জীবনের শুরুটা ছিল একেবারেই সাধারণ। বীরভূমের কীর্ণাহারের কাছের মিরিটির পরিচিত পরিবারের ছেলে ‘পল্টু’ই একদিন হয়ে উঠেছিলেন দেশের ত্রয়োদশ রাষ্ট্রপতি। শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা পেরিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ, তারপর জাতীয় রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ—প্রণব মুখোপাধ্যায়ের এই দীর্ঘ যাত্রায় ছিল একের পর এক বাঁক। রাজনৈতিক দক্ষতার জন্য যিনি পরবর্তীকালে ‘চাণক্য’ নামে পরিচিত হন, তাঁর সাফল্যের পিছনে ছিল দীর্ঘ পরিশ্রম ও অভিজ্ঞতার সঞ্চয়।
![]()
কীর্ণাহারের ‘পল্টু’ কে ছিলেন?
১৯৩৫ সালের ১১ ডিসেম্বর বীরভূমের মিরিটি গ্রামে জন্ম প্রণব মুখোপাধ্যায়ের। তাঁর পারিবারিক শিকড় কীর্ণাহারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। মুখোপাধ্যায় পরিবারের দুর্গাপুজোর দীর্ঘ ঐতিহ্যও রয়েছে। স্থানীয়দের কাছে আদরের ‘পল্টু’ নামে পরিচিত প্রণব মুখোপাধ্যায় নিজেও দুর্গাপুজোয় চণ্ডীপাঠ করতেন।তাঁর বাবা কামদাকিঙ্কর মুখোপাধ্যায় স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং দীর্ঘ সময় কারাবন্দিও ছিলেন। ফলে ছোটবেলা থেকেই রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের পরিচয় তৈরি হয়েছিল।
শিক্ষকতা থেকে সাংবাদিকতা
শিক্ষাজীবনেও প্রণব মুখোপাধ্যায়ের আগ্রহ ছিল একাধিক বিষয়ে। সিউড়ির বিদ্যাসাগর কলেজে পড়াশোনার সময় আইন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাস নিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেন তিনি। পরবর্তীতে সেই বিদ্যাসাগর কলেজেই অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে শিক্ষকতা করেন।এরপর সাংবাদিকতার জগতেও পা রাখেন। ‘দেশের ডাক’ সংবাদপত্রে প্রায় তিন বছর কাজ করেন তিনি। কিন্তু শিক্ষকতা কিংবা সাংবাদিকতা—কোনও পেশাতেই শেষ পর্যন্ত থেমে থাকেননি প্রণব মুখোপাধ্যায়।
কেন রাজনীতিতে এলেন?
রাজনৈতিক পরিবারের পরিবেশে বড় হয়ে ওঠার কারণে রাজনীতির সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল ছোট থেকেই। কংগ্রেসের সঙ্গে পারিবারিক সূত্রে তৈরি হয়েছিল ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। শেষ পর্যন্ত সেই রাজনৈতিক পরিবেশই তাঁকে সক্রিয় রাজনীতির দিকে নিয়ে যায়।১৯৬৯ সালে কংগ্রেসের প্রতিনিধি হিসেবে প্রথমবার রাজ্যসভায় প্রবেশ করেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। এরপর দীর্ঘ সময় সংসদীয় রাজনীতিতে নিজের জায়গা শক্ত করেন।
![]()
দিল্লির রাজনীতিতে দ্রুত উত্থান
১৯৭৩ সালে কেন্দ্রীয় শিল্পোন্নয়ন মন্ত্রকের দায়িত্ব পান প্রণব মুখোপাধ্যায়। এরপর ধীরে ধীরে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে তাঁর গুরুত্ব বাড়তে থাকে।১৯৮২ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত অর্থমন্ত্রকের দায়িত্বও সামলান তিনি। অর্থনৈতিক নীতি ও প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামলানোর ক্ষমতার জন্য দলের অভ্যন্তরে তাঁর গুরুত্ব ক্রমশ বৃদ্ধি পায়।
জঙ্গিপুর থেকে জাতীয় রাজনীতির আরও বড় মঞ্চে
২০০৪ সালে জঙ্গিপুর লোকসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হয়ে লোকসভায় প্রবেশ করেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। সেই সময় বাংলার রাজনীতিতে তাঁর সঙ্গে অধীর চৌধুরীর সমন্বয়ও আলোচনায় আসে।পরবর্তী সময়ে প্রতিরক্ষা, বিদেশ, জাহাজ ও পরিবহন-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। দেশের নীতিনির্ধারণের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে তাঁর ভূমিকা তাঁকে জাতীয় রাজনীতির অন্যতম অভিজ্ঞ নেতায় পরিণত করে।
শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ভবনে ‘পল্টু’
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় অধ্যায় আসে ২০১২ সালে। দেশের ত্রয়োদশ রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। এর মাধ্যমে তিনি হয়ে ওঠেন ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি।কীর্ণাহারের সাধারণ পরিবারের আদরের ‘পল্টু’ থেকে রাষ্ট্রপতি ভবনের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে পৌঁছনোর এই যাত্রা বাঙালির কাছে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত হয়ে থাকে।রাজনৈতিক বিচক্ষণতা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং জটিল পরিস্থিতিতে সমাধানের পথ খুঁজে নেওয়ার দক্ষতার কারণে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে বিশেষ পরিচিতি অর্জন করেছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে তাই জড়িয়ে রয়েছে একাধিক কঠিন পরিস্থিতি সামলানোর স্মৃতি।
![]()
আজও অনুপ্রেরণার নাম প্রণব মুখোপাধ্যায়
একেবারে সাধারণ পরিবেশ থেকে উঠে এসে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে পৌঁছনো প্রণব মুখোপাধ্যায়ের জীবন তাই শুধুই একজন রাজনীতিকের কাহিনী নয়। এটি দীর্ঘ পথ পেরিয়ে নিজের জায়গা তৈরি করার গল্পও।২০২০ সালের ৩১ আগস্ট প্রয়াত হন প্রণব মুখোপাধ্যায়। কিন্তু কীর্ণাহারের ‘পল্টু’ থেকে ভারতের রাষ্ট্রপতি হয়ে ওঠার তাঁর জীবনযাত্রা আজও বাংলার মানুষের কাছে গর্ব ও অনুপ্রেরণার অধ্যায় হয়ে রয়েছে।
![]()
বীরভূমের কীর্ণাহারের সাধারণ বাঙালি পরিবারের ছেলে প্রণব মুখোপাধ্যায় একসময় ছিলেন শিক্ষক ও সাংবাদিক। সেখান থেকে রাজনীতির ময়দানে এসে ধাপে ধাপে দেশের ত্রয়োদশ রাষ্ট্রপতির পদে পৌঁছন তিনি। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকে রাষ্ট্রপতি ভবনে পৌঁছনোর এই যাত্রা আজও বহু মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার।








