ইয়েমেনে হুথিদের দ্রুত বাড়তে থাকা সামরিক উপস্থিতি সৌদি আরবের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। পাকিস্তান ইয়েমেনে লড়াইয়ের জন্য সেনা পাঠাতে অস্বীকার করেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, হুথি হুমকি মোকাবিলায় রিয়াদ ইসরায়েলের কাছে গোয়েন্দা সহায়তা চেয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল ও বাব আল-মন্দেবের আশপাশে হুথিদের অগ্রগতির কথা উঠে এসেছে।
ইরান-সমর্থিত হুথিরা সাম্প্রতিক দিনগুলোতে লোহিত সাগরের পশ্চিম উপকূল এবং বাব আল-মন্দেবের আশপাশে তাদের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে। ১০ সেপ্টেম্বর হুথিরা কৌশলগত বন্দরনগরী মোখা দখল করে। এরপর মায়ুন বা পেরিম দ্বীপসহ হানিশ দ্বীপপুঞ্জের দিকে তাদের অগ্রগতির খবর সামনে আসে। এর ফলে বাব আল-মন্দেবের আশপাশে তাদের সামরিক ও সামুদ্রিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে।
বাব আল-মন্দেব লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে এবং এর মাধ্যমে জাহাজ সুয়েজ খাল হয়ে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে চলাচল করে। এই পথে দীর্ঘ সময় ধরে বাধা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল, জ্বালানি সরবরাহ এবং পণ্য পরিবহন ব্যয় প্রভাবিত হতে পারে।
মিডিয়া রিপোর্ট অনুযায়ী, সৌদি আরব হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক সহায়তার জন্য তার ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সহযোগী পাকিস্তানের কাছে সহযোগিতা চেয়েছিল। তবে পাকিস্তান ইয়েমেনে লড়াইয়ের জন্য নিজেদের সেনা পাঠাতে অস্বীকার করেছে।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, পাকিস্তান সৌদি আরবের আঞ্চলিক সীমান্ত ও ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষায় সহায়তা করতে প্রস্তুত থাকলেও ইয়েমেনের মাটিতে সরাসরি কোনো সামরিক অভিযানে অংশ নিতে চায় না। পাকিস্তানের এই অবস্থান দেশটিকে ইয়েমেনের সংঘাতে সরাসরি যুদ্ধরত পক্ষ হওয়া থেকে দূরে রাখে।
পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার প্রেক্ষাপটে বিষয়টি সামনে এসেছে। আগস্ট ২০২৬-এ পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট স্বাক্ষর করে। চুক্তিতে তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর বিধান রাখা হয়েছে।
তবে ১০ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, মক্কা চুক্তির মূল উদ্দেশ্য আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা জোরদার করা এবং পাকিস্তান ইয়েমেনের সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও শান্তির জন্য আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে।
পাকিস্তানের অবস্থানের পর সৌদি আরব অন্যান্য সহযোগিতার পথ খুঁজছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান হুথি-সংক্রান্ত হুমকি মোকাবিলায় ইসরায়েলের কাছে গোয়েন্দা সহায়তা চেয়েছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই যোগাযোগ সরাসরি কূটনৈতিক চ্যানেলের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বা CENTCOM-এর মাধ্যমে হয়েছে। আলোচনার মূল বিষয় ছিল বাব আল-মন্দেব ও আশপাশের এলাকায় হুথিদের সঙ্গে সম্পর্কিত হুমকি সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়।
সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে বর্তমানে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। তবে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই যোগাযোগকে বৃহত্তর সামরিক জোট বা আনুষ্ঠানিক নিরাপত্তা চুক্তি হিসেবে বর্ণনা করা হয়নি।
সৌদি আরব হুথিদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও সহযোগিতা চেয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রশাসন ইয়েমেনে সরাসরি বড় সামরিক অভিযানে জড়ানোর ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। এর পরিবর্তে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহযোগিতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ব্রিটেনসহ অন্যান্য দেশের ভূমিকা মূলত সামুদ্রিক নিরাপত্তা, পরামর্শ এবং গোয়েন্দা সহযোগিতাকে ঘিরে থাকার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
১০ সেপ্টেম্বর মোখা দখলের পর হুথিরা মায়ুন দ্বীপের দিকে তাদের উপস্থিতি বাড়ায়। পরবর্তী প্রতিবেদনে গ্রেটার হানিশ ও লেসার হানিশসহ কৌশলগত দ্বীপ এলাকায় হুথিদের নিয়ন্ত্রণ বা উপস্থিতির কথাও বলা হয়েছে।
আল জাজিরা সেন্টার ফর স্টাডিজের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে তাদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে এবং বাব আল-মন্দেবের আশপাশে সামুদ্রিক চলাচলে প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে উপকূলীয় এলাকায় সামরিক ঘাঁটি ও সরবরাহপথ রক্ষা করা পাহাড়ি এলাকার তুলনায় বেশি কঠিন হতে পারে বলে ওই বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাব আল-মন্দেব লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। সুয়েজ খালের মাধ্যমে এটি ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সামুদ্রিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশের সঙ্গে যুক্ত।
এই পথে জাহাজ চলাচল দীর্ঘ সময় বাধাগ্রস্ত হলে কোম্পানিগুলোকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে কেপ অব গুড হোপের পথ ব্যবহার করতে হতে পারে। এতে যাত্রার দূরত্ব, জ্বালানি খরচ এবং পণ্য পরিবহনের সময় বাড়তে পারে।
এর প্রভাব পশ্চিম এশিয়ার বাইরে ইউরোপ-এশিয়া বাণিজ্য, তেল ও অন্যান্য জ্বালানি সরবরাহ, কনটেইনার শিপিং এবং আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন ব্যয়ের ওপরও পড়তে পারে।
লোহিত সাগর ও বাব আল-মন্দেবে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা থাকলে ভারতসহ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য শিপিং ব্যয় বাড়তে পারে। জাহাজগুলোকে দীর্ঘ বিকল্প পথে চলতে হলে জ্বালানি ও বিমা খরচ বাড়ার সম্ভাবনা থাকবে।
সাম্প্রতিক হুথি অগ্রগতির মধ্যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও ওঠানামা দেখা গেছে। সৌদি আরবের জন্য বাব আল-মন্দেব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ লোহিত সাগর তার তেল রপ্তানি ও এশীয় বাজারে পৌঁছানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ।
ইয়েমেনে বর্তমান সংঘাত ২০১৪ সালে হুথিদের সানা দখলের পর বড় যুদ্ধে রূপ নেয়। ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন করে সামরিক অভিযান শুরু করে।
২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি ব্যাপক লড়াই কমাতে ভূমিকা রাখে। তবে সাম্প্রতিক হুথি সামরিক অগ্রগতির পর পশ্চিম ইয়েমেনে আবার সংঘাত তীব্র হয়েছে। জাতিসংঘ ও ত্রাণ সংস্থাগুলো বেসামরিক মানুষের বাস্তুচ্যুতি এবং মানবিক পরিস্থিতির অবনতির বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এক লাখের বেশি মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
সৌদি আরবের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি শুধু ইয়েমেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হুথিদের হামলার আশঙ্কা সৌদি শহর, সামরিক স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের ওপরও প্রভাব ফেলছে।
রিয়াদ পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, মিশর এবং অন্যান্য আঞ্চলিক অংশীদারের সঙ্গে বিভিন্ন স্তরে নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে কাজ করছে বলে প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে। ১৫ সেপ্টেম্বর সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান মিশরে গিয়ে লোহিত সাগর ও বাব আল-মন্দেবে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করেন। মিশর ইয়েমেনে সেনা পাঠানোর ঘোষণা দেয়নি।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে পাকিস্তানের ইয়েমেনে সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণের অবস্থান এবং সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে কথিত গোয়েন্দা সহযোগিতার বিষয়টি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক তৎপরতার আলোচনায় এসেছে।









