দীর্ঘ অভিনয়জীবনে দর্শকের মনে জায়গা করে নেওয়া মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় বরাবরই নিজের মতামত স্পষ্টভাবে জানাতে পরিচিত। সম্প্রতি জাগরণ চলচ্চিত্র উৎসব ২০২৬-এর এক আলোচনায় নিজের ব্যক্তিগত জীবন, সন্তানদের নিয়ে ভাবনা এবং বর্তমান প্রজন্মের সম্পর্ক ও বিয়ে নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন অভিনেত্রী। সেখানেই মেয়েকে দেওয়া তাঁর একটি বিশেষ পরামর্শ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
‘সময় বদলেছে, তাই ভাবনাও বদলাতে হবে’
জাগরণ চলচ্চিত্র উৎসবের অনুষ্ঠানে সাংবাদিক নয়নদীপ রক্ষিতের সঙ্গে কথোপকথনে নিজেকে ‘প্রগতিশীল’ বলে উল্লেখ করেন মৌসুমী। তরুণী ও মহিলাদের উদ্দেশে তাঁর বক্তব্য, সময়ের সঙ্গে মানুষের চিন্তাভাবনাতেও পরিবর্তন আসা প্রয়োজন।অভিনেত্রীর মতে, নিজেদের জীবন ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তিনি তরুণ প্রজন্মকে কিছুটা সতর্ক এবং নিজের প্রতি যত্নশীল হওয়ার পরামর্শ দেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, অতিরিক্ত সামাজিক চাপের মধ্যে নিজের জন্য সময় বের করাও জরুরি।
সংসারের দায়িত্ব কি শুধু মেয়েদের?
মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় সমাজের প্রচলিত কিছু ধারণা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ছোট থেকেই মেয়েদের সংসার, রান্নাবান্না ও শ্বশুরবাড়ির দায়িত্ব সামলানোর জন্য প্রস্তুত করা হয়। কিন্তু ছেলেদের ক্ষেত্রে একইভাবে ঘরের কাজ শেখানোর বিষয়টি অনেক সময় দেখা যায় না।তাঁর মতে, সংসার পরিচালনার দায়িত্ব একতরফাভাবে শুধু নারীর উপর চাপিয়ে দেওয়ার ধারণা বদলানো প্রয়োজন।
খুব অল্প বয়সেই বিয়ে হয়েছিল মৌসুমীর
মৌসুমীর নিজের জীবনও ছিল নানা অভিজ্ঞতায় ভরা। তাঁর অভিনয়জীবনের অন্যতম পরিচিত ছবি ‘বালিকা বধূ’। খুব অল্প বয়সেই তাঁর জীবনে বিয়ে ও মাতৃত্ব আসে।পরিবারের উদ্যোগে কিংবদন্তি গায়ক হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ছেলে জয়ন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর বিয়ের ব্যবস্থা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি বারবার তরুণ প্রজন্মকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভাবতে বলেছেন।
‘ভুল করলে তার পুনরাবৃত্তি করবেন না’
নিজের জীবনের প্রসঙ্গ টেনে মৌসুমী জানান, মানুষ মাত্রই ভুল করতে পারে। কিন্তু ভুল বুঝতে পারার পর একই ভুল আবার না করাটাই গুরুত্বপূর্ণ।তাঁর কথায়, জীবনে যা ভালো লাগে তা করা যেতে পারে, তবে কোনও কিছুর ক্ষেত্রেই বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়। আত্মবিশ্লেষণের মাধ্যমে নিজের ভুল বুঝে তা থেকে শিক্ষা নেওয়ার উপর জোর দিয়েছেন অভিনেত্রী।
‘বয়ফ্রেন্ড থাকতেই পারে, কিন্তু তাকেই বিয়ে করতে হবে এমন নয়’
মেয়েকে দেওয়া মৌসুমীর একটি বক্তব্যই সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে। সম্পর্ক ও বিয়ে নিয়ে মেয়েকে তাঁর স্পষ্ট পরামর্শ—“তোমার বয়ফ্রেন্ড থাকতেই পারে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তোমাকে তাকেই বিয়ে করতে হবে।অর্থাৎ, প্রেমের সম্পর্ক এবং বিবাহ—দুটিকে একই সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই বলেই মনে করেন অভিনেত্রী। তাঁর এই বক্তব্যে ব্যক্তিগত পছন্দ, স্বাধীন সিদ্ধান্ত এবং সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
বড় মেয়ে পায়েলের কথা উঠতেই আবেগপ্রবণ অভিনেত্রী
আলোচনার এক পর্যায়ে নিজের বড় মেয়ে পায়েলের কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন মৌসুমী। দীর্ঘদিনের অসুস্থতা ও ডায়াবেটিসের পর ২০১৯ সালে পায়েলের মৃত্যু হয়।মৌসুমী জানান, পায়েল ও তাঁর ছোট মেয়ে মেঘার মধ্যে বয়সের ব্যবধান ছিল আট বছর। ফলে ছোট বোনের প্রতি পায়েলের সম্পর্ক অনেকটা মায়ের মতোই ছিল।
‘এই শূন্যতা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না’
মেয়েকে হারানোর সেই কঠিন সময়ের কথা বলতে গিয়ে অভিনেত্রী জানান, এই শোক কোনওভাবেই সহজে মুছে যাওয়ার নয়। তিনি একটি পুরোনো সাক্ষাৎকারের প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন।মৌসুমীর কথায়, তাঁর স্বামী জয়ন্ত এখনও কখনও কখনও রাতে ঘুম থেকে উঠে পায়েলের নাম ধরে কাঁদেন। সন্তান হারানোর যন্ত্রণা যে পরিবারের জন্য কতটা গভীর এবংদীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, সেই আবেগই তাঁর কথায় প্রকাশ পেয়েছে।
সম্পর্ক, বিয়ে ও নিজের জীবন—মৌসুমীর বার্তা
মৌসুমীর বক্তব্যের মূল সুর, জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত শুধু সামাজিক প্রত্যাশার ভিত্তিতে না নিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে নেওয়া। বিশেষ করে তরুণীদের নিজেদের পছন্দ, সময় এবং জীবনের লক্ষ্যকে গুরুত্ব দেওয়ার কথাই তিনি বলেছেন।তাঁর নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা এবং মেয়েদের প্রতি এই পরামর্শ তাই নতুন করে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
প্রেম, বিয়ে ও সংসার নিয়ে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে নতুন প্রজন্মকে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন অভিনেত্রী মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়। মেয়েকে তাঁর স্পষ্ট পরামর্শ—সম্পর্ক থাকলেই সেই মানুষটিকেই বিয়ে করতে হবে, এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই।








