জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি স্ট্যালিনের, SIR বন্ধ ও নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় তদন্তের দাবি

ডিএমকে সভাপতি এম কে স্ট্যালিন CEC জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ, SIR বন্ধ এবং নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ ঘটনাগুলির নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি করেছেন। একই সময়ে CEC-EC নিয়োগ আইন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতিদের ভিন্নমতের বিষয়টি সামনে এসেছে।

ডিএমকে সভাপতি এম কে স্ট্যালিন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (CEC) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেছেন। একই সঙ্গে তিনি বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR প্রক্রিয়া বন্ধ করা এবং নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলির নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। ২৩ সেপ্টেম্বর দেওয়া এক বিবৃতিতে স্ট্যালিন বলেন, জ্ঞানেশ কুমারের পদে থাকার কোনও অধিকার নেই। তাঁর এই বক্তব্য এমন একটি প্রতিবেদনের পর এসেছে, যেখানে দাবি করা হয়েছিল যে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি গত ১০ মাসে কমিশনের কয়েকটি সিদ্ধান্ত ও প্রক্রিয়া নিয়ে অন্তত ১৪ বার আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানিয়েছিলেন।

স্ট্যালিনের অভিযোগ, SIR-এর নামে ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে ডিএমকে এবং অন্যান্য বিরোধী দল আগে থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়া নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে এবং পশ্চিমবঙ্গেও এর কারণে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।

স্ট্যালিন SIR প্রক্রিয়া বন্ধ করার পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরে কথিত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, কমিশনের অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলির নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত এবং কারও দায়িত্ব নির্ধারিত হলে তাঁকে জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।

তবে এগুলি স্ট্যালিন ও বিরোধী দলগুলির রাজনৈতিক দাবি। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, অভ্যন্তরীণ আলোচনায় মতপার্থক্য বা লিখিত মন্তব্য থাকা একটি বহুসদস্যের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার অংশ। কমিশন-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, SIR-সহ কমিশনের সিদ্ধান্তগুলি তিন কমিশনারের অনুমোদনেই নেওয়া হয়েছে এবং সর্বসম্মত ছিল।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার কিছু সিদ্ধান্ত ও প্রক্রিয়া নিয়ে আনুষ্ঠানিক আপত্তি নথিভুক্ত করেছিলেন। প্রতিবেদনে SIR-সংক্রান্ত বিষয়ও এই আপত্তির মধ্যে থাকার কথা বলা হয়।

প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর বিরোধী নেতারা নির্বাচন কমিশনের কার্যপ্রণালী নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেনি যে ওই আপত্তিগুলি কমিশনের কার্যক্রমে কোনও ভাঙন বা অচলাবস্থার ইঙ্গিত দেয়। কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ আলোচনায় ভিন্ন মত বা পর্যবেক্ষণ থাকা স্বাভাবিক এবং SIR-সহ সিদ্ধান্তগুলি সর্বসম্মতভাবে নেওয়া হয়েছে।

এই রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ সংক্রান্ত ২০২৩ সালের আইনকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা মামলাগুলি সুপ্রিম কোর্টে ওঠে। বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত এবং বিচারপতি সতীশ চন্দ্র শর্মার বেঞ্চে এই মামলার শুনানি হয়। দুই বিচারপতি এই আবেদনগুলি বৃহত্তর সাংবিধানিক বেঞ্চে পাঠানো উচিত কি না, সেই প্রশ্নে ভিন্নমত পোষণ করেন। এরপর বিষয়টি প্রধান বিচারপতির সামনে রাখা হয়, যাতে উপযুক্ত সংখ্যক বিচারপতির বৃহত্তর বেঞ্চ গঠনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।

২০২৩ সালের আইনে CEC এবং নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের জন্য গঠিত নির্বাচন কমিটির কাঠামো পরিবর্তন করা হয়। এই কমিটিতে প্রধানমন্ত্রী, লোকসভায় বিরোধী দলনেতা এবং প্রধানমন্ত্রী মনোনীত কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার একজন সদস্য রয়েছেন। এর আগে সুপ্রিম কোর্টের ২০২৩ সালের সাংবিধানিক বেঞ্চ সংসদ আইন প্রণয়ন না করা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলনেতা এবং ভারতের প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে নিয়োগের ব্যবস্থা নির্দেশ করেছিল।

শুনানির সময় বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা এবং তার নিরপেক্ষতার ধারণা নিয়ে মন্তব্য করেন। তিনি ক্রিকেটের আম্পায়ারের উদাহরণ ব্যবহার করে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার ধারণার গুরুত্বের কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যের অর্থ ছিল, কোনও প্রতিষ্ঠান স্বাধীন হওয়াই যথেষ্ট নয়, সেটিকে স্বাধীন বলেও প্রতীয়মান হতে হবে।

বিচারপতি দত্ত নিয়োগ কমিটিতে প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাঁর মতে, এই ধরনের ব্যবস্থায় নির্বাচন প্রক্রিয়ার অভ্যন্তরীণ স্বাধীন ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

২০২৩ সালের আইনকে চ্যালেঞ্জ করা আবেদনগুলি বৃহত্তর সাংবিধানিক বেঞ্চে পাঠানো হবে কি না, তা নিয়ে বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত এবং বিচারপতি সতীশ চন্দ্র শর্মা একমত হননি। পরে বিষয়টি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়, যাতে উপযুক্ত সংখ্যক বিচারপতির বৃহত্তর বেঞ্চ গঠনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।

এই পর্যায়টি মামলার সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়; এটি পরবর্তী বিচারিক শুনানির জন্য বৃহত্তর বেঞ্চ গঠনের সঙ্গে সম্পর্কিত।

ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জ্ঞানেশ কুমার ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ভারতের ২৬তম মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৮৮ ব্যাচের কেরল ক্যাডারের ভারতীয় প্রশাসনিক পরিষেবার কর্মকর্তা ছিলেন। কেন্দ্র ও কেরল সরকারের বিভিন্ন পদেও তিনি কাজ করেছেন।

SIR, নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং CEC-এর ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। ডিএমকে সভাপতি এম কে স্ট্যালিন জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ, SIR বন্ধ এবং কমিশনের অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলির নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, অভ্যন্তরীণ আলোচনায় মতপার্থক্য বা মন্তব্য নথিভুক্ত হওয়া প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার অংশ এবং SIR-সহ তার সিদ্ধান্তগুলি সর্বসম্মতভাবে নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে CEC ও EC-দের নিয়োগ সংক্রান্ত ২০২৩ সালের আইনের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে মামলাটিও সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী শুনানির দিকে এগোচ্ছে।

Leave a comment