বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর মধ্যরাত থেকে ভাগলপুরের বিক্রমশিলা সেতুতে যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হবে। সেতুটির স্থায়ী পুনর্নির্মাণ ও বড় পরিসরের মেরামতকাজের জন্য জেলা প্রশাসন দুই প্রান্তে ব্যারিকেডিং ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। ১ অক্টোবর থেকে সেতুতে অস্থায়ীভাবে বসানো চারটি বেইলি ব্রিজ সরানোর কাজ শুরু হবে। এই কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সীমান্ত সড়ক সংস্থা (BRO)-র ৮০ সদস্যের বিশেষজ্ঞ দলকে।
সেতুতে যান চলাচল বন্ধ হওয়ার পর যে অংশে বর্তমানে বেইলি ব্রিজের মাধ্যমে সীমিত যান চলাচল করছে, সেটি সম্পূর্ণ খালি করা হবে। বেইলি ব্রিজ সরানোর পর স্থায়ী পুনর্নির্মাণের মূল কাজ শুরু হবে। প্রশাসন ও নির্মাণ সংস্থা দ্রুত কাজ শেষ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় তিন মাস সময় লাগতে পারে। এই সময়ে সেতু দিয়ে স্বাভাবিক সড়ক যান চলাচল বন্ধ থাকবে।৩০ সেপ্টেম্বর মধ্যরাত থেকে বিক্রমশিলা সেতুতে যান চলাচল বন্ধ হবে। ১ অক্টোবর থেকে BRO-র ৮০ সদস্যের দল চারটি বেইলি ব্রিজ সরাবে এবং প্রায় তিন মাস ধরে স্থায়ী পুনর্নির্মাণের কাজ চলবে।
সেতু বন্ধ করার প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে বুধবার দুই প্রান্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। গঙ্গা ব্রিজ টিওপির আশপাশে স্থায়ী ব্যারিকেডিং করা হচ্ছে, যাতে মধ্যরাতের পর কোনও যানবাহনকে সেতুর দিকে যেতে দেওয়া না হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুলিশ আধিকারিক ও বাহিনী মোতায়েনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বেইলি ব্রিজ সরানো এবং পরবর্তী প্রযুক্তিগত কাজের সময়ে যান চলাচল বা ভিড়ের কারণে কোনও সমস্যা যাতে না হয়, তা নিশ্চিত করাই এর উদ্দেশ্য।
বিক্রমশিলা সেতুতে বর্তমানে চারটি বেইলি ব্রিজ রয়েছে। সেতুর একটি বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর স্বাভাবিক যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে অস্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে এগুলি বসানো হয়েছিল। এখন স্থায়ী পুনর্নির্মাণের অংশ হিসেবে এই অস্থায়ী কাঠামোগুলি সরানো প্রয়োজন। BRO-র বিশেষজ্ঞ দল প্রযুক্তিগত পদ্ধতিতে এগুলি ডি-লঞ্চ করবে। নিরাপদে এবং নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কাজটি শেষ করার লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে দলটিকে।
BRO-র ৮০ সদস্যের দল ইতিমধ্যেই ভাগলপুরে পৌঁছেছে এবং তাদের কাজের জন্য প্রশাসনিক প্রস্তুতি চলছে। দলে প্রযুক্তি ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞরা রয়েছেন। গঙ্গার ওপর উচ্চতায় কাজ করে এত বড় পরিসরে বেইলি ব্রিজ সরানোর কারণে নিরাপত্তাকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। প্রশাসন দলটির জন্য আবাসন, চিকিৎসা পরিষেবা, পানীয় জল, শৌচাগার এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে।
বেইলি ব্রিজ সরানোর সময়ে গঙ্গায় কোনও দুর্ঘটনাজনিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় এসডিআরএফের স্পিডবোট মোতায়েন রাখার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। চিকিৎসক ও অ্যাম্বুল্যান্সের ব্যবস্থা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেতুর দুই প্রান্তে পুলিশ বাহিনী মোতায়েন থাকবে। আধিকারিকদের জন্য সার্কিট হাউসে ঘরের ব্যবস্থা এবং কর্মীদের থাকার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
এই পুনর্নির্মাণ প্রকল্পে প্রায় ৯৯ কোটি টাকা খরচ হবে বলে জানা গেছে। কাজের দায়িত্ব বিহার রাজ্য সেতু নির্মাণ নিগমের তত্ত্বাবধানে একটি নির্মাণ সংস্থাকে দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় শুধু ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত নয়, সেতুর কাঠামোগত শক্তির সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি পুরনো অংশও বদলানো হবে। চারটি বেইলি ব্রিজ সরানোর পর স্থায়ী স্টিল স্ট্রাকচার লঞ্চিং এবং নতুন কংক্রিট স্ল্যাব বসানোর কাজ প্রস্তাবিত হয়েছে।
সেতুর পুরনো বিয়ারিং ও এক্সপ্যানশন জয়েন্টও বদলানো হবে। দীর্ঘদিন ব্যবহৃত এই অংশগুলির অবস্থার কথা মাথায় রেখে পুনর্নির্মাণ পরিকল্পনায় এগুলি পরিবর্তনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নতুন উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিয়ারিং বসানো হবে এবং এক্সপ্যানশন জয়েন্টও বদলানো হবে। ফলে পুনর্নির্মাণের কাজ শুধু একটি ক্ষতিগ্রস্ত অংশে সীমাবদ্ধ থাকবে না, সেতুর গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত অংশগুলিতেও কাজ হবে।
বিক্রমশিলা সেতুর মাধ্যমে ভাগলপুর থেকে নবগছিয়া, কাটিহার, পূর্ণিয়া, কিশনগঞ্জ এবং সীমাঞ্চলের একাধিক এলাকার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ রয়েছে। সেতু বন্ধ থাকায় এই এলাকার মধ্যে যাতায়াতকারী যানবাহনকে বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হবে। ছোট ও বড় যানবাহনের জন্য বিকল্প রুটের তথ্য আগে থেকেই দেওয়া হচ্ছে, যাতে সেতু বন্ধ হওয়ার পর যান চলাচল অন্য সড়কে ঘুরিয়ে দেওয়া যায়।
সেতু বন্ধ হওয়ার আগেই গুগল ম্যাপেও এই রুটটি বন্ধ হিসেবে দেখানো শুরু হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, জিরোমাইল থেকে নবগছিয়ার জন্য বিকল্প পথ হিসেবে প্রায় ১৬১ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি রুট দেখানো হচ্ছে। এই পথে সুলতানগঞ্জ, মুঙ্গের, খগড়িয়া, নারায়ণপুর এবং বিহপুর হয়ে যাওয়ার বিকল্পের কথা বলা হয়েছে।
সড়কপথ বন্ধ থাকার সময়ে যাত্রীদের জন্য জলপথকেও বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে প্রস্তুত করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন চারটি ঘাট থেকে ফেরি পরিষেবা চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। বরারি পুল ঘাট, বিআইএডিএ ফেরি ঘাট, সবৌরের রজন্দীপুর ঘাট এবং জাহ্নবী চক ঘাটকে এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। যাত্রীদের নিরাপত্তা ও সুবিধার জন্য ঘাটগুলিতে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ, অস্থায়ী থানা কক্ষ, মেডিক্যাল ক্যাম্প, ব্যারিকেডিং, আলো এবং অন্যান্য ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
প্রশাসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী ফেরি পরিষেবা সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চালানোর প্রস্তুতি রয়েছে। সন্ধ্যা ৫টা থেকে যাত্রীদের ফেরত পাঠানো শুরু করার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিষেবা শেষ করা যায়। নৌকা বা ক্রুজে তার ধারণক্ষমতা অনুযায়ী যাত্রী বসানোর ব্যবস্থা করা হবে। এ জন্য নিরাপত্তা মানদণ্ড ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন যাচাই করা হচ্ছে।
ভাগলপুর প্রশাসন ১২টি ক্রুজ চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর মধ্যে ছয়টি ছোট এবং ছয়টি বড় ক্রুজ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। ছোট ক্রুজে প্রায় ১০০ থেকে ২০০ জন এবং বড় ক্রুজে ১,০০০ থেকে ১,৫০০ জন যাত্রী বহনের ক্ষমতা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। বাবুপুর থেকে বড় ক্রুজ চালানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে এবং এগুলিতে মালবাহী যানবাহনও বহনের ব্যবস্থা নিয়ে কাজ চলছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে যাত্রীদের বিনামূল্যে যাতায়াতের প্রস্তুতিও করা হচ্ছে।
জলপথের এই বিকল্প ব্যবস্থায় নিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ঘাটের আশপাশ থেকে দখল সরানো, সংযোগ সড়ক মেরামত, পর্যাপ্ত আলো এবং সাইনেজ বসানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মহিলা ও পুরুষ যাত্রীদের জন্য পৃথক শৌচাগারের ব্যবস্থাও প্রস্তাব করা হয়েছে। ঘাটগুলিতে ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হবে। ক্রুজেও ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশের মোতায়েনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
নৌকা ও ক্রুজ পরিচালনার জন্য পাওয়া আবেদনগুলি যাচাই করতে চার সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে পরিবহণ এবং অভ্যন্তরীণ জলপথের সঙ্গে যুক্ত আধিকারিকরা রয়েছেন। নৌকা ও ক্রুজের ধারণক্ষমতা এবং নিরাপত্তা মানদণ্ড যাচাই করে রিপোর্ট দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কমিটিকে। সেতু বন্ধ থাকার সময়ে জলপথ দিয়ে যাত্রী ও যানবাহন নিরাপদে পারাপার নিশ্চিত করাই এর উদ্দেশ্য।
এই বছর সেতুর প্রায় ৩৪ মিটার দীর্ঘ একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গঙ্গায় পড়ে যাওয়ার পর বিক্রমশিলা সেতুর স্থায়ী পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন দেখা দেয়। এরপর স্বাভাবিক যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। মানুষের যাতায়াত সীমিতভাবে পুনরায় চালু করতে অস্থায়ী বেইলি ব্রিজের ব্যবস্থা করা হয়। এখন সেই অস্থায়ী ব্যবস্থা সরিয়ে স্থায়ী কাঠামো তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে।
বেইলি ব্রিজ সরানোর পর মূল স্প্যানে নির্মাণ সংস্থার জন্য পর্যাপ্ত কাজের জায়গা তৈরি হবে। এরপর আধুনিক প্রযুক্তি ও ভারী যন্ত্রপাতির সাহায্যে স্থায়ী স্টিল স্ট্রাকচার বসানো, স্ল্যাবের কাজ এবং সেতুর অন্যান্য কাঠামোগত অংশ মেরামতের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে। নির্মাণকাজের জন্য পাটনা ও গুয়াহাটির প্রধান সেতুগুলিতে কাজ করা অভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ারদের নিয়ে একটি বিশেষ দলও গঠন করা হয়েছে।
প্রশাসন ও নির্মাণ সংস্থার সামনে তিন মাসের মধ্যে নির্ধারিত পদ্ধতিতে কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। সেতু পুরোপুরি বন্ধ থাকায় এর সরাসরি প্রভাব সড়ক যান চলাচলের ওপর পড়বে। তাই বিকল্প সড়কপথ ও জলপথ—দুই ব্যবস্থাই সক্রিয় রাখা প্রয়োজন হবে। প্রশাসনের প্রস্তুতিতে এই কারণে যান নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ঘাট ও জলপথের নিরাপত্তাকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ভাগলপুর ও নবগছিয়ার মানুষের জন্য সেতু বন্ধ থাকার সময়টি দৈনন্দিন যাতায়াতের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে। চাকরি, ব্যবসা, পড়াশোনা, চিকিৎসা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে সেতু ব্যবহার করা মানুষকে যাত্রাপথ পরিবর্তন করতে হবে। মালবাহী যানবাহনকেও বিকল্প রুট ব্যবহার করতে হবে। এতে অতিরিক্ত দূরত্ব ও সময় বাড়তে পারে। তাই প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগে থেকেই বিকল্প পথের তথ্য দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
সেতু বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যান নিয়ন্ত্রণের জন্য দুই প্রান্তে পুলিশ ও প্রশাসনিক আধিকারিকদের মোতায়েন করা হবে। কোনও যানবাহন যাতে ব্যারিকেড পেরিয়ে নির্মাণ এলাকায় ঢুকতে না পারে, সে জন্য নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হবে। বেইলি ব্রিজ ডি-লঞ্চিংয়ের সময় বিশেষভাবে নিরাপত্তা বিধি মেনে চলানো হবে, কারণ গঙ্গার ওপর উচ্চতায় এবং ভারী স্টিল কাঠামোর মধ্যে এই কাজ করতে হবে।
তিন মাসের এই সময়ে সেতুর কাঠামো পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে। চারটি অস্থায়ী বেইলি ব্রিজ সরানোর পর স্থায়ী স্টিল কাঠামো তৈরি হবে, নতুন স্ল্যাব বসানো হবে এবং পুরনো বিয়ারিং ও এক্সপ্যানশন জয়েন্ট বদলানো হবে। অর্থাৎ কাজ শেষ হওয়ার পর সেতুর ক্ষতিগ্রস্ত অংশের পাশাপাশি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত অংশেও পরিবর্তন থাকবে।
বুধবার মধ্যরাত থেকে বিক্রমশিলা সেতুতে যান চলাচল বন্ধ হবে। ১ অক্টোবর থেকে BRO-র ৮০ সদস্যের দল চারটি বেইলি ব্রিজ সরানোর কাজ শুরু করবে। এরপর স্থায়ী পুনর্নির্মাণের মূল পর্যায় শুরু হবে। প্রশাসন সড়ক ও জলপথ—দুই বিকল্প ব্যবস্থাই প্রস্তুত করছে এবং নির্মাণ সংস্থার লক্ষ্য নির্ধারিত প্রায় তিন মাসের মধ্যে সেতুর পুনর্নির্মাণকাজ শেষ করা।











