সাবরিমালা ও সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় অধিকার মামলায় সুপ্রিম কোর্টে নয় বিচারপতির বেঞ্চের শুনানি শুরু

সুপ্রিম কোর্টের নয় বিচারপতির সাংবিধানিক বেকার সংক্রান্ত একাধিক প্রশ্নে শুনানি শুরু করেছে, যেখানে মসজিদে নারীদের নামাজ, দাউদি বোহরা সম্প্রদায়ে নারী খৎনা এবং পারসি নারীদের ধর্মীয় স্থানে প্রবেশসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচিত হচ্ছে।

কেরালার সাবরিমালা মন্দিরে নারীদের প্রবেশ সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের বিতর্কে সুপ্রিম কোর্টে আজ থেকে শুনানি শুরু হয়েছে। নয় বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ এই মামলার পাশাপাশি নারীদের ধর্মীয় অধিকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও বিবেচনা করবে। এর মধ্যে রয়েছে মসজিদে নারীদের নামাজ পড়ার অধিকার, দাউদি বোহরা সম্প্রদায়ে নারী খৎনা, এবং পারসি নারীদের ধর্মীয় স্থানে প্রবেশের প্রশ্ন।

এই শুনানি ৭ এপ্রিল থেকে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে, যেখানে ৫০টিরও বেশি আবেদনের উপর চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হবে।

সাবরিমালা বিতর্কে আস্থা ও সমতার সংঘাত

সাবরিমালা মন্দিরে ১০ থেকে ৫০ বছর বয়সী নারীদের প্রবেশ দীর্ঘদিন ধরে নিষিদ্ধ ছিল। এর পেছনে ধর্মীয় বিশ্বাস ছিল যে ভগবান অয়্যাপ্পা ব্রহ্মচারী, তাই প্রজননক্ষম বয়সের নারীদের মন্দিরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হতো না।

২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ ৪-১ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় এই নিষেধাজ্ঞাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে এবং সব বয়সের নারীদের প্রবেশের অনুমতি দেয়। আদালত এই সিদ্ধান্তকে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪ (সমতা) এবং অনুচ্ছেদ ২৫ (ধর্মীয় স্বাধীনতা)-এর প্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করে।

এই রায়ের পর কেরালায় ব্যাপক প্রতিবাদ হয়। সেই সময়ে বিন্দু কানাকদুর্গা এবং বিন্দু আম্মিনি কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে মন্দিরে প্রবেশ করেন, যার পর মন্দির শুদ্ধিকরণের জন্য ধৌত করা হয় এবং বিতর্ক আরও তীব্র হয়।

এই রায়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা পুনর্বিবেচনা আবেদনের উপর এখন নয় বিচারপতির বেঞ্চ শুনানি করছে, যা নির্ধারণ করবে ২০১৮ সালের রায় বহাল থাকবে কিনা অথবা তাতে পরিবর্তন আনা হবে।

পাঁচটি মূল প্রশ্নে সাংবিধানিক বেঞ্চের বিবেচনা

এই শুনানিকে শুধুমাত্র সাবরিমালা বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি; এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিস্তৃত সাংবিধানিক প্রশ্নগুলিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আদালত পাঁচটি প্রধান প্রশ্নে বিবেচনা করবে।

সব বয়সের নারীদের সাবরিমালা মন্দিরে প্রবেশাধিকার আছে কি না।

দাউদি বোহরা সম্প্রদায়ে নারী খৎনা মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন কি না।

মুসলিম নারীদের মসজিদে নামাজ পড়া থেকে বিরত রাখা যায় কি না।

অপারসি পুরুষকে বিবাহ করা পারসি নারীকে অগ্নিমন্দিরে প্রবেশে বাধা দেওয়া যায় কি না।

ব্যক্তিগত আইনগুলোকে সংবিধানের মৌলিক অধিকারের মানদণ্ডে বিচার করা যায় কি না।

এই সমস্ত বিষয় প্রায় ২৬ বছর ধরে বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন ছিল এবং এখন একত্রে সাংবিধানিক বেঞ্চের সামনে এসেছে।

১৯৯০ থেকে ২০২০: মামলার অগ্রগতির ক্রম

সাবরিমালা বিতর্কের সূচনা ১৯৯০-এর দশকে, যখন নারীদের প্রবেশ নিয়ে প্রথম আইনি চ্যালেঞ্জ উত্থাপিত হয়। ২০০৬ সালে সুপ্রিম কোর্ট এই বিষয়ে নোটিশ জারি করে এবং ২০০৮ সালে মামলাটি তিন বিচারপতির বেঞ্চে প্রেরণ করা হয়।

২০১৬ সালে পুনরায় শুনানি শুরু হয় এবং ২০১৭ সালে এটি পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চে পাঠানো হয়। ২০১৮ সালে নারীদের পক্ষে রায় দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে সাত বিচারপতির বেঞ্চ এই বিষয়টিকে বৃহত্তর সাংবিধানিক প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করে নয় বিচারপতির বেঞ্চে প্রেরণ করে।

১৩ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে আদালত স্পষ্ট করে যে তারা সরাসরি পুনর্বিবেচনা আবেদনের উপর নয়, বরং ধর্মীয় স্বাধীনতা (অনুচ্ছেদ ২৫) এবং সমতা (অনুচ্ছেদ ১৪)-এর মধ্যে ভারসাম্যের মতো বৃহত্তর নীতিগত প্রশ্ন বিবেচনা করবে। কোভিড-১৯ মহামারির কারণে শুনানি কিছু সময়ের জন্য স্থগিত ছিল, যা এখন পুনরায় শুরু হয়েছে।

বিভিন্ন পক্ষের অবস্থান

এই মামলায় কেন্দ্র সরকার, ধর্মীয় সংগঠন এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন মতামত উপস্থাপিত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে কেন্দ্র নারীদের প্রবেশের পক্ষে অবস্থান নিলেও পরবর্তীতে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান গ্রহণ করে।

ধর্মীয় সংগঠনগুলির বক্তব্য, আদালতের ধর্মীয় বিষয়ে সীমিত হস্তক্ষেপ করা উচিত। অন্যদিকে, আবেদনকারীদের দাবি, নারীদের প্রতি যে কোনও ধরনের বৈষম্য অসাংবিধানিক।

এই শুনানির প্রভাব সাবরিমালা মন্দিরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও লিঙ্গসমতার প্রশ্নে বৃহত্তর সাংবিধানিক পরিসরে বিবেচিত হচ্ছে।

 

Leave a comment