মাছ মানেই জল—ছোটবেলা থেকে এমনটাই শুনে এসেছি আমরা। কিন্তু প্রকৃতিতে এমন কিছু মাছ রয়েছে, যারা জলাশয় শুকিয়ে গেলেও সহজে হাল ছাড়ে না। শিং মাছ তাদের মধ্যে অন্যতম। গরমের সময় জলাশয়ের জল শুকিয়ে গেলে কাদামাটির নীচে আশ্রয় নিয়ে দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারে এই মাছ। শুধু তাই নয়, বিশেষ অঙ্গের সাহায্যে জল ছাড়াও বাতাস থেকে অক্সিজেন নিতে পারে শিং।
জল ছাড়াই কীভাবে শ্বাস নেয় শিং মাছ?
শিং মাছের বেঁচে থাকার অন্যতম রহস্য তার বিশেষ শ্বাসযন্ত্র। সাধারণ মাছ মূলত ফুলকার সাহায্যে জলে দ্রবীভূত অক্সিজেন গ্রহণ করে। কিন্তু শিং মাছের শরীরে অতিরিক্ত বায়ু-শ্বাসযন্ত্র রয়েছে, যা তাকে সরাসরি বাতাস থেকে অক্সিজেন নিতে সাহায্য করে।এই অভিযোজনের কারণেই জল কমে গেলেও বা মাছটি মাটির নীচে আশ্রয় নিলেও তার শ্বাস নেওয়ার ক্ষমতা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় না।
গরমে মাটির নীচে কেন ঢুকে যায়?
গ্রীষ্মকালে পুকুর, খাল-বিল বা ডোবার জল শুকোতে শুরু করলে শিং মাছ কাদামাটির নীচে আশ্রয় নেয়। সেখানে গর্ত তৈরি করে কিছুটা গভীরে ঢুকে পড়ে। এই অবস্থাকে বিজ্ঞানের ভাষায় এস্টিভেশন বা গ্রীষ্মনিদ্রা বলা হয়।শীতকালে কিছু প্রাণী যেমন হাইবারনেশনের মাধ্যমে নিজেদের শারীরিক কার্যকলাপ কমিয়ে দেয়, তেমনই প্রতিকূল গরম ও শুষ্ক পরিবেশে শিং মাছও নিজের শরীরের কার্যকলাপ অনেকটা ধীর করে ফেলে।
শরীরের মেটাবলিজমও হয়ে যায় ধীর
মাটির নীচে থাকার সময় শিং মাছের বিপাকক্রিয়া বা মেটাবলিজমের হার কমে যায়। হৃৎস্পন্দন ও শরীরের অন্যান্য কার্যকলাপও ধীর হয়ে আসে। ফলে তার শরীরে শক্তির চাহিদা কমে যায়।এই সময় বাইরে থেকে খাবার না পেলেও শরীরে সঞ্চিত শক্তি ব্যবহার করেই বেশ কিছুদিন টিকে থাকতে পারে মাছটি। অর্থাৎ প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে থাকার জন্য শিং মাছ যেন নিজের শরীরকেই ‘সেভিংস অ্যাকাউন্ট’-এর মতো ব্যবহার করে।
শুকিয়ে যায় না শরীর? রয়েছে আরও এক কৌশল
শিং মাছের শরীরের উপর থাকা আঠালো মিউকাসের আস্তরণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। এই আবরণ শরীরের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে এবং অতিরিক্ত জল হারানোর ঝুঁকি কমায়।শুষ্ক পরিবেশে শরীরের জল ধরে রাখার পাশাপাশি কিডনিও জল সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দীর্ঘ সময় প্রতিকূল পরিবেশে থাকার জন্য শরীরে একাধিক শারীরবৃত্তীয় অভিযোজন কাজ করে।
মাটির উপর দিয়েও চলতে পারে শিং মাছ!
শিং মাছকে আরও বিশেষ করে তুলেছে তার চলাফেরার ক্ষমতা। উপযুক্ত আর্দ্র পরিবেশে জল ছাড়াও মাটির উপর দিয়ে শরীর বাঁকিয়ে এগিয়ে যেতে পারে এই মাছ।বুকের পাখনাকে ভর হিসেবে ব্যবহার করে এবং শরীরকে এদিক-ওদিক বাঁকিয়ে সে সামনে এগোয়। বর্ষার শুরুতে নতুন জলাশয়ের খোঁজে এমনভাবেই শিং মাছ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পারে। একই ধরনের স্থলচলন ক্ষমতা কই মাছের মধ্যেও দেখা যায়।
প্রকৃতির সঙ্গে টিকে থাকার অসাধারণ অভিযোজন
শিং মাছের এই ক্ষমতাগুলি আসলে প্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার অসাধারণ উদাহরণ। জল শুকিয়ে যাওয়া, খাবারের অভাব কিংবা অতিরিক্ত গরম—প্রতিকূল পরিস্থিতিতে শরীরের শ্বাসযন্ত্র, ত্বক, বিপাকক্রিয়া এবং আচরণ একসঙ্গে কাজ করে তাকে টিকে থাকতে সাহায্য করে। সাধারণ মাছের মতো শুধু জলাশয়ের উপর নির্ভর না করে শিং মাছ পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার বিশেষ ক্ষমতা অর্জন করেছে।
পুকুর, খাল বা ডোবার জল শুকিয়ে গেলেও শিং মাছ দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে। শুধু তাই নয়, প্রয়োজনে ভেজা মাটির উপর দিয়ে চলেও এক জলাশয় থেকে অন্য জলাশয়ে পৌঁছতে পারে এই দেশি মাছ। এর পিছনে রয়েছে বিশেষ শ্বাসযন্ত্র, শরীরের জল ধরে রাখার ক্ষমতা এবং বিপাকক্রিয়া ধীর করে দেওয়ার আশ্চর্য কৌশল।













