দামোদরের জলে হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস! পুরুলিয়ার রহস্যময় দেউলনগরী তেলকুপি ঘুরে দেখবেন কীভাবে?

পুরুলিয়ার তেলকুপি—দামোদর নদে ডুবে থাকা প্রাচীন জৈন দেউল, ইতিহাস ও প্রকৃতির অনন্য মেলবন্ধন। জানুন কীভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেন।

প্রকৃতির নীরবতা আর ইতিহাসের দীর্ঘশ্বাস—এই দুইয়ের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে রয়েছে পুরুলিয়ার তেলকুপি। দামোদর নদে নৌকায় ভেসে যেতে যেতে হঠাৎই চোখে পড়ে জলের বুক চিরে উঠে আসা প্রাচীন দেউল। একসময় যে জনপদ ছিল ধর্ম, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির কেন্দ্র, আজ তার বেশিরভাগই নদীর তলায় চাপা পড়ে আছে।

নৌকায় না চড়লে দেখা মিলবে না দেউলের

তেলকুপির দেউল দর্শনের একমাত্র ভরসা নৌকা। দামোদরের পাড়ে গাড়ি রেখে ঘণ্টাখানেক নৌকাভ্রমণ করলেই চোখে পড়বে একের পর এক প্রাচীন মন্দির। মাঝিদের দাঁড়ের ছন্দে এগিয়ে চলা নৌকার দোলায় দোলায় যেন ধীরে ধীরে খুলে যায় বাংলার এক বিস্মৃত অধ্যায়।

জলের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা তিন দেউল

এই অঞ্চলে একসময় প্রায় ২৫-২৬টি দেউল ছিল বলে ইতিহাস জানায়। পাঞ্চেত জলাধার নির্মাণের পর অধিকাংশই দামোদরের জলে তলিয়ে যায়। বর্তমানে কোনওরকমে টিকে রয়েছে মাত্র তিনটি দেউল—তার মধ্যেও একটি বছরের বেশিরভাগ সময়ই থাকে সম্পূর্ণ জলের নিচে।

কোথায় এই রহস্যময় তেলকুপি?

তেলকুপি অবস্থিত পুরুলিয়ার রঘুনাথপুর-২ ব্লকের চেলিয়ামা গ্রামের কাছে। চেলিয়ামা থেকে দূরত্ব আনুমানিক সাত থেকে আট কিলোমিটার। জলপথে দেউল দর্শনের এই অভিজ্ঞতা নতুন বছরের ছুটিতে পর্যটকদের বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠছে।

তেলকুপির নামের রহস্য

তেলকুপি নামের উৎপত্তি নিয়েও নানা মত রয়েছে। কেউ বলেন, ‘তৈলকম্প’ শব্দ থেকে এই নাম এসেছে—যেখানে ‘তৈল’ ছিল একধরনের কর। আবার অনেকে মনে করেন, অতীতে এটি ছিল কোনও গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী। এই নানা মতই তেলকুপিকে আরও রহস্যময় করে তোলে।

জৈন ধর্মের হারিয়ে যাওয়া কেন্দ্র

তেলকুপির দেউলগুলি মূলত জৈন মন্দির। একসময় বাংলায় জৈন ধর্মের বিস্তার যে যথেষ্ট গভীর ছিল, তার অন্যতম প্রমাণ এই স্থাপত্যগুলি। তবে দীর্ঘদিনের অযত্ন, জল আর সময়ের আঘাতে এই ঐতিহ্য আজ ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে।

পর্যটন বাড়লেও উদ্বেগ রয়ে গেছে

সাম্প্রতিক সময়ে ওয়েব সিরিজ় ও শুটিংয়ের সূত্রে তেলকুপিতে শহুরে মানুষের আনাগোনা কিছুটা বেড়েছে। তবুও পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ও সরকারি নজরদারি না থাকায় এই ঐতিহাসিক স্থাপত্য ভবিষ্যতে কতদিন টিকে থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

কীভাবে যাবেন তেলকুপি

তেলকুপির নিকটতম রেলস্টেশন আদ্রা (প্রায় ২৫ কিমি দূরে)। হাওড়া থেকে আদ্রাগামী একাধিক ট্রেন রয়েছে। সবচেয়ে সুবিধাজনক হাওড়া–আদ্রা–বোকারো প্যাসেঞ্জার, যা রাতে ছেড়ে ভোরে আদ্রা পৌঁছয়—দিনে তেলকুপি ঘুরে সহজেই ফেরা যায়।

কোথায় থাকবেন

তেলকুপিতে থাকার ব্যবস্থা নেই। রাত্রিবাসের জন্য আদ্রা বা রঘুনাথপুরে হোটেল ও অতিথিনিবাস পাওয়া যায়। এছাড়া প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের জয়চণ্ডী পর্যটন কেন্দ্র থেকেও দিনে তেলকুপি ঘুরে আসা সম্ভব।

পুরুলিয়ার দামোদর নদে নৌকাভ্রমণ করতে করতেই চোখে পড়ে একের পর এক প্রাচীন দেউল—জলের সঙ্গে লড়াই করে দাঁড়িয়ে থাকা ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। একসময় সমৃদ্ধ জৈন ধর্মকেন্দ্র তেলকুপি আজ নদীগর্ভে বিলীন প্রায়। নতুন বছরের ছুটিতে ইতিহাস আর প্রকৃতির মেলবন্ধন দেখতে চাইলে তেলকুপি হতে পারে আদর্শ গন্তব্য।

Leave a comment