ভারতীয় সিনেমায় প্লেব্যাক গায়ক মানেই শুধু নিজের স্বর দিয়ে গানকে সুন্দর করে তোলা নয়। অনেক সময় গায়কের কণ্ঠকেও পর্দার অভিনেতার চরিত্র ও আবেগের সঙ্গে মিশে যেতে হয়। এই জায়গাতেই অনন্য ছিলেন এস পি বালাসুব্রহ্মণ্যম। কখনও রোমান্টিক নায়ক, কখনও শক্তিশালী অ্যাকশন তারকা—পর্দায় যে অভিনেতাই থাকুন না কেন, তাঁর সঙ্গে মানানসই করে নিজের কণ্ঠের আবেগ ও প্রকাশভঙ্গি বদলে নিতে পারতেন এসপিবি।
অভিনেতার ব্যক্তিত্ব বুঝে কণ্ঠ বদলাতেন
এস পি বালাসুব্রহ্মণ্যমের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর অসাধারণ কণ্ঠনিয়ন্ত্রণ। কোনও নির্দিষ্ট অভিনেতার জন্য গান গাওয়ার সময় তিনি শুধু সুর ও কথা অনুসরণ করতেন না, সেই অভিনেতার পর্দার ব্যক্তিত্বও মাথায় রাখতেন।ফলে একই গায়কের কণ্ঠ হলেও বিভিন্ন অভিনেতার ক্ষেত্রে তার উপস্থাপনায় আলাদা অনুভূতি পাওয়া যেত। এই ক্ষমতাই তাঁকে ভারতীয় প্লেব্যাক সংগীতের অন্যতম স্বতন্ত্র শিল্পী করে তুলেছিল।
সালমান খানের সঙ্গে তৈরি হয়েছিল বিশেষ জুটি
হিন্দি সিনেমার দর্শকদের কাছে এসপিবি সবচেয়ে বেশি পরিচিত হয়ে ওঠেন সালমান খানের কণ্ঠ হিসেবে। ১৯৮৯ সালের ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’ ছবিতে সালমানের জন্য তাঁর গাওয়া গানগুলি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।‘দিল দিওয়ানা’-র মতো গান সালমানের রোমান্টিক নায়ক হিসেবে পর্দার ভাবমূর্তির সঙ্গে গভীরভাবে মিশে যায়। এরপর ‘সাজন’, ‘হাম আপকে হ্যায় কৌন’-সহ একাধিক ছবিতে সালমানের জন্য গান গেয়েছেন এসপিবি।‘হাম আপকে হ্যায় কৌন’-এর ‘পহলা পহলা পেয়ার হ্যায়’ গানটিও সেই সময়ের রোমান্টিক আবহের সঙ্গে বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়েছিল।
কমল হাসানের জন্যও বদলেছে গানের ধরন
এসপিবির কণ্ঠের বহুমুখিতা শুধু হিন্দি সিনেমায় সীমাবদ্ধ ছিল না। দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রে তাঁর অবদান ছিল অত্যন্ত ব্যাপক। কমল হাসানের জন্যও তিনি বহু গান গেয়েছেন।কমল হাসানের চরিত্রের ধরন অনুযায়ী এসপিবি তাঁর গানের প্রকাশভঙ্গি বদলাতেন। ‘এক দুজে কে লিয়ে’ ছবির ক্ষেত্রেও তাঁর কণ্ঠ ব্যবহারে এমন অভিনয়ধর্মী বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়।
রজনীকান্তের পর্দার ব্যক্তিত্বের সঙ্গেও মানিয়ে যেত কণ্ঠ
দক্ষিণী সিনেমার আর এক মহাতারকা রজনীকান্তের সঙ্গেও এসপিবির কণ্ঠের দীর্ঘ সম্পর্ক ছিল। রজনীকান্তের ছবির গানগুলিতে তাঁর কণ্ঠে কখনও শক্তি, কখনও উদ্দীপনা, আবার কখনও আবেগের প্রকাশ দেখা যেত।অভিনেতার পর্দার উপস্থিতির সঙ্গে নিজের কণ্ঠের ভঙ্গি মিলিয়ে নেওয়ার এই ক্ষমতা তাঁর প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে বিশেষ পরিচয়ের অন্যতম কারণ।
পাঁচ দশকের কাছাকাছি দীর্ঘ সংগীতজীবন
এস পি বালাসুব্রহ্মণ্যম প্রায় পাঁচ দশক ধরে সংগীতজগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় গান গেয়ে তিনি শ্রোতাদের কাছে নিজের জায়গা তৈরি করেন। তাঁর কণ্ঠ শোনা গিয়েছে দক্ষিণ ভারতের বহু জনপ্রিয় অভিনেতার পর্দায়।প্রেমের গান থেকে শুরু করে বিষাদ, আবেগ কিংবা তারকাসুলভ শক্তিশালী উপস্থাপনা—বিভিন্ন ধরনের গানে নিজের কণ্ঠকে মানিয়ে নিতে পারতেন তিনি।
৪০ হাজারেরও বেশি গান, একাধিক জাতীয় পুরস্কার
এসপিবির সংগীতজীবনের পরিধিও ছিল বিশাল। তাঁর নামে ৪০ হাজারেরও বেশি গান রেকর্ড করার কৃতিত্বের কথা উল্লেখ করা হয়। বিভিন্ন ভাষায় তাঁর সংগীত প্রতিভার স্বীকৃতিও মিলেছে জাতীয় স্তরে।তাঁর গায়কির বিশেষত্ব ছিল শুধু বিপুল সংখ্যক গান গাওয়া নয়, প্রতিটি গানে পরিস্থিতি ও চরিত্র অনুযায়ী কণ্ঠের আবেগকে উপস্থাপন করা।
২০২০ সালে শেষ হয় কিংবদন্তির পথচলা
২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর প্রয়াত হন এস পি বালাসুব্রহ্মণ্যম। তাঁর মৃত্যু ভারতীয় সংগীতজগতে গভীর শূন্যতা তৈরি করে। তবে তাঁর গাওয়া অসংখ্য গান এবং অভিনেতার চরিত্র অনুযায়ী কণ্ঠ বদলে নেওয়ার অনন্য ক্ষমতা তাঁকে আজও শ্রোতাদের স্মৃতিতে জীবন্ত রেখেছে।
মহম্মদ রফি, কিশোর কুমার, লতা মঙ্গেশকর কিংবা আশা ভোঁসলের পাশাপাশি ভারতীয় চলচ্চিত্র সংগীতে এমন এক কিংবদন্তি ছিলেন, যিনি শুধু গান গাওয়ার জন্যই পরিচিত ছিলেন না। যে অভিনেতার জন্য গান গাইতেন, তাঁর পর্দার ব্যক্তিত্ব ও চরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কণ্ঠের উপস্থাপন বদলে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। তিনি হলেন এস পি বালাসুব্রহ্মণ্যম।







