালেই রয়েছে বহু বছরের না-বলা কষ্ট।

প্রতিমা গড়তে গড়তেই চোখে জল, তবু প্রার্থনা সকলের জন্য

সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত আসে প্রতিমা তৈরির সময়। কাজের ফাঁকে কখনও চোখের কোণে জল জমে উঠলে নীরবে তা মুছে নেন প্রকাশ পাল। নিজের দুঃখ নিয়ে অভিযোগ না করে তাঁর প্রার্থনা—পৃথিবীর সবাই যেন ভালো থাকে।ব্যক্তিগত শোককে নিজের দুর্বলতা না বানিয়ে তিনি যেন সৃষ্টির শক্তিতে পরিণত করেছেন। মাটির তৈরি দেবীমূর্তির মধ্যে নিজের অনুভূতি, বিশ্বাস এবং জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে ঢেলে দেন তিনি।

রানাঘাটের পালপাড়ার ৮৫ বছরের মৃৎশিল্পী প্রকাশ পালকে ঘিরে সামনে এসেছে এক বিস্ময়কর জীবনকাহিনি। ২০০০ সালের এক গভীর ব্যক্তিগত শোকের পর থেকে তিনি স্নান ত্যাগ করেছেন বলে জানান। সেই ঘটনার কথা প্রকাশ্যে বলতে চান না তিনি। বয়সের ভার সত্ত্বেও আজও খালি চোখে নিখুঁত দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করে চলেছেন এই প্রবীণ শিল্পী।

Leave a comment