বর্ষা এলেই বাঙালির পাতে ইলিশের আনাগোনা বেড়ে যায়। ভাপা, সর্ষে, ভাজা কিংবা পাতুরি—যে পদই হোক, ইলিশের স্বাদ নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। তবে বিশ্বের সবচেয়ে সুস্বাদু ইলিশ কোন নদীর? এতদিন মেঘনার ইলিশকে এগিয়ে রাখা হলেও নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে অন্য তথ্য। গবেষকদের মতে, তেঁতুলিয়া নদীর ইলিশ স্বাদের দিক থেকে মেঘনার ইলিশকেও পিছনে ফেলতে পারে।

মেঘনার ইলিশের পুরনো রেকর্ডে বদল?
আগের গবেষণায় মেঘনা নদীর ইলিশকে স্বাদের দিক থেকে অন্যতম সেরা বলে মনে করা হয়েছিল। ১৯৯৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এমন ধারণা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী গবেষণায় নদীভেদে ইলিশের গুণমান ও স্বাদের পার্থক্য নিয়ে নতুন তথ্য সামনে আসে।গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের গবেষণায় নদীর পরিবেশ, মাছের খাদ্যাভ্যাস এবং দেহে থাকা বিভিন্ন উপাদান বিশ্লেষণ করা হয়। সেই গবেষণায় তেঁতুলিয়া নদীর ইলিশের স্বাদ মেঘনার ইলিশের তুলনায় বেশি বলে উঠে এসেছে।
তেঁতুলিয়ার ইলিশ কেন এত সুস্বাদু?
এর পিছনে রয়েছে মাছের দেহে থাকা ফ্যাটি অ্যাসিড ও অ্যামিনো অ্যাসিডের পরিমাণ। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, তেঁতুলিয়ার ইলিশে মাইরিস্টিক ও লরিক ফ্যাটি অ্যাসিডের পাশাপাশি গ্লুটামিক অ্যাসিড, গ্লাইসিন এবং অ্যালানিনের উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য।এই উপাদানগুলিই মাছের স্বাদ ও গন্ধের বৈশিষ্ট্য তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে তেঁতুলিয়ার ইলিশ খেলে স্বাদের পার্থক্য অনেকের কাছেই স্পষ্ট হতে পারে।
নদীর জলে থাকা খাবারও বড় কারণ
ইলিশের স্বাদের সঙ্গে তার খাবারেরও সম্পর্ক রয়েছে। গবেষণায় তেঁতুলিয়া নদীর জলজ পরিবেশে ডায়াটমের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য বলে উঠে এসেছে। এই ধরনের অণুজীব ফ্যাটি অ্যাসিড ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের উৎস।অন্যদিকে, মেঘনা নদীর ইলিশের খাদ্যাভ্যাসে ডায়াটমের অনুপাত তুলনামূলকভাবে কম বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। মাছ কী ধরনের খাদ্য গ্রহণ করছে, তার প্রভাব তার শরীরে জমা হওয়া ফ্যাট ও অন্যান্য উপাদানের উপর পড়তে পারে।

মিঠে জলের প্রভাবও কি রয়েছে?
ইলিশের স্বাদের ক্ষেত্রে জলীয় পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। তেঁতুলিয়া নদীতে সারা বছর মিঠে জলের উপস্থিতির কথা গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, মেঘনা নদীর ক্ষেত্রে বছরের একটি সময়ে মিঠে এবং অন্য সময়ে নোনা জলের প্রভাব থাকে।এই পরিবেশগত পার্থক্য মাছের শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্য এবং স্বাদের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।

তেঁতুলিয়ার ইলিশ চিনবেন কীভাবে?
বাজারে গিয়ে তেঁতুলিয়া নদীর ইলিশ কিনতে চাইলে কয়েকটি বৈশিষ্ট্য খেয়াল করতে পারেন—
মাছের মাঝের অংশ বা পেট তুলনামূলক চওড়া ও ভারী হতে পারে।
মাথা ও লেজের দিক অপেক্ষাকৃত সরু ও তীক্ষ্ণ দেখায়।
শরীর কিছুটা বেটে ও চওড়া, ঘাড়ের অংশ মোটা হতে পারে।
ত্বকে থাকে উজ্জ্বল রুপালি ঝিলিক।মাছ হাতে নিলে সাধারণত শক্ত ও টানটান অনুভূত হবে। অতিরিক্ত নরম বা ঝুলে পড়া মাছ এড়ানো ভালো।তবে শুধু চেহারা দেখে মাছের নদী বা উৎস নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা যায় না। বাজারে মাছের উৎস সম্পর্কে বিক্রেতার তথ্য বা নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারীর পরিচয়ও যাচাই করা উচিত।

ইলিশ মানেই বাঙালির রসনা। গঙ্গা, পদ্মা বা মেঘনার ইলিশের স্বাদ নিয়ে যতই আলোচনা হোক, সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য। গবেষকদের দাবি, তেঁতুলিয়া নদীর ইলিশের স্বাদ মেঘনার ইলিশের থেকেও বেশি আকর্ষণীয়। বিশেষ ধরনের ফ্যাটি অ্যাসিড ও অ্যামিনো অ্যাসিডের উপস্থিতিই নাকি এর স্বাদের অন্যতম কারণ। এমনকি চেহারা দেখেও এই ইলিশ চেনার কয়েকটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে।











