বিরিয়ানি, কাবাব কিংবা মুঘলাই পরোটা—মুঘল রান্নার প্রভাব ভারতীয় খাদ্যসংস্কৃতিতে আজও স্পষ্ট। তবে এই ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি খাবারের গল্প বেশ অবাক করার মতো। পাতলা, নরম এবং বিশাল আকারের রুমালি রুটি আজ তন্দুরি বা মুঘলাই খাবারের সঙ্গে বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, একসময় নাকি এই রুটির ব্যবহার ছিল একেবারেই অন্যরকম!

‘রুমাল’ থেকেই কি নাম রুমালি রুটি?
রুমালি রুটির নামের সঙ্গে ‘রুমাল’-এর যোগসূত্র নিয়ে একটি জনপ্রিয় মত রয়েছে। কথিত আছে, মুঘল আমলে রাজপরিবার এবং অভিজাতদের ভোজসভায় তেল, ঘি ও মশলাদার খাবার খাওয়ার পর হাত পরিষ্কার করার জন্য পাতলা এই রুটি ব্যবহার করা হত।থালার পাশে ভাঁজ করে রাখা থাকত রুমালি রুটি। খাওয়ার মাঝে হাতে লেগে থাকা তেল-মশলা মুছে নেওয়ার কাজে সেটিই ব্যবহার করতেন অভিজাতরা—এমনই প্রচলিত কাহিনি রয়েছে। সেই থেকেই নাকি ‘রুমাল’-এর সঙ্গে মিলিয়ে এর নাম হয় ‘রুমালি রুটি’।
মুঘল হেঁশেলে কেন ছিল এর কদর?
মুঘল দরবারের রান্নাঘরে আমিষ ও নিরামিষ—দুই ধরনেরই অসংখ্য পদ তৈরি হত। রান্নায় ব্যবহার করা হত ঘি, তেল এবং নানা সুগন্ধি মশলা। ফলে খাবার খাওয়ার পর হাতে তেল-মশলা লেগে যাওয়া ছিল স্বাভাবিক।এই প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, রুমালি রুটি সেই তেল-মশলা শুষে নেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হত। ভোজ শেষ হলে ব্যবহৃত রুটিগুলি আর রাখা হত না। অর্থাৎ, যে জিনিস একসময় ছিল প্রায় ‘ব্যবহার করে ফেলে দেওয়ার’ সামগ্রী, সময়ের সঙ্গে সেটিই হয়ে উঠেছে মুঘলাই খাবারের অন্যতম পরিচিত অনুষঙ্গ।

আজ কেন এত জনপ্রিয় রুমালি রুটি?
সময়ের সঙ্গে রুমালি রুটির ব্যবহার ও পরিচিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। বর্তমানে এটি কোনও খাবারের টেবিলে হাত মোছার জন্য নয়, বরং কাবাব, তন্দুরি, গ্রেভি বা মুঘলাই বিভিন্ন পদের সঙ্গে পরিবেশন করা হয়।অত্যন্ত পাতলা ও নরম হওয়ায় মাংস কিংবা মশলাদার তরকারির সঙ্গে এই রুটি খেতে অনেকেই পছন্দ করেন। রেস্তরাঁর মেনুতেও তাই এর আলাদা জনপ্রিয়তা রয়েছে।
কীভাবে তৈরি হয় এই পাতলা রুটি?
রুমালি রুটি তৈরির পদ্ধতিও বেশ বিশেষ। সাধারণত আটা ও ময়দার নির্দিষ্ট অনুপাতে মণ্ড তৈরি করে সেটিকে খুব পাতলা করে বেলা হয়। এরপর উল্টে রাখা উত্তপ্ত লোহার কড়াইয়ের পিঠে দ্রুত কায়দায় সেঁকা হয় রুটি।রুটির পাতলাভাব, মণ্ড তৈরির কৌশল এবং সঠিকভাবে সেঁকার উপরই এর নরম ও মসৃণ স্বাদ অনেকটাই নির্ভর করে। তন্দুরি বা মুঘলাই খাবারের সঙ্গে পরিবেশন করলে এর স্বাদ আরও জমে ওঠে।

রুমালি রুটির ইতিহাস নিয়ে মতভেদও রয়েছে
রুমালি রুটির উৎপত্তি নিয়ে অবশ্য একাধিক মত রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, এর শিকড় ভারতীয় উপমহাদেশের পুরনো খাদ্যসংস্কৃতিতে রয়েছে। আবার পশ্চিম ও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলেও পাতলা রুটির নানা ধরন প্রচলিত ছিল। ফলে রুমালি রুটির প্রকৃত উৎস নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে সম্পূর্ণ একমত হওয়া যায়নি।তবে মুঘল রান্নার সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক যে রয়েছে, তা নিয়ে খাদ্যসংস্কৃতির আলোচনায় রুমালি রুটির নাম বারবার উঠে আসে।

মুঘল আমলের খাবারের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নানা চমকপ্রদ ইতিহাস ও লোককথা। তারই একটি হল রুমালি রুটি। কথিত আছে, মুঘল দরবারে তেল-মশলায় মাখামাখি হাত পরিষ্কার করতে এই পাতলা রুটিই ব্যবহার করা হত। অথচ সেই ‘রুমাল’ই আজ ভারতীয় রেস্তরাঁয় জনপ্রিয় ও দামি খাবার হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।








