দু’হাত নেই, তবু থামেননি! পায়ের আঙুলেই ব্ল্যাকবোর্ডে লেখেন প্রধান শিক্ষক জগন্নাথ, রথের আগে অনুপ্রেরণার এক অনন্য গল্প

পূর্ব বর্ধমানের প্রধান শিক্ষক জগন্নাথ বাউড়ি জন্ম থেকেই দুই হাতহীন। পায়ের সাহায্যে ব্ল্যাকবোর্ডে লেখেন, পড়ান এবং স্কুল পরিচালনা করেন। রথযাত্রার আগে জানুন তাঁর অনুপ্রেরণামূলক সাফল্যের গল্প।

রথযাত্রা মানেই ভগবান জগন্নাথের আরাধনা। তবে এ বছরের রথের আগে পূর্ব বর্ধমানের আর এক ‘জগন্নাথ’-এর গল্প ছুঁয়ে যাচ্ছে অসংখ্য মানুষকে। জন্মগতভাবে দুই হাত না থাকলেও নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি, অধ্যবসায় এবং আত্মবিশ্বাসের জোরে তিনি আজ একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। পায়ের আঙুলেই ব্ল্যাকবোর্ডে লেখেন, ছাত্রছাত্রীদের পড়ান এবং স্কুলের সমস্ত প্রশাসনিক দায়িত্বও সামলান সমান দক্ষতায়।

জন্মগত প্রতিবন্ধকতাকে হারিয়ে শিক্ষার আলো ছড়ানোর লড়াই

পূর্ব বর্ধমান জেলার আউশগ্রাম-১ ব্লকের বেলুটি গ্রামের বাসিন্দা জগন্নাথ বাউড়ি বর্তমানে জয়কৃষ্ণপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। জন্ম থেকেই তাঁর দুই হাত নেই। কিন্তু শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে কখনও নিজের স্বপ্নের পথে বাধা হতে দেননি।পায়ের আঙুলের সাহায্যে তিনি লেখেন, ডাস্টার চালান, ক্লাস নেন এবং প্রতিদিনের সমস্ত কাজ করেন। এমনকি খাওয়াদাওয়া, চা পান কিংবা প্রয়োজনীয় নথিপত্র লেখার কাজও তিনি পা দিয়েই সম্পন্ন করেন।

শুধু শিক্ষক নন, দক্ষ প্রশাসকও

জগন্নাথ বাউড়ি শুধু পাঠদানেই সীমাবদ্ধ নন। একজন প্রধান শিক্ষক হিসেবে বিদ্যালয়ের যাবতীয় প্রশাসনিক দায়িত্বও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন। স্কুলছুট কমাতে অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করেন, বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়াশোনার গুরুত্ব বোঝান এবং ছাত্রছাত্রীদের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহ দেন।সহকর্মীদের মতে, তাঁর কর্মনিষ্ঠা এবং আত্মবিশ্বাস গোটা স্কুলের জন্যই এক বড় অনুপ্রেরণা।

পুরীর রথে গিয়েও রশি টানেননি, কারণ...

জগন্নাথ বাউড়ি একবার বন্ধুদের সঙ্গে পুরীর রথযাত্রায় গিয়েছিলেন। সঙ্গীরা রথের রশি টানলেও তিনি নিজে তা করেননি।তাঁর কথায়, পা দিয়ে তিনি রশি টানতে পারলেও ভগবান জগন্নাথের প্রতি শ্রদ্ধাবশত সেই কাজ করেননি। এই সিদ্ধান্তের পিছনে ছিল তাঁর গভীর বিশ্বাস এবং ভক্তি, যা অনেকের মন ছুঁয়ে গিয়েছে।

পা দিয়েই লিখে পেয়েছিলেন শিক্ষকতার চাকরি

উচ্চমাধ্যমিকের পর শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন জগন্নাথ। সেই স্বপ্ন পূরণে কঠোর পরিশ্রম করেন। শিক্ষক নিয়োগের ইন্টারভিউতেও তিনি পায়ের সাহায্যে লিখে নিজের দক্ষতার পরিচয় দেন।২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে নিজের কর্মদক্ষতার জোরে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বও পান।

রথযাত্রার আগে নতুন করে অনুপ্রেরণার নাম জগন্নাথ

আজ জগন্নাথ বাউড়ির পরিচয় শুধু একজন শিক্ষক হিসেবে নয়, অদম্য মানসিক শক্তির প্রতীক হিসেবেও। প্রতিদিন নিজের কাজের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করছেন, শারীরিক সীমাবদ্ধতা কখনও মানুষের স্বপ্নকে আটকে রাখতে পারে না।রথযাত্রার আগে তাঁর এই জীবনসংগ্রামের কাহিনি সমাজকে নতুন করে সাহস, আত্মবিশ্বাস এবং ইতিবাচকতার বার্তা দিচ্ছে।

রথযাত্রাকে ঘিরে যখন চারদিকে ভগবান জগন্নাথের আরাধনার প্রস্তুতি চলছে, ঠিক সেই সময় পূর্ব বর্ধমানের এক বাস্তব জীবনের ‘জগন্নাথ’-এর গল্প নতুন করে অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে। জন্ম থেকেই দুই হাত না থাকলেও হার মানেননি জগন্নাথ বাউড়ি। পায়ের আঙুলকে হাতের বিকল্প বানিয়ে তিনি শুধু পড়াশোনাই শেষ করেননি, আজ সফলভাবে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাঠদান থেকে প্রশাসনিক কাজ—সবকিছুই তিনি অসাধারণ দক্ষতার সঙ্গে সামলে সমাজের কাছে দৃঢ় ইচ্ছাশক্তির এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠেছেন।

Leave a comment