রাতে ঘুমের মধ্যে হঠাৎ কথা বলে ওঠেন? কখনও আবার অস্পষ্ট শব্দ, বকবক কিংবা চিৎকারও শোনা যায়? পরিবারের সদস্যরা হয়তো বিষয়টি মজার ঘটনা হিসেবেই দেখেন। কিন্তু এই অভ্যাস যদি নিয়মিত হতে থাকে এবং তার সঙ্গে অস্বাভাবিক শারীরিক আচরণ যুক্ত হয়, তাহলে বিষয়টিকে একেবারে হালকাভাবে না দেখাই ভালো। বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু ক্ষেত্রে এই ধরনের আচরণ নির্দিষ্ট ঘুমের ব্যাধির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

ঘুমের মধ্যে কথা বলা আসলে কী?
ঘুমের মধ্যে কথা বলা বা বিড়বিড় করার চিকিৎসাবিজ্ঞানের নাম Somniloquy। এতে কেউ ঘুমের মধ্যে অস্পষ্ট শব্দ করতে পারেন, আবার কেউ সম্পূর্ণ বাক্যও বলতে পারেন। এটি ঘুমের বিভিন্ন পর্যায়েই ঘটতে পারে।মাঝে মধ্যে এমন ঘটনা ঘটলে সাধারণত কোনও গুরুতর শারীরিক সমস্যার সঙ্গে এর যোগ থাকে না। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই অভ্যাস অনেক সময় কমেও যায়।
মানসিক চাপ ও ঘুমের অভাবেও বাড়তে পারে সমস্যা
ঘুমের মধ্যে কথা বলার নির্দিষ্ট একটি কারণ নেই। মানসিক চাপ, উদ্বেগ, মানসিক ক্লান্তি কিংবা পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবের মতো বিষয় এর প্রবণতা বাড়াতে পারে। জ্বর বা ঘুমের রুটিনে পরিবর্তনের সঙ্গেও কোনও কোনও ক্ষেত্রে এমন ঘটনা দেখা যেতে পারে।তাই নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম এবং তুলনামূলক শান্ত জীবনযাপন ঘুমের গুণমান ভালো রাখতে গুরুত্বপূর্ণ।
ঘুমের মধ্যে বলা কথা মানেই মনের গোপন কথা নয়
অনেকে মনে করেন, একজন মানুষ ঘুমের মধ্যে যা বলেন, সেটিই হয়তো তাঁর স্বপ্ন বা মনের গভীরে থাকা চিন্তার প্রকাশ। কিন্তু এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক নয়।মেডিকেল কলেজ (কনৌজ)-এর কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডঃ ডি এস মার্তোলিয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, ঘুমের মধ্যে বলা কথা সবসময় ব্যক্তির স্বপ্নের কাহিনি বা বাস্তব চিন্তাভাবনার প্রতিফলন নয়। তাই শুধু ঘুমের মধ্যে বলা কিছু কথার ভিত্তিতে কারও মানসিক অবস্থা বা অনুভূতি বিচার করা উচিত নয়।
কখন ঘুমের মধ্যে কথা বলা নিয়ে সতর্ক হবেন?
মাঝে মধ্যে শুধু বিড়বিড় করা নিয়ে সাধারণত অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার প্রয়োজন নেই। তবে কিছু নির্দিষ্ট পরিবর্তন দেখা গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। যেমন—
হঠাৎ করে ঘুমের মধ্যে কথা বলার অভ্যাস শুরু হওয়া
আগের তুলনায় ঘটনা অনেক বেশি ঘন ঘন হওয়া
ঘুমের মধ্যে চিৎকার বা প্রচণ্ড শব্দ করা
হাত-পা ছোড়া বা আক্রমণাত্মক আচরণ করা
আচরণের কারণে নিজের বা পাশে থাকা ব্যক্তির আঘাত পাওয়ার আশঙ্কা থাকা
বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া
ঘুমের মধ্যে শ্বাস নিতে সমস্যা হওয়া
দিনের বেলায় অস্বাভাবিক রকম ঘুমঘুম ভাব থাকা
এই ধরনের লক্ষণ থাকলে কারণ খুঁজে দেখতে চিকিৎসক বা ঘুম বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

REM Sleep Behavior Disorder কী?
ঘুমের মধ্যে শুধু কথা বলা আর REM Sleep Behavior Disorder (RBD) এক বিষয় নয়। RBD-তে ব্যক্তি স্বপ্ন দেখার সময় অজান্তেই সেই স্বপ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত শারীরিক আচরণ করতে পারেন। যেমন চিৎকার করা, হাত-পা নাড়ানো বা মারধরের মতো আচরণ দেখা যেতে পারে।বিশেষ করে ঘুমের মধ্যে চিৎকার বা হিংস্র শারীরিক আচরণ নিয়মিত হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। কিছু ক্ষেত্রে RBD পরবর্তী সময়ে পারকিনসন্স রোগ বা ডিমেনশিয়ার মতো স্নায়বিক সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে ঘুমের মধ্যে কথা বলা বা অস্বাভাবিক আচরণ দেখলেই যে এই রোগগুলির কোনও একটি রয়েছে, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
অ্যালকোহল ও ক্যাফেইনেও নজর দিন
ঘুমের মান খারাপ করার মতো কিছু অভ্যাস ঘুম-সম্পর্কিত সমস্যাকে বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে অ্যালকোহল গ্রহণ ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ঘুমের সমস্যা থাকলে অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা বা এর ব্যবহার নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উপকারী হতে পারে।একইভাবে রাতে অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণও ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। চা, কফি বা অন্যান্য ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় বিশেষ করে সন্ধ্যার পর অতিরিক্ত না খাওয়াই ভালো।

মানসিক চাপ কমিয়ে ঘুমের রুটিন ঠিক রাখুন
স্ট্রেস ও অনিয়মিত ঘুম অনেকের ক্ষেত্রে ঘুমের বিভিন্ন সমস্যাকে বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া এবং ঘুমের আগে অতিরিক্ত মানসিক উত্তেজনা এড়িয়ে চলা গুরুত্বপূর্ণ।ধ্যান বা রিল্যাক্সেশন টেকনিকও মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে দীর্ঘদিন ধরে ঘুমের মধ্যে অস্বাভাবিক আচরণ চলতে থাকলে শুধু ঘরোয়া উপায়ে নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

ঘুমের মধ্যে কথা বলা, বিড়বিড় করা বা অস্পষ্ট শব্দ করা অনেকেরই হয়। মাঝে মধ্যে এমন হলে সাধারণত উদ্বেগের কারণ থাকে না। তবে আচরণটি ঘন ঘন হওয়া, হঠাৎ বেড়ে যাওয়া, চিৎকার, হিংস্র আচরণ, শ্বাসকষ্ট বা দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাবের মতো উপসর্গ থাকলে ঘুম-সম্পর্কিত কোনও সমস্যার ইঙ্গিত থাকতে পারে।







