পর্দায় তাঁকে দেখলেই অনেক সময় ভয়ংকর খলনায়কের মুখটাই মনে পড়ে। কিন্তু একসময় এই অভিনেতাই পরিবারের দায়িত্ব সামলাতে ট্রাকের স্টিয়ারিং হাতে তুলে নিয়েছিলেন। নিজের পরিবহন ব্যবসা চালানোর পাশাপাশি প্রায় নয় বছর ট্রাক চালিয়েছেন। তারপর একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা তাঁর জীবনকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়। সেই ঘটনাই শেষ পর্যন্ত তাঁকে নিয়ে আসে মুম্বইয়ের চলচ্চিত্র জগতে। তিনি আর কেউ নন, বলিউডের পরিচিত অভিনেতা মোহন জোশী।
ব্যাঙ্গালোরে জন্ম, পুনেতে বেড়ে ওঠা
মোহন জোশীর জন্ম ১৯৪৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর বেঙ্গালুরুতে। তাঁর বাবা সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীকালে পরিবার চলে আসে পুনেতে এবং সেখানেই পড়াশোনা করেন মোহন।কলেজে পড়ার সময় থেকেই নাটকের প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। ধীরে ধীরে মঞ্চে অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। থিয়েটারের অভিজ্ঞতা তাঁকে অভিনয়ের বিভিন্ন দিক বুঝতে এবং নিজের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করে।তবে তখনও সিনেমার জগতে পা রাখার কথা নিশ্চিত ছিল না। জীবনের বাস্তব প্রয়োজনেই তাঁকে অন্য পেশার সঙ্গে যুক্ত হতে হয়েছিল।
পরিবহন সংস্থা খুলে নিজেই ধরেছিলেন ট্রাকের স্টিয়ারিং
অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেওয়ার আগে মোহন জোশী নিজের একটি পরিবহন সংস্থা শুরু করেছিলেন। ব্যবসা চালানোর পাশাপাশি আর্থিক পরিস্থিতির কারণে নিজেকেই ট্রাক চালাতে হত।এভাবেই কেটে যায় প্রায় নয় বছর। একদিকে পরিবহন ব্যবসার দায়িত্ব, অন্যদিকে দীর্ঘ পথ ট্রাক চালানো—জীবনের এই অধ্যায় তাঁকে কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত করেছিল।কিন্তু একটি ভয়াবহ ট্রাক দুর্ঘটনা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
ভয়াবহ দুর্ঘটনাই খুলে দিল নতুন পথ
দুর্ঘটনার পর মোহন জোশী ট্রাক চালানো ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর এক বন্ধুর পরামর্শে তিনি মুম্বইয়ে চলে যান।সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর অভিনয় জীবনের নতুন অধ্যায়। থিয়েটারে অর্জিত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে টেলিভিশন ও সিনেমায় কাজের সুযোগ পেতে শুরু করেন তিনি।
‘আর্থকোয়েক’ থেকে বাড়তে থাকে সিনেমার সুযোগ
মুম্বইয়ে আসার পর অভিনয়ের জগতে তাঁর কেরিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় ‘আর্থকোয়েক’ ছবিটি। এরপর একের পর এক ছবির প্রস্তাব আসতে থাকে।তাঁর চেহারা, কণ্ঠস্বর, সংলাপ বলার ধরন এবং পর্দায় উপস্থিতি তাঁকে বিশেষ করে নেতিবাচক চরিত্রের জন্য উপযুক্ত করে তোলে। খুব দ্রুতই বলিউডে খলনায়ক হিসেবে আলাদা পরিচিতি তৈরি করেন মোহন জোশী।
‘বাস্তব’, ‘মৃত্যুদণ্ড’, ‘গুন্ডা’—মনে থেকে গিয়েছে চরিত্র
মোহন জোশীর অভিনয় জীবনের উল্লেখযোগ্য ছবির তালিকায় রয়েছে ‘মৃত্যুদণ্ড’ (১৯৯৭), ‘গুন্ডা’ (১৯৯৮) এবং ‘বাস্তব: দ্য রিয়ালিটি’ (১৯৯৯)।
এই ছবিগুলিতে তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলি দর্শকদের মধ্যে আলাদা ছাপ তৈরি করে। খলনায়কের ভূমিকায় বারবার দেখা গেলেও একই ধরনের অভিনয়ে আটকে থাকেননি তিনি।
কমেডি এবং চরিত্রাভিনয়েও নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন মোহন।
শুধু হিন্দি নয়, মারাঠি ও ভোজপুরি সিনেমাতেও কাজ
অনার’ এবং ‘দেউল বন্ধ’-সহ একাধিক ছবিতে তাঁর অভিনয়ের বিভিন্ন দিক সামনে এসেছে। ফলে শুধুমাত্র ভিলেন নয়, নানা ধরনের চরিত্রে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও প্রমাণ করেছেন এই অভিনেতা।
জাতীয় স্তরেও পেয়েছেন স্বীকৃতি
মোহন জোশীর অভিনয় প্রতিভা জাতীয় স্তরেও স্বীকৃতি পেয়েছে। মারাঠি ছবি ‘ঘরবাহের’-এ অভিনয়ের জন্য তিনি ৪৭তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে বিশেষ সম্মাননা লাভ করেন।শতাধিক ছবিতে কাজের অভিজ্ঞতা এবং একাধিক ভাষার সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে নিজের দীর্ঘ কেরিয়ারকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন তিনি।
ট্রাকের স্টিয়ারিং থেকে ক্যামেরার সামনে
মোহন জোশীর গল্প তাই শুধুই একজন অভিনেতার সাফল্যের কাহিনি নয়। জীবনের এক পর্যায়ে পরিবারের আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে ট্রাক চালানো, প্রায় নয় বছর সেই পেশায় থাকা এবং দুর্ঘটনার পর সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে যাত্রা—সব মিলিয়ে তাঁর কেরিয়ার যথেষ্ট ব্যতিক্রমী।যে মানুষ একসময় ট্রাকের স্টিয়ারিং ধরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতেন, তিনিই পরে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে এমন সব চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যা দর্শকের মনে দীর্ঘদিন জায়গা করে নিয়েছে।
বলিউডে খলনায়কের চরিত্রে বিশেষ পরিচিতি পাওয়া অভিনেতা মোহন জোশীর জীবন ছিল সংগ্রামে ভরা। অভিনয়ে আসার আগে নিজের পরিবহন সংস্থা চালানোর পাশাপাশি প্রায় ৯ বছর ট্রাকও চালিয়েছেন তিনি। একটি দুর্ঘটনার পর বদলে যায় তাঁর জীবনের গতিপথ। পরে থিয়েটার থেকে সিনেমায় এসে তৈরি করেন নিজস্ব পরিচয়।









