ঐতিহ্য, ইতিহাস আর ধর্মীয় আবেগ— এই তিনের অনন্য মেলবন্ধন দেখা যায় মুর্শিদাবাদের লালবাগের নশিপুর আখড়ার রথযাত্রায়। একসময় হাতির পিঠে টানা রুপোর রথে জগন্নাথদেবের মাসির বাড়ি যাওয়ার যে প্রথা ছিল, আজ তা ইতিহাসের অংশ। তবুও শতাব্দী প্রাচীন সেই ঐতিহ্য এখনও অটুট। প্রতি বছর রথযাত্রায় হাজার হাজার ভক্ত ও পর্যটক এই বিরল রুপোর রথ একনজর দেখতে ভিড় জমান।বর্তমানে এই রথযাত্রা প্রায় আড়াইশো বছরেরও বেশি পুরনো ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।
পাঁচটি রথের মধ্যে কেন বিশেষ রুপোর রথ?
নশিপুর আখড়ার রথযাত্রায় মোট পাঁচটি রথ বের হয়—
দুটি কাঠের রথ
দুটি পিতলের রথ
একটি ঐতিহ্যবাহী রুপোর রথ
এই রুপোর রথই উৎসবের প্রধান আকর্ষণ। রথের দিন বিকেলে সোনার জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাকে এই রথে বসিয়ে শোভাযাত্রা বের করা হয়। কিছুক্ষণ পরিক্রমা শেষে সন্ধ্যার আগেই রথটি আবার আখড়ায় ফিরে আসে।
কীভাবে শুরু হল রুপোর রথের ইতিহাস?
আখড়া কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী—
প্রথমদিকে মোহন্ত চতুর্ভুজদাস আচারি দুটি কাঠের রথ তৈরি করে রথযাত্রার সূচনা করেন।
পরে ১৭৮৮ সালের দিকে মোহন্ত গোপালদাস আচারি দুটি পিতলের রথ নির্মাণ করান।
আনুমানিক ১৮২৫ সালে মোহন্ত ভগবানদাস আচারি রাজস্থান থেকে কারিগর এনে ঐতিহ্যবাহী রুপোর রথ তৈরি করান।
রথটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, হাতির অবয়ব, মাহুত এবং রথের বিভিন্ন অলঙ্করণ রুপোর উপর সোনার জল দিয়ে তৈরি, যা এর সৌন্দর্যকে আরও অনন্য করে তুলেছে।
একসময় জগৎ শেঠের বাড়িতেই যেত রথ
অতীতে রথযাত্রার দিনে আখড়া থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে জগৎ শেঠের বাড়ি পর্যন্ত রথ নিয়ে যাওয়া হত। সেখানে সাত দিন অবস্থানের পর উল্টো রথের দিন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাকে নিয়ে পুনরায় আখড়ায় ফিরিয়ে আনা হত।বর্তমানে গঙ্গার ভাঙনে জগৎ শেঠের সেই পুরনো বাড়ি বিলীন হয়ে গেলেও প্রাচীন প্রথা আজও বজায় রয়েছে। রথ ও উল্টো রথ— দুই দিনই পাঁচটি রথ জগৎ শেঠের বাড়ির পুরনো স্থানের সামনে নির্দিষ্ট মাঠে গিয়ে কিছুক্ষণ অবস্থান করে।
পর্যটকদের জন্য কী জানবেন?
রথযাত্রার দিন নশিপুর আখড়ায় ভক্ত ও পর্যটকদের ব্যাপক ভিড় হয়। নিরাপত্তারও কড়া ব্যবস্থা থাকে।
ভ্রমণে গেলে মাথায় রাখুন—
সকালে বেরোলে ভিড় এড়ানো সহজ।
রুপোর রথের শোভাযাত্রা সাধারণত বিকেলে শুরু হয়।
রথ ও উল্টো রথ— দুই দিনই মেলা বসে।
ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে গেলে পার্কিং ও যানজটের জন্য অতিরিক্ত সময় হাতে রাখুন।
রথযাত্রা মানেই পুরীর জগন্নাথদেবের কথা মনে পড়ে। তবে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের লালবাগের নশিপুর আখড়ার রথযাত্রারও রয়েছে প্রায় ২৫৫ বছরের ইতিহাস। এখানে পাঁচটি রথের মধ্যে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ রাজস্থানি কারিগরদের তৈরি রুপোর রথ, যেখানে রথের দিন সোনার জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাকে বসিয়ে শোভাযাত্রা বের করা হয়।












