ভারতে ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)-এর অর্থায়ন এবং রাজনৈতিক প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে মার্কিন গায়িকা মেরি মিলবেন ও সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম X-এ তীব্র বিতর্ক হয়েছে। মিলবেন দীপককে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আলোচনায় বসে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। অন্যদিকে, ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি নাগরিকদের হস্তক্ষেপের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দীপক।
বিতর্কের সূত্রপাত CJP মার্কিন সূত্র থেকে অর্থায়ন পাচ্ছে বলে ওঠা অভিযোগকে কেন্দ্র করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করে মেরি মিলবেন দাবি করেন, ভারতে প্রতিবাদ কর্মসূচি পরিচালনার জন্য সংগঠনটি মার্কিন অর্থায়ন পাচ্ছে। একই সঙ্গে, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ভারতীয় যুবসমাজকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।
মিলবেন অভিজিৎ দীপককে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আলোচনায় বসার এবং দেশের অগ্রগতিতে অবদান রাখার পরামর্শ দেন। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও দেশের উন্নয়নের স্বার্থে গঠনমূলক সংলাপকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বার্তা দেন তিনি।
তবে CJP-এর বিরুদ্ধে মার্কিন অর্থায়নের অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথি অথবা সরকারি তদন্তের ফলাফল প্রয়োজন। তাই এই অভিযোগকে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
মিলবেনের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি নাগরিকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অভিজিৎ দীপক। তাঁর বক্তব্য, ভারতীয় নাগরিকেরা নিজেদের সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তাঁদের বাইরের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই।
দীপকের যুক্তি, ভারতে রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও প্রতিবাদ সংক্রান্ত বিষয়ে ভারতীয় নাগরিকদেরই নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার থাকা উচিত। প্রধানমন্ত্রী মোদিকে কেন্দ্র করেও তিনি প্রশ্ন তোলেন, দেশবাসীকে বদনাম করার জন্য মার্কিন সমর্থন নেওয়ার প্রয়োজন কেন হচ্ছে।
ফলে বিতর্কটি CJP-এর কথিত অর্থায়নের অভিযোগের বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক প্রতিবাদ, বিদেশি নাগরিকদের মন্তব্য এবং ভারতের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নেও বিস্তৃত হয়েছে।
নিজের পোস্টে মেরি মিলবেন দীপককে সতর্ক করে বলেন, মার্কিন অনুদানদাতাদের সমর্থন স্থায়ী নাও হতে পারে। তাঁর বক্তব্য, কোনও আন্দোলন সফল না হলে সেই আন্দোলনে অর্থায়নকারী ব্যক্তিরা সেখান থেকে নিজেদের সরিয়ে নিতে পারেন।
দীপককে নিজের মার্কিন শিক্ষাগত অভিজ্ঞতা ও প্রতিভাকে গঠনমূলক কাজে ব্যবহার করার পরামর্শও দেন মিলবেন। পাশাপাশি, প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে আলোচনায় বসে ভারতের অগ্রগতিতে অবদান রাখার আহ্বান জানান তিনি।
মিলবেনের মন্তব্যে সমালোচনার সুর ছিল। তিনি আরও বলেন, কোনও বেআইনি কর্মকাণ্ডের সাফল্য পাওয়া উচিত নয়। তবে কোনও সংগঠন বা আন্দোলনকে বেআইনি হিসেবে চিহ্নিত করতে সংশ্লিষ্ট আইন ও সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতে এর আগেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সমর্থনে প্রকাশ্যে বক্তব্য রেখেছেন মেরি মিলবেন।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে কৃষি আইনের বিরুদ্ধে কৃষক আন্দোলনের সময় মোদি সরকারের কৃষি সংস্কারের সমর্থনে কথা বলেন তিনি। কৃষকদের জীবনযাত্রার উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছিলেন মিলবেন।
২০২৩ সালের আগস্টে মণিপুরের হিংসা নিয়ে আলোচনার সময়ও মোদির নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন জানান তিনি। ওই বক্তব্যে ভারতের নেতৃত্বের প্রতি আস্থার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিল।
২০২৩ সালে সম্প্রচারিত BBC-র তথ্যচিত্র ‘India: The Modi Question’-এ ২০০২ সালের গুজরাত দাঙ্গায় নরেন্দ্র মোদির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। তথ্যচিত্রটির সমালোচনা করে মোদি সরকারের সমর্থনে বক্তব্য রেখেছিলেন মিলবেন।
২০২৪ সালের মার্চে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA) কার্যকর হওয়ার পর সরকারের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেন তিনি। লোকসভা নির্বাচনের সময়ও ভারতীয় ভোটারদের মোদির সমর্থনে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন মিলবেন।
CJP-এর কথিত বিদেশি অর্থায়ন নিয়ে ভারতেও রাজনৈতিক বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্য হয়েছে। উপলব্ধ বিবরণ অনুযায়ী, বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবে অভিজিৎ দীপকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনার খরচের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাঁর শিক্ষার পিছনে মার্কিন ব্যবসায়ী জর্জ সোরোসের সঙ্গে যুক্ত কোনও ফাউন্ডেশনের ভূমিকা ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
বিজেপির সভাপতি নীতিন নবীনও বিরোধী দল ও CJP-এর বিরুদ্ধে বিদেশি সহায়তার মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করার অভিযোগ করেছিলেন।
এ ছাড়া, ২০২৬ সালের আগস্টে RTI কর্মী অমিত তিওয়ারি দীপকের শিক্ষার খরচ এবং CJP-এর আইনি সহায়তা তহবিলের তদন্তের দাবি জানান বলে উপলব্ধ বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
এই অভিযোগ ও তদন্তের দাবিকে প্রমাণিত সিদ্ধান্ত থেকে পৃথক রাখা প্রয়োজন। কোনও ব্যক্তির শিক্ষার খরচ বা কোনও সংগঠনের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন ওঠা নিজে থেকেই বিদেশি অর্থায়নের প্রমাণ নয়। এ ক্ষেত্রে আর্থিক নথি, অনুদানদাতাদের বিবরণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
CJP-এর আন্দোলনের জন্য বিদেশি অর্থায়ন পাওয়ার অভিযোগ আগেও খারিজ করেছেন অভিজিৎ দীপক। তাঁর দাবি, সংগঠনের কর্মসূচি ও কর্মকাণ্ডের খরচ তিনি এবং তাঁর বন্ধুরা মিলেই বহন করেন।
দীপক আরও দাবি করেছিলেন, কোনও বাইরের অনুদানদাতা বা বড় শিল্পপতির কাছ থেকে সংগঠনটি আর্থিক সহায়তা পায়নি। ভবিষ্যতে ক্রাউডফান্ডিংয়ের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেছিলেন তিনি।
বিদেশি অর্থায়নের অভিযোগ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উদ্দেশে প্রশ্ন তুলে দীপক বলেছিলেন, কোনও আন্দোলনে বিদেশি অর্থ ব্যবহার করা হয়ে থাকলে তা তদন্ত করা এবং বন্ধ করার দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের।
তবে অর্থায়ন নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে সংগঠনের বক্তব্যের পাশাপাশি প্রাসঙ্গিক আর্থিক নথি ও সরকারি তদন্তের ফলাফলও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
উপলব্ধ বিবরণ অনুযায়ী, এমন এক সময়ে এই বিতর্ক সামনে এসেছে, যখন বিরোধী দলগুলি ও CJP স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) প্রক্রিয়া এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে প্রতিবাদ করছে।
SIR হল ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া। এর উদ্দেশ্য ভোটার তালিকা পর্যালোচনা করা। তবে এই প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা ও সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে মতপার্থক্য থাকতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে CJP-এর কথিত অর্থায়ন নিয়ে বিতর্ক রাজনৈতিক বিরোধিতা ও বিদেশি সমর্থনের বিষয়টিকে আবার আলোচনায় এনেছে। তবে অর্থায়নের অভিযোগের সঙ্গে SIR-বিরোধী প্রতিবাদের সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে হলে নির্দিষ্ট প্রমাণ প্রয়োজন।
মেরি মিলবেন ও অভিজিৎ দীপকের মধ্যে এই বিতর্ক রাজনৈতিক অভিব্যক্তি, ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি নাগরিকদের প্রকাশ্য মন্তব্য এবং সংগঠনগুলির আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন সামনে এনেছে।
মিলবেন দীপককে প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে সংলাপে বসে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। অন্যদিকে, দীপক বিদেশি নাগরিকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতীয় নাগরিকদের অধিকার ও কর্তৃত্বের ওপর জোর দিয়েছেন।
এই ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অভিযোগ এবং প্রমাণিত তথ্যের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। CJP-এর বিরুদ্ধে বিদেশি অর্থায়নের অভিযোগ, সংগঠনটির আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট তদন্তের ফলাফল সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সামনে এলেই বিষয়টি স্পষ্টভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।













