নবদ্বীপে আজও ইতিহাসের সাক্ষী রানি রাসমণির কাছারি বাড়ি! ‘রানির ঘাট’ ঘিরে জাগে অতীতের স্মৃতি

নবদ্বীপের গোকুলানন্দ ঘাট রোডে অবস্থিত রানি রাসমণির কাছারি বাড়ি আজও বহন করছে বাংলার জমিদারি ও ঐতিহ্যের ইতিহাস। জানুন রানির ঘাট ও সেই ঐতিহাসিক স্থাপনার অজানা কাহিনি।

বাংলার ইতিহাসে রানি রাসমণির নাম উচ্চারিত হলেই সামনে আসে সমাজসেবা, ধর্মীয় সংস্কার এবং জমিদারি প্রশাসনের এক অনন্য অধ্যায়। সেই ইতিহাসেরই নীরব সাক্ষী হয়ে আজও নবদ্বীপের বুকে দাঁড়িয়ে রয়েছে তাঁর স্মৃতিধন্য কাছারি বাড়ি। গঙ্গার পুরনো খাত ‘ছাড়া গঙ্গা’র ধারে অবস্থিত এই স্থাপনা শুধু একটি পুরনো বাড়ি নয়, বরং বাংলার ঐতিহ্য ও ইতিহাসের জীবন্ত দলিল।

গোকুলানন্দ ঘাট রোডে ইতিহাসের ছাপ

হেরিটেজ তকমাপ্রাপ্ত নবদ্বীপ শহরের গোকুলানন্দ ঘাট রোডে অবস্থিত এই কাছারি বাড়ি একসময় ছিল রানি রাসমণির জমিদারি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। স্থানীয়দের মতে, এখান থেকেই পরিচালিত হত জমিদারির বিভিন্ন কাজকর্ম ও খাজনা আদায়ের ব্যবস্থা।কাছারি বাড়ির অন্দরেই রয়েছে রাসমণি সেবিত রাধাগোবিন্দ জিউ এবং গৌরাঙ্গ জিউর মন্দির, যা আজও ধর্মীয় গুরুত্ব বহন করে চলেছে।

‘ছাড়া গঙ্গা’র ধারে রানির স্মৃতি

কাছারি বাড়ির অন্যতম আকর্ষণ হল সিঁড়ি বাঁধানো সেই ঘাট, যা নেমে গিয়েছে ‘ছাড়া গঙ্গা’র ধার পর্যন্ত। কথিত রয়েছে, রানি রাসমণি এবং তাঁর জামাতা মথুরনাথ নৌকায় করে নবদ্বীপে এলে এই ঘাট দিয়েই কাছারি বাড়িতে প্রবেশ করতেন।এই ঘাট আজও স্থানীয় মানুষের কাছে ‘রানির ঘাট’ নামেই পরিচিত। ইতিহাসপ্রেমী ও পর্যটকদের কাছে এটি এক বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র।

ইতিহাসের পাতায় কাছারি বাড়ির উল্লেখ

নবদ্বীপ পুরাতত্ত্ব পরিষদের সম্পাদক শান্তিরঞ্জন দেব জানিয়েছেন, দেওয়ান কার্তিকেয় চন্দ্র রচিত ‘ক্ষিতিশবংশাবলী চরিত’ গ্রন্থে এই কাছারি বাড়ির উল্লেখ পাওয়া যায়। জমিদারি কেনার পর প্রশাসনিক সুবিধার জন্যই রানি রাসমণি নবদ্বীপে এই কাছারি বাড়ি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।ইতিহাসবিদদের মতে, নবদ্বীপে রাসমণির প্রভাব শুধুমাত্র ধর্মীয় ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না, সামাজিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

স্থানীয়দের স্মৃতিতে আজও জীবন্ত রানি রাসমণি

এলাকার প্রবীণ বাসিন্দাদের কথায়, একসময় নবদ্বীপের বহু মানুষ এই কাছারি বাড়িতে এসে খাজনা জমা দিতেন। পরবর্তীকালে জমিদারি প্রথা উঠে গেলেও কাছারি বাড়ির ঐতিহাসিক গুরুত্ব এতটুকুও কমেনি।স্থানীয় বাসিন্দা স্বপন দেবনাথ জানান, “লোকমাতা রানি রাসমণির সঙ্গে নবদ্বীপের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ছিল। তিনি বজরায় করে এই ঘাটেই আসতেন। সেই স্মৃতি আজও এই এলাকার মানুষ বয়ে বেড়াচ্ছেন।”

ঐতিহ্য সংরক্ষণের দাবি জোরালো

ইতিহাসপ্রেমীদের মতে, রানি রাসমণির এই কাছারি বাড়িকে আরও সংরক্ষণ ও পরিচর্যার প্রয়োজন রয়েছে। সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা গেলে এটি বাংলার ঐতিহ্য পর্যটনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

নবদ্বীপের গোকুলানন্দ ঘাট রোডে অবস্থিত রানি রাসমণির ঐতিহাসিক কাছারি বাড়ি আজও বহন করছে জমিদারি আমলের স্মৃতি। ‘ছাড়া গঙ্গা’র ধারে অবস্থিত এই হেরিটেজ স্থাপনায় রয়েছে রাধাগোবিন্দ জিউ ও গৌরাঙ্গ জিউর মন্দির। ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং বাংলার সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হয়ে আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে এই কাছারি বাড়ি।

Leave a comment