বাড়ির উঠোন, বারান্দা কিংবা ছাদে তুলসী গাছ নেই, এমন বাড়ি খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু শীত পড়তে শুরু করলেই অনেকের প্রিয় তুলসী গাছের পাতা হলুদ হয়ে যায়, ঝরে পড়ে কিংবা ডালপালা শুকিয়ে যেতে থাকে। যত্ন নেওয়ার পরেও গাছ সতেজ থাকে না কেন? বাগান পরিচর্যার বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, ভুল পদ্ধতিতে জল দেওয়া এবং গাছের অপ্রয়োজনীয় ডালপালা ছাঁটাই না করার মতো বিষয়গুলি গাছের বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তাই শীত জাঁকিয়ে বসার আগেই জেনে নিন তুলসী গাছকে সবুজ ও ঝাঁকালো রাখার সহজ উপায়।
প্রথমেই টব ও মাটির দিকে নজর দিন
শীতকালে তুলসী গাছের পরিচর্যার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির মধ্যে একটি হল টবের জল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা। টবের নীচে পর্যাপ্ত ছিদ্র না থাকলে অতিরিক্ত জল জমে শিকড় পচে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর ফলে পাতা হলুদ হতে পারে এবং গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে।
তাই তুলসী গাছ এমন টবে রাখুন, যেখান থেকে অতিরিক্ত জল সহজেই বেরিয়ে যেতে পারে। মাটিও এমন হওয়া দরকার, যাতে জল জমে না থেকে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা বজায় থাকে।
মাটির গুণমান ভালো রাখতে পরিমিত পরিমাণে পচা গোবর সার বা ভার্মিকম্পোস্ট ব্যবহার করতে পারেন। তবে বারবার মাটি খুঁড়ে শিকড়ের ক্ষতি করবেন না এবং অকারণে রাসায়নিক সার ব্যবহার এড়িয়ে চলুন।
শীতে অতিরিক্ত জল দেওয়ার ভুল করবেন না
তুলসী গাছ শুকিয়ে যাচ্ছে দেখেই বারবার জল দেওয়া অনেকের অভ্যাস। কিন্তু শীতকালে মাটি শুকোতে তুলনামূলক বেশি সময় লাগতে পারে। সেই অবস্থায় অতিরিক্ত জল দিলে শিকড়ে বাতাস চলাচল ব্যাহত হয় এবং গাছের ক্ষতি হতে পারে।
জল দেওয়ার আগে টবের মাটি পরীক্ষা করুন। মাটির উপরের স্তর শুকনো মনে হলে এবং ভিতরেও আর্দ্রতা কম থাকলে প্রয়োজনমতো জল দিন। টবের নীচে জল জমে থাকলে তা সরিয়ে ফেলুন।
পাশাপাশি তীব্র ঠান্ডা ও হিমেল হাওয়া থেকে গাছকে বাঁচানোর চেষ্টা করুন। পর্যাপ্ত আলো-বাতাস পায় এমন জায়গায় রাখুন, তবে অতিরিক্ত ঠান্ডার সময় প্রয়োজন অনুযায়ী সুরক্ষিত স্থানে সরিয়ে নিন।
প্রথম কৌশল: গাছের ডগা ছেঁটে দিন
তুলসী গাছ লম্বা হয়ে উঠলেও যদি ডালপালা কম থাকে, তাহলে সঠিক সময়ে ডগা ছাঁটাই করলে নতুন শাখা গজাতে সাহায্য হতে পারে। গাছের বাড়তে থাকা ডগা সামান্য ছেঁটে দিলে পাশের কুঁড়ি থেকে নতুন ডাল বেরোনোর সুযোগ তৈরি হয়। ফলে গাছ আরও ঘন ও ঝাঁকালো হয়ে উঠতে পারে।
তবে ছাঁটাই করার সময় কয়েকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি:
- পরিষ্কার ও ধারালো কাঁচি ব্যবহার করুন।
- একবারে গাছের অনেকটা অংশ কেটে ফেলবেন না।
- শুকনো, হলুদ বা ক্ষতিগ্রস্ত পাতা সরিয়ে দিন।
- গাছ খুব দুর্বল থাকলে ভারী ছাঁটাই না করে আগে তার স্বাভাবিক বৃদ্ধি ফেরানোর চেষ্টা করুন।
শীতের আগে গাছের অবস্থা বুঝে হালকা ছাঁটাই করাই ভালো। অতিরিক্ত ছাঁটাই করলে গাছের উপর চাপ পড়তে পারে।
দ্বিতীয় কৌশল: পোকামাকড়ের আক্রমণ নিয়মিত পরীক্ষা করুন
তুলসী গাছের পাতায় ছোট পোকা, ডিম কিংবা পাতার নীচে অস্বাভাবিক দাগ দেখতে পেলে অবহেলা করবেন না। কিছু পোকা পাতার রস শুষে নেয়, আবার কিছু পোকা পাতা কেটে বা খেয়ে গাছের ক্ষতি করে। ফলে পাতা কুঁকড়ে যেতে পারে এবং নতুন ডালপালার বৃদ্ধি কমে যেতে পারে।
প্রতি কয়েক দিন অন্তর গাছের পাতা ও ডালের অংশ পরীক্ষা করুন। পোকা চোখে পড়লে হাতে বা পরিষ্কার কাঠির সাহায্যে সাবধানে সরিয়ে ফেলুন। আক্রান্ত পাতা বেশি হলে সেগুলিও ছেঁটে দেওয়া যেতে পারে।
প্রয়োজন হলে গাছের উপযোগী নিরাপদ ব্যবস্থা নিন। যেহেতু তুলসীপাতা অনেকেই খাবার বা পানীয় তৈরিতে ব্যবহার করেন, তাই কোনও কীটনাশক ব্যবহারের আগে তার নির্দেশাবলি ও অপেক্ষার সময় অবশ্যই মেনে চলুন।
জৈব সার ব্যবহার করুন, তবে পরিমাণ বুঝে
তুলসী গাছ সুস্থ রাখতে মাটিতে পর্যাপ্ত পুষ্টি থাকা জরুরি। এ ক্ষেত্রে ভালোভাবে পচানো গোবর সার বা ভার্মিকম্পোস্ট ব্যবহার করা যেতে পারে। এগুলি মাটির গঠন ও পুষ্টির জোগান উন্নত করতে সাহায্য করে।
তবে বেশি সার দিলেই গাছ দ্রুত ঘন হয়ে উঠবে, এমন নয়। অতিরিক্ত সার শিকড়ের ক্ষতি করতে পারে। তাই গাছের বৃদ্ধি, মাটির অবস্থা ও টবের আকার অনুযায়ী পরিমিত সার দিন।
মাটির উপরের স্তর শক্ত হয়ে গেলে সাবধানে আলগা করতে পারেন। শিকড়ের কাছে গভীরভাবে খোঁড়াখুঁড়ি করবেন না।
পর্যাপ্ত আলো ও ঠান্ডা থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা করুন
তুলসী গাছের সুস্থ বৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত আলো গুরুত্বপূর্ণ। শীতকালে যেখানে সম্ভব, সেখানে গাছকে দিনের আলো পাওয়া যায় এমন স্থানে রাখুন। তবে ঠান্ডা হাওয়া বা হিমের আশঙ্কা থাকলে গাছকে সুরক্ষিত জায়গায় সরিয়ে নেওয়া ভালো।
বিশেষ করে রাতের তাপমাত্রা অনেকটা কমে গেলে গাছের পাতায় ঠান্ডার প্রভাব পড়তে পারে। প্রয়োজনে গাছের চারপাশে সুরক্ষার ব্যবস্থা করুন। তবে এমনভাবে ঢেকে রাখবেন না, যাতে বাতাস চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় বা পাতায় অতিরিক্ত আর্দ্রতা জমে থাকে।
শীতের মরশুমে তীব্র ঠান্ডা, অতিরিক্ত জল এবং টবের মাটিতে জল জমে থাকার কারণে তুলসী গাছের পাতা হলুদ হয়ে ঝরে পড়তে পারে। কখনও গাছের ডালপালা শুকিয়ে যায়, আবার কখনও গাছ লম্বা হলেও পাতা ও নতুন শাখা কম হয়। তবে শীত আসার আগেই কয়েকটি বিষয়ে নজর দিলে তুলসী গাছকে অনেকটাই সুস্থ রাখা সম্ভব। সঠিক জল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা এবং গাছের ডগা ও শুকনো পাতা নিয়মিত ছেঁটে দেওয়া এই পরিচর্যার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাশাপাশি প্রয়োজন পরিমিত জল, জৈব সার এবং ঠান্ডা থেকে সুরক্ষা।













