যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কয়েক মাস ধরে চলা সামরিক উত্তেজনা ও সংঘাতের অবসান ঘটাতে একটি প্রাথমিক শান্তি সমঝোতা স্মারক (MoU)-এ সম্মতি জানিয়েছে। উভয় দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ফলাফল হিসেবে এই সমঝোতাকে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর উপস্থিতিতে এটি চূড়ান্ত করা হতে পারে।
সমঝোতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল ও গ্যাস পরিবহন এই কৌশলগত সমুদ্রপথের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। যুদ্ধ ও অবরোধের কারণে ব্যাহত এই পথ পুনরায় চালুর ঘোষণার পর বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই নৌ-নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে, যার ফলে সামুদ্রিক বাণিজ্য স্বাভাবিক হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট চুক্তি প্রসঙ্গে এক প্রকাশ্য বিবৃতিতে বলেন, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহকে পুনরায় স্বাভাবিক করার সময় এসেছে। তিনি ইঙ্গিতপূর্ণভাবে বলেন, বিশ্বের জাহাজগুলোকে এগিয়ে যেতে হবে এবং তেলের সরবরাহ বাধাহীনভাবে চলতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে তাঁর এই মন্তব্যকে নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ ও কূটনৈতিক নমনীয়তার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়েছে।
ইরান চুক্তি এগিয়ে নেওয়ার আগে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত উত্থাপন করেছে। তেহরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমে নিজেদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হবে, যার মধ্যে বিদেশে আটকে থাকা ইরানের কয়েক বিলিয়ন ডলারের তহবিল মুক্ত করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি ইরান সব সামরিক কার্যক্রম বন্ধ এবং সামুদ্রিক অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। ইরানের মতে, এই প্রাথমিক পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়িত হলেই পরবর্তী ৬০ দিনের আলোচনা এগিয়ে নেওয়া হবে।

মিডিয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, শান্তি সমঝোতার খসড়া প্রায় ১৪টি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধবিরতি, সামুদ্রিক বাণিজ্য পুনরুদ্ধার, নিষেধাজ্ঞায় শিথিলতা এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। খসড়া অনুযায়ী, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করবে, আর যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং আঞ্চলিক সামরিক উপস্থিতি কমানোর বিষয় বিবেচনা করবে। তবে উভয় দেশের মধ্যে একাধিক বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত ঐকমত্য হয়নি।
নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক জটিলতার কারণে চুক্তিতে ডিজিটাল পদ্ধতিতে স্বাক্ষরের সম্ভাবনাও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের মতে, প্রচলিত মুখোমুখি বৈঠকের পরিবর্তে ডিজিটাল স্বাক্ষর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতে পারে। একই সঙ্গে জেনেভায় একটি আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতিও চলছে, যেখানে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নিতে পারেন। এই প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট অথবা প্রেসিডেন্টের অংশগ্রহণ নিয়েও আলোচনা চলছে।
সম্ভাব্য এই শান্তি সমঝোতাকে বিভিন্ন দেশ স্বাগত জানিয়েছে। জাতিসংঘ, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, তুরস্ক, কাতারসহ অন্যান্য দেশ এটিকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার দিকে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করেছে। মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর ভূমিকাও প্রশংসিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মতে, চুক্তিটি কার্যকর হলে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা হ্রাস পেতে পারে।
চুক্তির খবরে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে এবং অপরিশোধিত তেলের দামে পতন রেকর্ড করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু হলে জ্বালানি সরবরাহ আরও স্থিতিশীল হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা কমবে। এর ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
যদিও এই ঘোষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, তবুও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনও অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার প্রক্রিয়া এবং নিরাপত্তা গ্যারান্টির মতো বিষয়ে এখনও বিস্তারিত সমঝোতা হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, চুক্তির বাস্তবায়ন এবং উভয় দেশের মধ্যে আস্থা বজায় রাখাই হবে পরবর্তী সময়ের প্রধান পরীক্ষা।










