Sleepwalking: ঘুমের মধ্যে চোখ খুলে হাঁটেন? ‘নিশির ডাক’ নয়, এর পিছনে থাকতে পারে এই কারণ, জানুন লক্ষণ ও করণীয়

ঘুমের মধ্যে উঠে হাঁটাহাঁটি বা কথা বলছেন? Sleepwalking বা Somnambulism-এর লক্ষণ, সম্ভাব্য কারণ, বাড়িতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন, জেনে নিন।

রাতের গভীর ঘুমে হঠাৎ বিছানা ছেড়ে উঠে হাঁটছেন কেউ। চোখ খোলা, অথচ আশপাশের মানুষ বা কথাবার্তায় কোনও প্রতিক্রিয়া নেই। সকালে জিজ্ঞেস করলেও রাতের সেই ঘটনার কথা কিছুই মনে করতে পারছেন না! এমন ঘটনা অনেকের কাছেই রহস্যময় মনে হতে পারে। বাংলায় লোকমুখে একে ‘নিশির ডাক’ বলার চল রয়েছে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটি Sleepwalking বা Somnambulism নামে পরিচিত একটি ঘুমের সমস্যা। কখনও এটি সাময়িক হতে পারে, আবার বারবার ঘটলে বা বিপজ্জনক আচরণের সঙ্গে যুক্ত হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

ঘুমের মধ্যে হাঁটা আসলে কী?

Sleepwalking এমন একটি অবস্থা, যেখানে একজন ব্যক্তি সম্পূর্ণভাবে জেগে না উঠেই বিছানা থেকে উঠে বসতে, হাঁটতে কিংবা কিছু সাধারণ কাজ করতে পারেন। এই সময় মস্তিষ্কের কিছু অংশ সক্রিয় থাকলেও ব্যক্তি পুরোপুরি সচেতন অবস্থায় থাকেন না।ঘুম ভাঙার পর অনেক ক্ষেত্রেই সেই ঘটনার কোনও স্মৃতি থাকে না। শুধু হাঁটা নয়, কেউ ঘুমের মধ্যে কথা বলা, পোশাক পরা বা অন্য সাধারণ কাজ করার মতো আচরণও করতে পারেন।

‘নিশির ডাক’ কি সত্যিই কোনও অলৌকিক বিষয়?

ঘুমের মধ্যে হাঁটাকে ঘিরে বিভিন্ন সমাজে নানা লোকবিশ্বাস রয়েছে। বাংলায় এমন ঘটনাকে অনেক সময় ‘নিশির ডাক’ বলা হয়। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এর ব্যাখ্যা ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত।অর্থাৎ এমন ঘটনা ঘটলে প্রথমেই অলৌকিক কোনও কারণ ধরে নেওয়ার পরিবর্তে ব্যক্তির ঘুমের ধরন, মানসিক চাপ, জীবনযাত্রা এবং অন্যান্য শারীরিক বিষয় খতিয়ে দেখা জরুরি।

কী কী লক্ষণ দেখলে বুঝবেন Sleepwalking হতে পারে?

ঘুমের মধ্যে হাঁটার ক্ষেত্রে একাধিক ধরনের আচরণ দেখা যেতে পারে। যেমন—

ঘুমন্ত অবস্থায় বিছানা থেকে উঠে হাঁটাহাঁটি করা।

বিছানায় উঠে বসে থাকা বা চারপাশে তাকানো।

কথা বলা হলেও অন্যের প্রশ্নের ঠিকমতো উত্তর না দেওয়া।

চোখ খোলা থাকলেও সম্পূর্ণ সচেতন না থাকা।

পোশাক পরা বা অন্য সাধারণ কাজ করার চেষ্টা করা।

কখনও ঘরের বাইরে চলে যাওয়ার চেষ্টা করা।

সকালে আগের রাতের ঘটনার কথা মনে না থাকা।

সব মানুষের ক্ষেত্রে লক্ষণ একরকম হয় না। তাই বারবার এমন ঘটনা ঘটলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

ঘুমের অভাব ও মানসিক চাপেও বাড়তে পারে সমস্যা

অনিয়মিত ঘুম, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপ ঘুমের বিভিন্ন সমস্যাকে প্রভাবিত করতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে পারিবারিক প্রবণতার সঙ্গেও Sleepwalking-এর সম্পর্ক থাকতে পারে।তাই নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস তৈরি করা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তবে ঘুমের মধ্যে হাঁটার নির্দিষ্ট কারণ প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে এক নয়।

সবচেয়ে বড় চিন্তা—নিরাপত্তা

Sleepwalking-এর সময় ব্যক্তি পুরোপুরি সচেতন না থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাওয়া, দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে যাওয়া বা জানালার কাছে চলে যাওয়ার মতো ঘটনা বিপজ্জনক হতে পারে।তাই বাড়িতে কেউ নিয়মিত ঘুমের মধ্যে হাঁটলে ঘুমের জায়গাটিকে যতটা সম্ভব নিরাপদ রাখা দরকার। ধারালো বা বিপজ্জনক জিনিস সরিয়ে রাখা, দরজা-জানালার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সিঁড়িতে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।

ঘুমের রুটিন ঠিক করুন

Sleepwalking-এর প্রবণতা থাকলে প্রথমেই ঘুমের অভ্যাসের দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমোতে যাওয়া এবং একই সময়ে ওঠার চেষ্টা করুন।ঘুমের আগে অন্তত কিছুটা সময় নিজেকে শান্ত করার জন্য রাখা যেতে পারে। হালকা বই পড়া, আরামদায়ক পরিবেশে থাকা বা উষ্ণ জলে স্নানের মতো রিল্যাক্সেশন রুটিন অনেকের ক্ষেত্রে ঘুমের প্রস্তুতিতে সহায়ক হতে পারে।

বাড়িতে কী কী নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখবেন?

বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে ঘুমের মধ্যে হাঁটার প্রবণতা থাকলে অভিভাবকদের বাড়তি সতর্ক থাকা দরকার।

ঘরের মেঝেতে বাধা তৈরি করে এমন জিনিস না রাখা।

ধারালো বা বিপজ্জনক বস্তু নিরাপদ জায়গায় রাখা।

দরজা ও জানালার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

সিঁড়ির কাছে প্রয়োজন হলে সেফটি গেট ব্যবহার করা।

দরজায় অ্যালার্ম বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যবহার করা যেতে পারে।

ঘুমের জায়গার আশপাশ যতটা সম্ভব নিরাপদ ও গোছানো রাখা।

কখন অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

মাঝেমধ্যে ঘুমের মধ্যে হাঁটার ঘটনা ঘটলেই সবসময় আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে যদি এটি বারবার হতে থাকে, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়, দিনের কাজকর্মে প্রভাব ফেলে অথবা ব্যক্তি নিজের কিংবা অন্যের জন্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করেন, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।বিশেষ করে বাইরে বেরিয়ে যাওয়া, সিঁড়ি বা জানালার কাছে বিপজ্জনকভাবে চলে যাওয়া কিংবা আঘাত পাওয়ার মতো ঘটনা ঘটলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। প্রয়োজনে চিকিৎসক বা ঘুমের সমস্যার বিশেষজ্ঞ কারণ খুঁজে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে পারেন।

ঘুমের মধ্যে উঠে হাঁটাহাঁটি করা, কথা বলা কিংবা কোনও কাজ করার পর সকালে কিছুই মনে না থাকা—এগুলি Sleepwalking বা Somnambulism-এর লক্ষণ হতে পারে। অনেক জায়গায় এই ঘটনাকে কুসংস্কারের কারণে ‘নিশির ডাক’ বলা হলেও এর সঙ্গে ঘুমের একটি নির্দিষ্ট সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে। ঘুমের অভাব, মানসিক চাপ, অনিয়মিত ঘুমের মতো বিষয় এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা, নিয়মিত ঘুমের সময় মেনে চলা এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

Leave a comment