বিয়ের পর মেয়ের সম্পত্তির অধিকার কি পুরোপুরি শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়? এই ধারণা অনেকেরই রয়েছে। কিন্তু আইনের চোখে বিষয়টি এতটা সরল নয়। কোনও বিবাহিত মহিলা নিজের বাবার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বাড়ি বা জমির মালিক হলে, তাঁর মৃত্যুর পর সেই সম্পত্তি কার হাতে যাবে তা নির্ভর করবে সম্পত্তির উৎস, তাঁর সন্তান রয়েছে কি না এবং তাঁর মৃত্যুর সময় অন্যান্য উত্তরাধিকারী কারা জীবিত ছিলেন—এসব বিষয়ের উপর।
হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে কী বলা রয়েছে?
হিন্দু উত্তরাধিকার আইন, ১৯৫৬-এর ১৫ নম্বর ধারায় কোনও হিন্দু মহিলার মৃত্যুর পর তাঁর সম্পত্তির উত্তরাধিকার সংক্রান্ত নিয়ম নির্ধারণ করা হয়েছে। ১৬ নম্বর ধারায় সেই উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি কীভাবে যাবে, তার ক্রম নির্ধারিত হয়েছে।তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—মহিলার নিজের উপার্জন বা নিজস্বভাবে অর্জিত সম্পত্তি এবং বাবা-মায়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তির ক্ষেত্রে সবসময় একই উত্তরাধিকার-ক্রম প্রযোজ্য হয় না।
সন্তান থাকলে স্বামী ও সন্তানরা গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকারী
ধরা যাক, কোনও বিবাহিত মহিলা তাঁর বাবার কাছ থেকে একটি বাড়ি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন। পরে তাঁর মৃত্যু হল এবং তাঁর স্বামী ও সন্তান জীবিত রয়েছেন।এই ধরনের পরিস্থিতিতে, সাধারণ নিয়মে তাঁর সম্পত্তির উত্তরাধিকারীদের মধ্যে স্বামী ও সন্তানরা প্রথম সারিতে থাকেন। একাধিক সন্তান থাকলে আইন অনুযায়ী প্রত্যেকের অংশ নির্ধারিত হয়।অর্থাৎ, শুধু সম্পত্তিটি বাবার কাছ থেকে পাওয়া হয়েছিল বলেই মৃত্যুর পর সেটি সরাসরি ভাই-বোন বা বাপের বাড়ির অন্যান্য আত্মীয়ের কাছে চলে যাবে—এমন নয়।
সন্তান না থাকলে নিয়ম বদলে যেতে পারে
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি রয়েছে।
কোনও মহিলা সন্তানহীন অবস্থায় মারা গেলে এবং তিনি তাঁর বাবা বা মায়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে কোনও সম্পত্তি পেয়ে থাকলে, সেই সম্পত্তির উত্তরাধিকার-ক্রম আলাদা হতে পারে। হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের ১৫(২) ধারায় বাবা-মায়ের কাছ থেকে পাওয়া সম্পত্তির ক্ষেত্রে বিশেষ বিধান রয়েছে।এই পরিস্থিতিতে সম্পত্তি মহিলার বাবার উত্তরাধিকারীদের দিকে ফিরে যেতে পারে। ফলে তাঁর স্বামী জীবিত থাকলেও বাবার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া নির্দিষ্ট সম্পত্তির ক্ষেত্রে স্বামীর উত্তরাধিকার দাবি সবসময় অগ্রাধিকার পাবে না।তবে ঠিক কোন ব্যক্তি সম্পত্তি পাবেন, তা নির্ভর করবে মহিলার বাবা-মা, ভাই-বোন এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক উত্তরাধিকারী কারা জীবিত রয়েছেন এবং তাঁদের আইনগত অবস্থান কী—তার উপর।
নিজের কেনা সম্পত্তির ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
মহিলা যদি নিজের উপার্জনে কোনও বাড়ি, জমি বা অন্য সম্পত্তি কিনে থাকেন, সেটি বাবার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তির মতো একই নিয়মে সবসময় বিবেচিত হবে না।বিশেষ করে সন্তান না থাকা অবস্থায় তাঁর নিজস্বভাবে অর্জিত সম্পত্তির উত্তরাধিকার-ক্রম এবং বাবা-মায়ের কাছ থেকে পাওয়া সম্পত্তির উত্তরাধিকার-ক্রমের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে।তাই শুধু ‘মহিলা বিবাহিত ছিলেন’—এই একটি তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর মৃত্যুর পর সমস্ত সম্পত্তি স্বামীর পরিবার পাবে বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
স্বামী-স্ত্রী একই ঘটনায় মারা গেলে কী হবে?
আরও জটিল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে যদি স্বামী ও স্ত্রী একই দুর্ঘটনা বা ঘটনায় মারা যান এবং তাঁদের কোনও সন্তান না থাকে।এক্ষেত্রে কে আগে মারা গিয়েছেন, তা প্রমাণ করা সম্ভব কি না এবং সংশ্লিষ্ট উত্তরাধিকার আইন কীভাবে প্রযোজ্য হবে—এসব বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।বিশেষ করে মহিলার বাবার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তির ক্ষেত্রে আইন নির্ধারিত উত্তরাধিকার-ক্রম অনুসরণ করা হবে। ফলে শুধু স্বামী মারা গিয়েছেন বা স্বামী-স্ত্রী একই ঘটনায় মারা গিয়েছেন বলেই সম্পত্তি স্বামীর পরিবারের হাতে চলে যাবে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
সম্পত্তির দাবি করতে কোন নথি প্রয়োজন হতে পারে?
উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধ হলে সম্পত্তির উৎস এবং মালিকানা প্রমাণ করার জন্য বিভিন্ন নথি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যেমন—
সম্পত্তির মূল দলিল বা রেজিস্ট্রি সংক্রান্ত কাগজপত্র
উইল, দানপত্র বা উত্তরাধিকার সংক্রান্ত নথি
মহিলার মৃত্যুর শংসাপত্র
বিবাহের প্রমাণপত্র
জমি ও রাজস্ব সংক্রান্ত রেকর্ড
খতিয়ান বা অন্যান্য ভূমি-নথি
সম্পত্তিটি বাবা বা মায়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে এসেছিল—এমন প্রমাণ
উত্তরাধিকারীদের সম্পর্কের প্রমাণপত্র
গয়না বা অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রীর ক্ষেত্রে কেনার বিল, রসিদ, উপহার সংক্রান্ত প্রমাণ বা পরিবারের কাছে থাকা অন্যান্য নথিও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
আদালতে অধিকার কীভাবে দাবি করা যায়?
সম্পত্তি নিয়ে পরিবারের মধ্যে বিরোধ তৈরি হলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট দলিল ও উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করা জরুরি। প্রয়োজন হলে আইনজীবীর মাধ্যমে উত্তরাধিকার সনদ, সম্পত্তির রেকর্ড সংশোধন, মিউটেশন বা আদালতে উপযুক্ত আইনি পদক্ষেপের পথে এগোনো যায়।তবে কোন আইনি পদক্ষেপ প্রয়োজন হবে, তা সম্পত্তির ধরন, মালিকানার ইতিহাস, উইল রয়েছে কি না এবং পরিবারের জীবিত উত্তরাধিকারীদের উপর নির্ভর করে।
বিবাহিত কোনও মহিলার নামে থাকা বাবার কাছ থেকে পাওয়া বাড়ি, জমি বা অন্যান্য সম্পত্তি তাঁর মৃত্যুর পর স্বামীই সবসময় পাবেন—এমনটা নয়। হিন্দু উত্তরাধিকার আইন, ১৯৫৬-এর ১৫ ও ১৬ নম্বর ধারায় মহিলার সম্পত্তি মৃত্যুর পর কীভাবে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে যাবে, তার নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। বিশেষ করে সন্তান না থাকলে এবং সম্পত্তিটি বাবা বা মায়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া হলে নিয়মটি আলাদা হতে পারে।










