মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে ট্রাম্প প্রশাসনের থার্ড-কান্ট্রি ডিপোর্টেশন নীতি বহাল, শুনানি ডিসেম্বর

মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনকে আপাতত অভিবাসীদের তৃতীয় দেশে নির্বাসনের নীতি চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। নীতিটির আইনি বৈধতা নিয়ে ডিসেম্বর ২০২৬-এ শুনানি হবে।

মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনকে আপাতত অভিবাসীদের নিজ নিজ মূল দেশে ফেরত পাঠানোর পরিবর্তে তৃতীয় কোনো দেশে দ্রুত নির্বাসনের নীতি চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। তবে আদালত এই নীতিকে এখনও বৈধ ঘোষণা করেনি। নীতিটির বৈধতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট ডিসেম্বর ২০২৬-এ মৌখিক যুক্তি শুনবে।

মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনকে আইনি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ দিয়ে অভিবাসীদের মূল দেশের পরিবর্তে তৃতীয় কোনো দেশে নির্বাসনের নীতি আপাতত চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। শীর্ষ আদালত ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ নিম্ন আদালতের সেই আদেশ স্থগিত করেছে, যার মাধ্যমে এই প্রক্রিয়ার ওপর আইনি বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। তবে সুপ্রিম কোর্ট এখনও নীতিটির বৈধতা নির্ধারণ করেনি। এ-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্নে ডিসেম্বর ২০২৬-এ শুনানি হবে।

সুপ্রিম কোর্টের সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী, আদালত ট্রাম্প প্রশাসনের জরুরি আবেদন গ্রহণ করে ম্যাসাচুসেটসের ফেডারেল জেলা আদালতের ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর আদেশ ও রায় স্থগিত করেছে। আদালত মামলাটি শুনানির জন্যও গ্রহণ করেছে।

এই নীতির আওতায় মার্কিন সরকার এমন কিছু অভিবাসীকে তাদের মূল দেশের পরিবর্তে অন্য কোনো দেশে পাঠাতে পারে, যাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত নির্বাসন আদেশ জারি হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য, কোনো ব্যক্তিকে তার মূল দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব না হলে বা সংশ্লিষ্ট দেশ তাকে গ্রহণ না করলে এই ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়।

সরকারের দাবি, তৃতীয় দেশের সরকারগুলোর কাছ থেকে এই নিশ্চয়তা নেওয়া হয় যে নির্বাসিত ব্যক্তিদের সেখানে নির্যাতন বা নিপীড়নের মুখোমুখি হতে হবে না।

অন্যদিকে, অভিবাসীদের পক্ষে কাজ করা আইনজীবী এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই ব্যবস্থার প্রশ্ন তুলেছে। তাদের যুক্তি, কাউকে তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানোর আগে তার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত আপত্তি জানানোর পর্যাপ্ত সুযোগ থাকা উচিত, বিশেষ করে সেখানে নির্যাতন বা অত্যাচারের ঝুঁকি থাকলে।

মামলাটি মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ বনাম D.V.D. ও অন্যান্য নামে সুপ্রিম কোর্টে রয়েছে। শীর্ষ আদালত নিম্ন আদালতের আদেশ আপাতত কার্যকর হওয়া থেকে স্থগিত করেছে।

সুপ্রিম কোর্টের আদেশের বাস্তব অর্থ হলো, মামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসন তৃতীয় দেশে নির্বাসন-সংক্রান্ত নীতি চালিয়ে যেতে পারবে। তবে এই অন্তর্বর্তী সিদ্ধান্ত নীতিটির চূড়ান্ত সাংবিধানিক বা আইনি বৈধতা নির্ধারণ করে না।

সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, মামলায় একাধিক আইনি প্রশ্ন বিবেচনা করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে জেলা আদালতের অভিবাসীদের দাবির শুনানি করার এখতিয়ার ছিল কি না এবং আদালত বৃহত্তর পরিসরে ত্রাণমূলক আদেশ জারি করতে পারত কি না।

সুপ্রিম কোর্ট মামলাটি ডিসেম্বর ২০২৬-এর মৌখিক যুক্তি উপস্থাপনের অধিবেশনে তালিকাভুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছে। আদালত বিবেচনা করবে, মার্কিন সরকারের থার্ড-কান্ট্রি রিমুভাল গাইডেন্স ফেডারেল অভিবাসন আইন, মার্কিন সংবিধানের Due Process Clause অথবা নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রযোজ্য আইনি বিধান লঙ্ঘন করে কি না।

এছাড়া আদালত পরীক্ষা করবে, নিম্ন আদালতের এই মামলায় এখতিয়ার ছিল কি না এবং পুরো শ্রেণির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিস্তৃত ত্রাণ দেওয়ার ক্ষমতা তাদের ছিল কি না।

ফলে ডিসেম্বরের শুনানি শুধু নির্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এতে ফেডারেল আদালতের ক্ষমতা এবং প্রশাসনের অভিবাসন-সংক্রান্ত আইনি সীমা নিয়েও প্রশ্ন বিবেচনা করা হবে।

সুপ্রিম কোর্টের আদেশ অনুযায়ী, বিচারপতি সোনিয়া সোতোমেয়র, বিচারপতি এলেনা কাগান এবং বিচারপতি কেতানজি ব্রাউন জ্যাকসন ট্রাম্প প্রশাসনকে স্টে দেওয়ার পক্ষে ছিলেন না। তারা প্রশাসনের আবেদন খারিজ করার পক্ষে মত দেন।

আদালতের অন্য ছয় বিচারপতি নিম্ন আদালতের রায় স্থগিত করার প্রশাসনের আবেদন গ্রহণ করেন। সুপ্রিম কোর্টের সরকারি ডকেটে তিন ভিন্নমত পোষণকারী বিচারপতির নাম উল্লেখ রয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসন আদালতে তাদের যুক্তির সময় জানিয়েছিল, নিম্ন আদালতের আদেশের কারণে প্রায় ৭০ জনকে তিনটি দেশে নিয়ে যাওয়ার একটি নির্বাসন ফ্লাইট বাতিল করতে হয়েছিল।

প্রশাসন নীতিটিকে মার্কিন অভিবাসন আইন কার্যকর করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি উপায় হিসেবে বর্ণনা করেছে। অন্যদিকে, অভিবাসীদের আইনজীবীদের বক্তব্য, পর্যাপ্ত আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে এমন কোনো দেশে পাঠানো হলে গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

রয়টার্সের মতে, এই নীতির আওতায় ২৫,০০০-এর বেশি মানুষকে তৃতীয় দেশে পাঠানো হয়েছে এবং বিপুল সংখ্যক মানুষকে মেক্সিকোতে পাঠানো হয়েছে।

থার্ড-কান্ট্রি ডিপোর্টেশন নিয়ে মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। জাতিসংঘ-সংশ্লিষ্ট স্বাধীন মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রকে এই নীতি বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাদের বক্তব্য ছিল, তৃতীয় দেশে নির্বাসনের ফলে কিছু অভিবাসীর ক্ষেত্রে নিপীড়ন ও নির্যাতনের মতো মানবাধিকার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

অভিবাসীদের প্রতিনিধিত্বকারী আইনজীবী ট্রিনা রিয়েলমুটোও বলেছেন, সুপ্রিম কোর্টের অন্তর্বর্তী আদেশ নীতিটিকে আইনি ঘোষণা করা কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। সুপ্রিম কোর্টের রেকর্ডে রিয়েলমুটোকে এই মামলায় প্রতিপক্ষের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য, যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে চূড়ান্ত নির্বাসন আদেশ রয়েছে এবং যাদের মূল দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব নয়, তাদের ক্ষেত্রে তৃতীয় দেশের বিকল্প প্রয়োজনীয়।

প্রশাসন এই ব্যবস্থাকে তার বৃহত্তর অভিবাসন প্রয়োগ নীতির অংশ হিসেবে দেখছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নির্বাসন অভিযান অভিবাসন নীতির একটি প্রধান অংশ হয়ে রয়েছে।

তবে নীতিটি নিয়ে আইনি বিরোধের মূল প্রশ্ন হলো, কোনো ব্যক্তিকে তৃতীয় দেশে পাঠানোর আগে সেখানে সম্ভাব্য ঝুঁকির বিরুদ্ধে আপত্তি জানানোর কতটা সুযোগ তাকে দেওয়া উচিত।

সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ আদেশে ট্রাম্প প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে নীতিটি চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেলেও থার্ড-কান্ট্রি ডিপোর্টেশন নিয়ে আইনি বিরোধের অবসান হয়নি। শীর্ষ আদালত নিজেই মামলাটি শুনানির জন্য গ্রহণ করেছে এবং ডিসেম্বর ২০২৬-এ পক্ষগুলোর যুক্তি শুনবে।

আগামী শুনানিতে আদালত অভিবাসন আইন, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া, ফেডারেল আদালতের এখতিয়ার এবং নির্বাসিত ব্যক্তিদের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত প্রশ্ন বিবেচনা করবে। ততদিন নিম্ন আদালতের রায়ের ওপর সুপ্রিম কোর্টের স্থগিতাদেশ কার্যকর থাকবে এবং প্রশাসন তৃতীয় দেশে নির্বাসনের নীতি চালিয়ে যেতে পারবে।

 

Leave a comment