Swasthya Sathi CAG Report: রেশন কার্ডের তুলনায় স্বাস্থ্যসাথিতে ২১.৮০ লক্ষ বেশি পরিবার! CAG অডিটে ধরা পড়ল একাধিক গরমিল

স্বাস্থ্যসাথি প্রকল্পে রেশন কার্ডের তুলনায় ২১.৮০ লক্ষ বেশি পরিবার নথিভুক্তির তথ্য CAG অডিটে উঠে এসেছে। আধার, ডুপ্লিকেট কার্ড, সুবিধাভোগী যাচাই ও হাসপাতালের গ্রেডিং নিয়ে কী বলেছে রিপোর্ট, জানুন।

স্বাস্থ্যসাথি প্রকল্পের সুবিধাভোগী তালিকা থেকে শুরু করে হাসপাতালের গ্রেডিং—একাধিক স্তরে গরমিলের কথা উঠে এসেছে CAG-এর অডিট রিপোর্টে। ২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত রাজ্যে স্বাস্থ্যসাথিতে নথিভুক্ত পরিবারের সংখ্যা রেশন কার্ড থাকা পরিবারের তুলনায় প্রায় ২১.৮০ লক্ষ বেশি ছিল বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ছয়টি পরীক্ষিত জেলার মধ্যে পাঁচটিতে স্বাস্থ্যসাথির নথিভুক্ত পরিবার রেশন কার্ডধারী পরিবারের তুলনায় বেশি পাওয়া যায়। সুবিধাভোগীর যোগ্যতা যাচাই, আধার সংযোগ এবং হাসপাতালের প্যাকেজ নির্ধারণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে অডিট।

স্বাস্থ্যসাথিতে রেশন কার্ডের তুলনায় এত বেশি পরিবার কেন?

CAG-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, মার্চ ২০২৩ পর্যন্ত স্বাস্থ্যসাথি প্রকল্পে নথিভুক্ত পরিবারের সংখ্যা ছিল ২,৪৩,০৬,৫০৮। অন্যদিকে অগাস্ট ২০২৩ পর্যন্ত রেশন কার্ডধারী পরিবারের সংখ্যা ছিল ২,২১,২৭,০৬৩।অর্থাৎ দুই হিসাবের মধ্যে ব্যবধান প্রায় ২১,৭৯,৪৪৫ পরিবারের। CAG-এর পর্যবেক্ষণ, এই ধরনের ব্যবধানের কারণে অযোগ্য পরিবার প্রকল্পের সুবিধা নিয়ে থাকতে পারে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন ছিল।

পাঁচ জেলায় স্বাস্থ্যসাথির পরিবার বেশি

অডিটের আওতায় আসা ছয়টি জেলার মধ্যে পাঁচটিতেই স্বাস্থ্যসাথিতে নথিভুক্ত পরিবারের সংখ্যা রেশন কার্ডধারী পরিবারের চেয়ে বেশি ছিল।

রিপোর্টে উল্লেখ করা ব্যবধান অনুযায়ী—

মুর্শিদাবাদ: প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি

পূর্ব মেদিনীপুর: প্রায় ১৭ শতাংশ বেশি

বীরভূম: প্রায় ১৭ শতাংশ বেশি

হুগলি: প্রায় ৭ শতাংশ বেশি

উত্তর ২৪ পরগনা: প্রায় ৩ শতাংশ বেশি

অন্যদিকে জলপাইগুড়িতে স্বাস্থ্যসাথিতে নথিভুক্ত পরিবারের সংখ্যা রেশন কার্ডধারী পরিবারের তুলনায় কম ছিল। এত বড় ব্যবধানের নির্দিষ্ট কারণ নিয়ে আরও বিশদ যাচাই প্রয়োজন ছিল বলে CAG-এর রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্থায়ী বাসিন্দা এবং অন্য প্রকল্পের সুবিধা—যাচাই নিয়েও প্রশ্ন

স্বাস্থ্যসাথির সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে যোগ্যতার বিভিন্ন শর্ত ছিল। কিন্তু অডিটে আবেদনকারীর স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার নথি যাচাই এবং অন্য সরকারি স্বাস্থ্যবিমা বা স্বাস্থ্য নিশ্চয়তা প্রকল্পের সুবিধা নেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থায় ঘাটতির কথা বলা হয়েছে।CAG-এর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে স্বঘোষণার উপর নির্ভরতা ছিল। ফলে একই ব্যক্তি বা পরিবার অন্য সরকারি স্বাস্থ্য প্রকল্পের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসাথির তালিকাতেও থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল।

ডুপ্লিকেট কার্ড ঠেকাতেও ছিল ঘাটতি

অডিট রিপোর্টে আধারকে ব্যবহার করে বিভিন্ন সরকারি স্বাস্থ্য প্রকল্পের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে ডুপ্লিকেট সুবিধাভোগী শনাক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।রিপোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই ধরনের ডেটা মিলিয়ে দেখার ব্যবস্থা যথেষ্ট কার্যকর না থাকায় একই ব্যক্তি একাধিক প্রকল্পে বা একই পরিবারের একাধিক নথিভুক্তির ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল।

এক-সদস্যের পরিবার যাচাইয়ে বড় ফারাক

ছয়টি জেলায় ৩,৫৭,৬৭১টি এক-সদস্যের পরিবারের শারীরিক যাচাই করার কথা ছিল। কিন্তু যাচাই করা হয়েছিল মাত্র ৫৫,৯০৬টি পরিবার—অর্থাৎ প্রায় ১৫.৬৩ শতাংশ।এর মধ্যে ১১,৪৭২টি পরিবারকে অযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে, অযোগ্য হিসেবে শনাক্ত হওয়া পরিবারের তুলনায় মাত্র ৯৯০টি কার্ড ব্লক করা হয়েছিল।কিছু জেলার পরিসংখ্যানেও যাচাইয়ের হার অত্যন্ত কম ছিল বলে অডিটে উঠে এসেছে।

আধার সংযোগও সব জায়গায় সম্পূর্ণ হয়নি

ডুপ্লিকেট সদস্য শনাক্ত করার জন্য আধার সংযোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও পরীক্ষিত জেলাগুলিতে সব পরিবারের আধার সংযোগ সম্পূর্ণ হয়নি বলে CAG জানিয়েছে।

রিপোর্টে উল্লেখ করা পরিসংখ্যান অনুযায়ী আধার সংযোগ বাকি ছিল—

জলপাইগুড়ি: ২৩.৫৮ শতাংশ

মুর্শিদাবাদ: ১৫.২৬ শতাংশ

হুগলি: ৯.২৫ শতাংশ

বীরভূম: ৯.২২ শতাংশ

উত্তর ২৪ পরগনা: ৬.০৯ শতাংশ

পূর্ব মেদিনীপুর: ২.১৯ শতাংশ

অডিটের মতে, আধার সংযোগ অসম্পূর্ণ থাকলে ডুপ্লিকেট নথিভুক্তি শনাক্ত করা এবং অন্য সরকারি প্রকল্পের তথ্যের সঙ্গে ক্রস-চেক করা কঠিন হয়ে যায়।

হাসপাতালের গ্রেডিং নিয়েও CAG-এর পর্যবেক্ষণ

স্বাস্থ্যসাথি প্রকল্পে শুধু কার্ড বা সুবিধাভোগীর তালিকা নয়, হাসপাতালের গ্রেডিং এবং সেই অনুযায়ী প্যাকেজ রেট নিয়েও অডিটে অসঙ্গতির কথা বলা হয়েছে।রিপোর্ট অনুযায়ী, পরীক্ষা করা ৫০টি বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে ৩১টির গ্রেড পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন ছিল। নিচু গ্রেডের উপযুক্ত হাসপাতালকে উচ্চ গ্রেড দেওয়ার ফলে প্রায় ১৪.৪৮ কোটি টাকা অতিরিক্ত অর্থপ্রদানের হিসাবও অডিটে উঠে এসেছে।অন্যদিকে, ২৭টি সরকারি সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতাল Grade-A না হওয়ায় প্রায় ৪.৬৮ কোটি টাকা সম্ভাব্য রাজস্ব ঘাটতির কথা রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালনার নিয়ম নিয়েও প্রশ্ন

CAG-এর রিপোর্টে স্বাস্থ্যসাথি প্রকল্পের বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা এবং একটি সমন্বিত পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইনের ঘাটতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।প্রকল্পটি ২০১৭ সালে শুরু হলেও অডিটের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন নির্দেশিকা, বিজ্ঞপ্তি, চুক্তি, নোটশিট এবং বৈঠকের সিদ্ধান্তের মধ্যে নিয়মগুলি ছড়িয়ে ছিল। ফলে প্রকল্প পরিচালনায় একটি সমন্বিত কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি সামনে এসেছে।

পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্যসাথি প্রকল্প নিয়ে CAG-এর পারফরম্যান্স অডিট রিপোর্টে সুবিধাভোগী যাচাই, ডুপ্লিকেট কার্ড শনাক্তকরণ, আধার সংযোগ এবং হাসপাতালের গ্রেডিংয়ের মতো একাধিক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণের ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, মার্চ ২০২৩ পর্যন্ত স্বাস্থ্যসাথিতে নথিভুক্ত পরিবারের সংখ্যা রেশন কার্ডধারী পরিবারের তুলনায় প্রায় ২১.৮০ লক্ষ বেশি ছিল। পাশাপাশি হাসপাতালের গ্রেডিংয়ের কারণে অতিরিক্ত অর্থপ্রদানের বিষয়ও অডিটে উঠে এসেছে। তবে এই পর্যবেক্ষণগুলি অডিটে চিহ্নিত অনিয়ম বা নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি—এগুলিকে সরাসরি দুর্নীতি প্রমাণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়নি।

Leave a comment