উত্তরাখণ্ডে মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান এখন শুধু পাচারকারীদের গ্রেপ্তার এবং মাদকদ্রব্য উদ্ধারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। পুলিশ মাদক কারবারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সম্পত্তিও খতিয়ে দেখা শুরু করেছে। দেরাদুন জেলায় প্রাথমিকভাবে প্রায় ২০টি বাড়ি চিহ্নিত করা হয়েছে, যেগুলোর ওপর পুলিশের নজর রয়েছে। এই সম্পত্তিগুলোর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মাদক পাচার বা বিক্রয় সংক্রান্ত মামলা রয়েছে অথবা তাদের কার্যকলাপ নিয়ে পুলিশ তদন্ত করছে। পুলিশ এই বাড়িগুলির বিষয়ে জেলা প্রশাসনের কাছে রিপোর্ট চেয়েছে। এরপর সম্পত্তির মালিকানা, নির্মাণের বৈধতা এবং অভিযুক্তদের ভূমিকা যাচাই করে পরবর্তী পদক্ষেপের ধরন নির্ধারণ করা হবে।
পুলিশের পরিকল্পনা অনুযায়ী, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানের পরিধি এখন আর্থিক নেটওয়ার্ক পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে। এতদিন সাধারণভাবে পাচারকারীদের গ্রেপ্তার, তাদের কাছ থেকে মাদকদ্রব্য উদ্ধার এবং সরবরাহ নেটওয়ার্কের যোগসূত্র শনাক্ত করাই ছিল অভিযানের মূল লক্ষ্য। এখন পুলিশ খতিয়ে দেখছে, মাদক কারবার থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে বাড়ি, জমি বা অন্য কোনো সম্পত্তি তৈরি বা কেনা হয়েছে কি না। তদন্তে কোনো সম্পত্তির সঙ্গে মাদক কারবারের সম্পর্ক পাওয়া গেলে এবং সম্পত্তির বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠলে সংশ্লিষ্ট আইনের অধীনে প্রশাসনিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
দেরাদুন শহর এবং তার আশপাশের যেসব এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক বিক্রি বা পাচারের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোও চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া চলছে। পুলিশ এই এলাকাগুলোকে মাদকের হটস্পট হিসেবে মানচিত্রে চিহ্নিত করতে জিআইএস অর্থাৎ জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেমের সাহায্য নিচ্ছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকা থেকে পাওয়া তথ্য একত্র করে মাদকের নেটওয়ার্ক কোন কোন এলাকায় বেশি সক্রিয়, তা বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছে। পুরনো মামলা, গ্রেপ্তার হওয়া পাচারকারী, উদ্ধার এবং স্থানীয় স্তর থেকে পাওয়া তথ্যও এই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
জিআইএস ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে পুলিশের উদ্দেশ্য শুধু কোনো একজন ব্যক্তি বা একটি বাড়ি চিহ্নিত করা নয়, বরং পুরো নেটওয়ার্কের ভৌগোলিক গতিবিধি বোঝা। যেসব স্থান থেকে বারবার মাদক বিক্রি বা সরবরাহের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, সেসব তথ্য রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এরপর ওই এলাকাগুলোতে পুলিশের নজরদারি বাড়ানো হতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় পুরনো মামলা এবং বর্তমান কার্যকলাপের মধ্যে যোগসূত্র খোঁজারও চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে গ্রেপ্তার হওয়া পাচারকারীদের পেছনে কোনো বড় নেটওয়ার্ক কাজ করছে কি না, তা জানা যায়।
পুলিশের মতে, প্রাথমিক তদন্তে প্রায় ২০টি বাড়ি চিহ্নিত করা হয়েছে। এই বাড়িগুলোর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মাদক পাচার বা বিক্রয় সংক্রান্ত মামলা রয়েছে অথবা তাদের কার্যকলাপ পুলিশের নজরদারিতে রয়েছে। তবে শুধু কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হওয়া নিজে থেকেই তার সম্পত্তি ভেঙে ফেলার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। এই কারণে পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সম্পত্তিগুলোর পৃথক স্তরে তদন্ত করা হচ্ছে। বাড়িটি কার নামে রয়েছে, কবে নির্মাণ হয়েছে, নির্মাণের অনুমতি ও জমি সংক্রান্ত নথি কী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মাদক কারবারে কী ভূমিকা ছিল—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে।
দেরাদুনের সহসপুর এলাকায় মাদক পাচারকারীদের সঙ্গে যুক্ত আস্তানাগুলিতে এর আগে পদক্ষেপ করা হয়েছে। এরপর পুলিশ দেরাদুন শহর এবং আশপাশের সেই এলাকাগুলোর দিকে নজর দিচ্ছে, যেগুলোকে মাদকের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। পুলিশের মতে, কোনো অবৈধ নেটওয়ার্ককে দুর্বল করতে শুধু ছোট স্তরের সরবরাহকারী বা পেডলারকে গ্রেপ্তার করা যথেষ্ট নয়। এর পেছনে থাকা ব্যক্তি, আস্তানা এবং আর্থিক কার্যকলাপের তথ্য সংগ্রহ করাও প্রয়োজন। এই লক্ষ্যেই সম্পত্তি তদন্ত এবং নেটওয়ার্ক ম্যাপিংকে অভিযানের অংশ করা হচ্ছে।
এই পদক্ষেপে জেলা প্রশাসনের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হবে। পুলিশের চিহ্নিত করা ২০টি বাড়ির রিপোর্ট প্রশাসনের কাছে চাওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক স্তরে নথি পরীক্ষা এবং সম্পত্তি সংক্রান্ত রেকর্ড যাচাই করা হবে। কোনো ক্ষেত্রে নির্মাণ অবৈধ পাওয়া গেলে বা অন্য কোনো আইনি লঙ্ঘন নিশ্চিত হলে সংশ্লিষ্ট বিভাগ তাদের নিয়ম অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে পারে। একই সঙ্গে কোনো সম্পত্তি ভেঙে ফেলার আগে তার মালিকানা এবং নির্মাণের বৈধতা যাচাই করা হবে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
মাদকবিরোধী এই অভিযানে পুলিশের তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে অভিযুক্তদের অপরাধের ইতিহাস। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আগে কতগুলি মামলা দায়ের হয়েছে, কোন মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে, কী ধরনের মাদকদ্রব্য উদ্ধার হয়েছে এবং তার যোগাযোগ কার কার সঙ্গে ছিল—এই তথ্যগুলো একত্র করে নেটওয়ার্কের চিত্র তৈরি করা হতে পারে। পুলিশ পুরনো রেকর্ড এবং বর্তমান মামলাগুলোর মধ্যে যোগসূত্র খোঁজার চেষ্টা করছে। এর মাধ্যমে একটি এলাকায় সক্রিয় পাচারকারীরা অন্য এলাকার সরবরাহকারী বা বিতরণকারীদের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত, তা জানা যেতে পারে।
পুলিশের অভিযানে এখন আর্থিক কার্যকলাপের ওপর নজর বাড়ানোও এই কৌশলের অংশ। মাদক কারবারে যুক্ত ব্যক্তিদের আয় এবং সম্পত্তির মধ্যে সম্পর্ক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের উদ্দেশ্য হলো, মাদকদ্রব্যের অবৈধ কারবার থেকে অর্জিত অর্থ সম্পত্তি কেনা বা নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা জানা। কোনো ক্ষেত্রে এমন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হলে সংশ্লিষ্ট আইন এবং সক্ষম কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া এগোবে।
দেরাদুনে মাদকের হটস্পট চিহ্নিত করতে ব্যবহৃত জিআইএস ম্যাপিং ব্যবস্থা এই অভিযানকে প্রযুক্তিগত ভিত্তিও দিচ্ছে। পুলিশের কাছে থাকা পুরনো মামলাগুলো একত্র করে এমন স্থান চিহ্নিত করা হচ্ছে, যেখানে মাদক সংক্রান্ত মামলা বারবার সামনে এসেছে। গ্রেপ্তার এবং উদ্ধারের তথ্যও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। স্থানীয় স্তর থেকে পাওয়া তথ্য যুক্ত করে পুলিশ এমন এলাকাগুলো চিহ্নিত করছে, যেখানে নজরদারির প্রয়োজন বেশি।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় পুলিশের নজর শুধু বাড়ির ওপর নয়, মাদক নেটওয়ার্কের সম্পূর্ণ কাঠামোর ওপর। মাদকদ্রব্য কোথা থেকে আসে, কোন মাধ্যমে শহর বা জেলায় পৌঁছায়, কোন ব্যক্তিদের মাধ্যমে বিক্রি হয় এবং এর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের আর্থিক কার্যকলাপ কীভাবে পরিচালিত হয়—এসব বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছে। সেই কারণে পাচারকারীদের যোগাযোগ, পুরনো মামলা, উদ্ধার এবং সম্পত্তি সংক্রান্ত রেকর্ড একসঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
জ্যেষ্ঠ পুলিশ সুপার প্রমেন্দ্র ডোবালের মতে, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান শুধু গ্রেপ্তার পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখা হবে না। পাচারকারীদের নেটওয়ার্ক, তাদের আস্তানা এবং আর্থিক কার্যকলাপের ওপরও নজর রাখা হচ্ছে। তিনি বলেন, চিহ্নিত সম্পত্তিগুলোর তদন্ত শেষ হওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপের ধরন স্পষ্ট হতে পারে। অর্থাৎ, বর্তমানে ২০টি বাড়ি চিহ্নিত করা হলেও সবগুলোর বিরুদ্ধে বুলডোজার দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া নিশ্চিত হয়েছে, এমনটা বলা যায় না। প্রথমে তদন্ত ও যাচাইয়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
এই ক্ষেত্রে পুলিশ কোনো বাড়িকে নজরদারি বা তদন্তের জন্য চিহ্নিত করা এবং সেই বাড়ি আইনগতভাবে ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেওয়া—দুটি পৃথক প্রক্রিয়া। চিহ্নিত সম্পত্তিগুলোর তদন্তের পরই কোন ক্ষেত্রে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করা হবে। ফলে বর্তমানে পুলিশের প্রস্তুতিকে সম্ভাব্য পদক্ষেপের প্রাথমিক পর্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির নথি এবং নির্মাণের অবস্থা সামনে আসার পরই চূড়ান্ত পদক্ষেপ সম্পর্কে জানা যাবে।
দেরাদুন এবং আশপাশের এলাকায় মাদক বিক্রি ও পাচার সংক্রান্ত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশের এই কৌশল আরও বিস্তৃত হতে পারে। তদন্তে পুরনো মামলার সঙ্গে যুক্ত অন্য বাড়ি বা সম্পত্তির তথ্য সামনে এলে চিহ্নিত সম্পত্তির সংখ্যা বাড়তে পারে। বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ২০টি বাড়ি পুলিশের নজরে রয়েছে এবং সেগুলোর রিপোর্ট জেলা প্রশাসনের কাছে চাওয়া হয়েছে।
এই পদক্ষেপে আগামী দিনে তদন্ত রিপোর্টের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হবে। রিপোর্টে সম্পত্তির মালিকানা, নির্মাণের বৈধতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার তথ্য সামনে আসার পর প্রশাসনিক পদক্ষেপের পথ স্পষ্ট হবে। পাশাপাশি, জিআইএস ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে চিহ্নিত নতুন হটস্পটগুলোতেও পুলিশ নজরদারি বাড়াতে পারে। মাদক নেটওয়ার্ককে বোঝার জন্য পুলিশ পুরনো মামলা এবং বর্তমান কার্যকলাপের মধ্যে যোগসূত্র খুঁজছে।
উত্তরাখণ্ডে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানে পুলিশ পাচারকারীদের গ্রেপ্তার এবং মাদকদ্রব্য উদ্ধারের পাশাপাশি তাদের সম্পত্তি ও আর্থিক কার্যকলাপও খতিয়ে দেখছে। দেরাদুনে প্রাথমিকভাবে প্রায় ২০টি বাড়ি চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব বাড়ি সম্পর্কে জেলা প্রশাসনের কাছে রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে এবং মালিকানা ও নির্মাণের বৈধতা যাচাই করা হবে। একই সঙ্গে জিআইএস ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে মাদকের হটস্পট চিহ্নিত করে সেখানে নজরদারি বাড়ানোর প্রস্তুতি চলছে। তদন্ত শেষ হওয়ার পরই কোন সম্পত্তির বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনি বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা স্পষ্ট হবে।










