জর্ডানে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রচেষ্টার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের একাধিক সামরিক স্থাপনায় বৃহস্পতিবার ভোরে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) নিশ্চিত করেছে যে অভিযানে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)-সংশ্লিষ্ট কমান্ড সেন্টার, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঘাঁটি, উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং নৌ-সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের দাবি, এ পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল অঞ্চলে মোতায়েন মার্কিন সেনা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অন্যদিকে ইরান এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে তাদের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযানের আগে ও পরে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ইরানের দিক থেকে নিক্ষেপ করা পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সফলভাবে আকাশেই ধ্বংস করেছে। তবে হামলার প্রচেষ্টাকে যুক্তরাষ্ট্র উপেক্ষা করবে না বলেও তিনি জানান।
ট্রাম্প বলেন, মার্কিন সেনা বা মিত্র দেশগুলোর নিরাপত্তা বিপন্ন করার চেষ্টা অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্র আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নিতে পিছপা হবে না। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে ভবিষ্যতে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
CENTCOM-এর তথ্য অনুযায়ী, অভিযানে ইরানের একাধিক কৌশলগত সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে ছিল IRGC-এর কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট, ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, উপকূলীয় প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক এবং নৌ-সামরিক অবকাঠামো-সংশ্লিষ্ট স্থাপনা।
মার্কিন সেনাবাহিনীর দাবি, এসব স্থাপনা অঞ্চলজুড়ে মার্কিন বাহিনী ও আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক চলাচলের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত হচ্ছিল।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আবাদান, বুশেহর, বান্দার আব্বাস, আবু মুসা, কিশ এবং কেশম দ্বীপসহ একাধিক এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। বুশেহর প্রদেশকে বিশেষভাবে সংবেদনশীল এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কারণ সেখানে ইরানের প্রধান পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অবস্থিত।
তবে ইরানি কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করেনি যে সব বিস্ফোরণ সরাসরি মার্কিন হামলার ফল ছিল কি না। একাধিক স্থানে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো তদন্ত শুরু করেছে।
হামলার সময় কেশম দ্বীপের একটি আবাসিক ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানীয় প্রশাসনের মতে, ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে কয়েকজন আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উদ্ধারকারী দল তাৎক্ষণিকভাবে ত্রাণ ও উদ্ধার অভিযান শুরু করে এবং আহত দুই শিশুকে হাসপাতালে পাঠায়। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিখোঁজদের অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। বেসামরিক এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির স্বাধীনভাবে নিশ্চিতকরণ এখনো সম্ভব হয়নি।
CENTCOM পরে ঘোষণা করে যে ইরানের বিরুদ্ধে নির্ধারিত সামরিক অভিযান সম্পন্ন হয়েছে। মার্কিন সেনাবাহিনীর দাবি, এই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল ইরানের এমন সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা, যা মার্কিন সেনা, বাণিজ্যিক জাহাজ এবং আঞ্চলিক মিত্রদের জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র আরও জানিয়েছে, তাদের এই পদক্ষেপ বৃহত্তর যুদ্ধ শুরুর উদ্দেশ্যে নয়; বরং সাম্প্রতিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের জবাবে নেওয়া সামরিক প্রতিক্রিয়া।

আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব ইরাকে ইরান-সমর্থিত পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্স (PMF)-এর অবস্থানে যৌথ বিমান হামলা চালিয়েছে বলেও খবর প্রকাশিত হয়েছে।
PMF-এর দাবি, এসব হামলায় অন্তত ২০ জন যোদ্ধা নিহত হয়েছেন এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন। এসব ঘটনার ব্যাপকভাবে নিশ্চিতকরণ হলে তা সমগ্র পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
উত্তেজনার মধ্যে মিসরের দামিয়েত্তা বন্দরে একটি মার্কিন গ্যাস সংরক্ষণ ট্যাংকারকে ড্রোন দিয়ে লক্ষ্যবস্তু করার খবর পাওয়া গেছে। হামলার পর জাহাজে আগুন লাগলেও স্থানীয় প্রশাসন ও দমকল বাহিনী দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
ঘটনার তদন্ত চলছে এবং এখন পর্যন্ত কোনো সংগঠন এ হামলার দায় স্বীকার করেনি।
ইরানের নৌবাহিনী জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি এবং এর আশপাশের সামুদ্রিক অঞ্চলের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ নিরাপদে চলাচল করতে পারবে না।
এই বক্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের দৃষ্টিকোণ থেকে এই সামুদ্রিক পথের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ বৃদ্ধি পেয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এ পথের চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যে ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে।
উত্তেজনা বৃদ্ধির মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের বাজারে তীব্র ওঠানামা দেখা গেছে। প্রাথমিক লেনদেনে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৯০ ডলার প্রতি ব্যারেলে পৌঁছালেও পরে তা কিছুটা কমে প্রায় ৮৯.৪৫ ডলার প্রতি ব্যারেলে লেনদেন হতে দেখা যায়।
অন্যদিকে WTI ক্রুডের দামও কমে প্রায় ৮৩.৯০ ডলার প্রতি ব্যারেলে নেমে আসে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, আঞ্চলিক সংঘাত আরও বাড়লে বা হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হলে তেলের দাম আবারও দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আবারও বৈশ্বিক উদ্বেগের বিষয় করে তুলেছে। ধারাবাহিক সামরিক পদক্ষেপ, পাল্টা সতর্কবার্তা এবং কৌশলগত সামুদ্রিক রুটে বাড়তি তৎপরতা আন্তর্জাতিক বাজার, জ্বালানি সরবরাহ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমানে নজর রয়েছে, আগামী দিনে উভয় পক্ষ সামরিক পদক্ষেপ আরও এগিয়ে নেয় নাকি উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে অগ্রাধিকার দেয়।








