নন্দীগ্রামে বিজেপির জয়ের পর কংগ্রেসকে নিশানা স্মৃতি ইরানির

নন্দীগ্রামে বিজেপির প্রার্থী হাসিরানি রথের জয়ের পর সাংবাদিক সম্মেলনে স্মৃতি ইরানি কংগ্রেসের নেতৃত্ব, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, নারী নিরাপত্তা এবং পশ্চিমবঙ্গ ও অসমের নির্বাচনী পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য রাখেন।

উপনির্বাচনের ফলাফলের মধ্যে বিজেপি নেত্রী স্মৃতি ইরানি সাংবাদিক সম্মেলন করে দলের জয় নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, গণতন্ত্র জনতার শক্তির মাধ্যমে ভিড়তন্ত্রকে জবাব দিয়েছে। পাশাপাশি, কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং নারী নিরাপত্তার মতো বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

পশ্চিমবঙ্গের নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী হাসিরানি রথ কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে ১,২২,৭৫৩ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছেন। স্মৃতি ইরানি এই ফলাফলকে বিজেপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেন। নন্দীগ্রাম দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে রয়েছে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রেই শুভেন্দু অধিকারী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করেছিলেন। ২০২৬ সালে শুভেন্দু অধিকারী আসনটি ছেড়ে দেওয়ার পর এখানে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

এবার তৃণমূল কংগ্রেস নিজেদের প্রার্থী সরিয়ে নেওয়ার পর কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থন করেছিল। তা সত্ত্বেও বিজেপি প্রার্থী বড় ব্যবধানে জয়ী হন। স্মৃতি ইরানি এই ফলাফলকে বিজেপির প্রতি জনগণের সমর্থনের প্রতিফলন হিসেবে তুলে ধরেন।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির রাজনৈতিক অবস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সুশাসনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে দল নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। তাঁর বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল, বিজেপি নিজেদের নির্বাচনী ফলাফলকে জনগণের আস্থার সঙ্গে যুক্ত করে দেখছে।

সাংবাদিক সম্মেলনে স্মৃতি ইরানি পশ্চিমবঙ্গের রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্র এবং অসমের নগাঁও লোকসভা কেন্দ্রের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, রেজিনগরে বিজেপি এগিয়ে ছিল। একই সঙ্গে নগাঁওয়েও গণনার প্রবণতা দলের অনুকূলে দেখা যাচ্ছিল বলে দাবি করেন তিনি।

রেজিনগরের প্রসঙ্গ বিশেষভাবে তুলে ধরে স্মৃতি ইরানি বলেন, এই কেন্দ্রে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটারদের উল্লেখযোগ্য অংশ রয়েছে। তাঁর মতে, এমন একটি নির্বাচনী কেন্দ্রে বিজেপির পারফরম্যান্স দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

তবে নির্বাচনী প্রবণতা এবং চূড়ান্ত ফলাফল এক নয়। ভোট গণনার সময় কোনও প্রার্থী এগিয়ে থাকলেই তাঁর চূড়ান্ত জয় নিশ্চিত হয় না। তাই এই কেন্দ্রগুলির বিষয়ে তাঁর বক্তব্যকে সাংবাদিক সম্মেলনের সময়কার পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

স্মৃতি ইরানি পশ্চিমবঙ্গ ও অসমের ভোটারদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, বিজেপি কর্মীরা যে সমর্থন পেয়েছেন, তাতে দলের মধ্যে উৎসাহ তৈরি হয়েছে। তিনি নির্বাচনী ফলাফলকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সাফল্য হিসেবেও তুলে ধরেন।

সাংবাদিক সম্মেলনে স্মৃতি ইরানি কংগ্রেসের রাজনৈতিক আদর্শ এবং নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের ১৫ জানুয়ারি ২০২৫ সালের একটি বক্তব্যের উল্লেখ করেন, যেখানে ভারতীয় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা বলা হয়েছিল।

বিজেপি নেত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ওই মন্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর অভিযোগ, এ ধরনের ভাষা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে রাজনৈতিক দলগুলির দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।

এই মন্তব্য বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মতপার্থক্যের অংশ। জাতীয় স্তরের একাধিক বিষয়ে দুই দলই পরস্পরের নীতি ও বক্তব্যের সমালোচনা করে আসছে। স্মৃতি ইরানি তাঁর বক্তব্যে কংগ্রেসের অবস্থানকে নিশানা করেন। তবে তাঁর অভিযোগের বিষয়ে কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়া পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা, সুরক্ষা ও শক্তিশালীকরণে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাঁর মতে, এই প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতি নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলির দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত।

স্মৃতি ইরানি তাঁর বক্তব্যে নারী নিরাপত্তার বিষয়টি তুলে ধরে কংগ্রেসের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (JNU)-এর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ঘটনার উল্লেখ করেন, যেখানে এক অধ্যাপকের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের অভিযোগের খবর প্রকাশিত হয়েছিল।

তাঁর অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট ঘটনায় কংগ্রেস নেতৃত্ব যথেষ্ট প্রতিক্রিয়া জানায়নি। বক্তব্যে তিনি রাহুল গান্ধী এবং কংগ্রেসের অন্যান্য নেতার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা এবং সেই অভিযোগ আইনিভাবে প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। এ ধরনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তদন্ত, উপলব্ধ প্রমাণ এবং সরকারি সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। স্মৃতি ইরানির মন্তব্য এই বিষয়ে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরে।

নারী নিরাপত্তার প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলির জবাবদিহির প্রসঙ্গ উত্থাপন করে তিনি বলেন, জনসমক্ষে স্লোগান দেওয়াই যথেষ্ট নয়। তাঁর মতে, এ ধরনের ঘটনায় পদক্ষেপ গ্রহণ এবং জবাবদিহির প্রশ্নেও রাজনৈতিক নেতৃত্বের স্পষ্ট অবস্থান থাকা উচিত। তবে অভিযোগ এবং সেগুলির জবাব স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কোনও রাজনৈতিক নেতার বক্তব্যকে সংশ্লিষ্ট ঘটনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।

স্মৃতি ইরানির সাংবাদিক সম্মেলনের মূল লক্ষ্য ছিল বিজেপি ও NDA-র প্রার্থীদের জয়কে গণতান্ত্রিক সমর্থনের প্রতিফলন হিসেবে তুলে ধরা। তিনি ভোটারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, পশ্চিমবঙ্গ ও অসমে দলের নির্বাচনী পারফরম্যান্সের উল্লেখ করেন এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ও নারী নিরাপত্তার মতো বিষয় নিয়ে কংগ্রেসকে প্রশ্ন করেন।

তাঁর বক্তব্যে নির্বাচনী ফলাফলের পাশাপাশি বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে চলমান রাজনৈতিক বিরোধও উঠে আসে। নন্দীগ্রামে বিজেপির বড় ব্যবধানে জয় এবং অন্যান্য কেন্দ্রে ভোট গণনার সময়কার পরিস্থিতি এই সাংবাদিক সম্মেলনকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।

Leave a comment