সকাল হলেই জুতো পরে হাঁটতে বেরোতে হবে—এমন কোনও বাধ্যতামূলক নিয়ম নেই। কারও কাছে ভোরের নিরিবিলি পরিবেশে হাঁটা সুবিধাজনক, আবার কারও পক্ষে অফিস বা কাজের ফাঁকে সন্ধ্যার হাঁটাই সহজ। চিকিৎসকদের মতে, শরীরচর্চার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল নিয়মিত থাকা। তবে খাবারের পর হাঁটা, খালি পেটে হাঁটা কিংবা দিনের নির্দিষ্ট সময়ে হাঁটার ফলে শরীরে কিছু আলাদা প্রভাব পড়তে পারে।
সকালে হাঁটা নাকি সন্ধ্যায়? কোনটা বেশি ভাল?
আইএলএস দমদম হাসপাতালের ইন্টারনাল মেডিসিন অ্যান্ড জেরিয়াট্রিক্স বিশেষজ্ঞ ডক্টর সদাজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, একেবারেই না হাঁটার চেয়ে দিনের যে কোনও সময়ে হাঁটা অনেক ভাল। প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যকলাপ করার পরামর্শ দেওয়া হয়।অর্থাৎ সপ্তাহে পাঁচ দিন প্রায় ৩০ মিনিট দ্রুতগতিতে হাঁটা একটি ভাল লক্ষ্য হতে পারে। তাই সকাল না সন্ধ্যা—এই প্রশ্নের চেয়ে কোন সময় নিয়মিত হাঁটা সম্ভব, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ওজন কমাতে সকালে হাঁটা কি বেশি কার্যকর?
কিছু গবেষণায় দেখা গিয়েছে, সকালের নাশতার আগে হালকা বা মাঝারি গতিতে হাঁটলে শরীর সঞ্চিত ফ্যাটকে কিছুটা বেশি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। দীর্ঘ সময় না খাওয়ার পর শরীরে গ্লাইকোজেন ও ইনসুলিনের মাত্রা তুলনামূলক কম থাকায় এমনটা হতে পারে।তবে শুধু খালি পেটে হাঁটলেই দ্রুত ওজন কমবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। ওজন কমানোর ক্ষেত্রে মোট শারীরিক পরিশ্রম, খাবারের ধরন, ঘুম এবং দীর্ঘমেয়াদি রুটিন—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ।
ডায়াবেটিস থাকলে খাবারের পর হাঁটা হতে পারে উপকারী
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে হাঁটার সময়ের ক্ষেত্রে খাবারের সঙ্গে সম্পর্কটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। খাবার খাওয়ার পর মাত্র ১০-১৫ মিনিট হালকা হাঁটাও খাবার-পরবর্তী রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে।বিশেষ করে রাতের খাবারের পর কিছুক্ষণ হাঁটা দীর্ঘ সময় বসে থাকার অভ্যাস কমানোর পাশাপাশি শরীরকে সক্রিয় রাখতে সাহায্য করতে পারে। তবে ইনসুলিন বা নির্দিষ্ট ডায়াবেটিসের ওষুধ গ্রহণ করলে নিজের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হাঁটা ও খাবারের সময় ঠিক করা উচিত।
হার্ট ভাল রাখতে কোন সময় হাঁটবেন?
হৃদযন্ত্রের সুস্থতার জন্য নির্দিষ্ট কোনও একটি সময়কে সবার জন্য সেরা বলা যায় না। নিয়মিত দ্রুতগতিতে হাঁটা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, ওজন ঠিক রাখা এবং হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।দিনের পরের দিকে হাঁটার একটি সুবিধা হল, দীর্ঘ সময় বসে থাকার পর শরীরকে আবার সক্রিয় করা যায়। তবে সকালেও যদি নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস বজায় রাখা সম্ভব হয়, সেটিও হৃদযন্ত্রের জন্য উপকারী।
খালি পেটে হাঁটা কি নিরাপদ?
সুস্থ অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে হালকা বা মাঝারি গতিতে খালি পেটে হাঁটা সাধারণত সহনীয় হতে পারে। কিন্তু এটি ওজন কমানোর জন্য অপরিহার্য নয়।হাঁটার সময় মাথা ঘোরা, দুর্বল লাগা বা অস্বাভাবিক ক্লান্তি হলে সঙ্গে সঙ্গে থেমে বিশ্রাম নেওয়া উচিত। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে খালি পেটে হাঁটার আগে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।
কার জন্য সকালবেলার হাঁটা ভাল?
যাঁরা দিনের শুরুতেই শরীরচর্চা সেরে নিতে চান অথবা সকালের রুটিন সহজে মেনে চলতে পারেন, তাঁদের জন্য প্রাতঃভ্রমণ ভাল বিকল্প। তবে খুব ভোরে হাঁটলে নিরাপদ ও পর্যাপ্ত আলোযুক্ত রাস্তা বেছে নেওয়া জরুরি।বয়স্কদের ক্ষেত্রে আবহাওয়া, রাস্তার নিরাপত্তা এবং দৃশ্যমানতার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে।
ব্যস্ত মানুষদের জন্য সন্ধ্যার হাঁটা
সকালবেলা অফিস, সংসার বা অন্যান্য কাজে ব্যস্ত থাকলে সন্ধ্যার হাঁটাই হতে পারে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান। সারাদিন বসে কাজ করার পর হাঁটা শরীরকে সক্রিয় করার পাশাপাশি মানসিক চাপ কমাতেও সাহায্য করতে পারে।তাই শুধু ‘সকালেই হাঁটতে হবে’ এমন ধারণায় আটকে থাকার প্রয়োজন নেই। যে সময়টি নিয়মিতভাবে বজায় রাখা সম্ভব, সেই সময়কেই হাঁটার রুটিনে পরিণত করা ভাল।
রাতের খাবারের পর ১০-১৫ মিনিট হাঁটুন
রাতের খাবারের পর কিছুক্ষণ ধীর বা স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ গতিতে হাঁটা সহজ একটি স্বাস্থ্যকর অভ্যাস হতে পারে। এতে খাবারের পর রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বেড়ে যাওয়া নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে এবং দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার সময়ও কমে।শুরু করার জন্য ১০-১৫ মিনিট হাঁটাই যথেষ্ট হতে পারে। পরে শরীরের সক্ষমতা অনুযায়ী সময় ও গতি বাড়ানো যায়।
সকালের হাঁটাই যে সবসময় সেরা, এমনটা নয়। নিয়মিত হাঁটার অভ্যাসই আসল। তবে ডায়াবেটিস, ওজন কমানো, হৃদযন্ত্রের সুস্থতা কিংবা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে দিনের বিভিন্ন সময়ে হাঁটার আলাদা কিছু সুবিধা থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞের পরামর্শে জেনে নিন কোন সময়ে হাঁটলে কী উপকার মিলতে পারে।













