বাস কন্ডাক্টর থেকে পদ্মশ্রী! নিজের বাড়ি বিক্রি করে ২০ লক্ষ বইয়ের বিনামূল্যের লাইব্রেরি গড়লেন অঙ্কে গৌড়া

কর্নাটকের প্রাক্তন বাস কন্ডাক্টর অঙ্কে গৌড়া নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে গড়েছেন ২০ লক্ষ বইয়ের বিনামূল্যের লাইব্রেরি। তাঁর এই অসাধারণ অবদানের জন্য মিলেছে পদ্মশ্রী সম্মান।

একজন সাধারণ বাস কন্ডাক্টর। মাসের শেষে হাতে আসত সীমিত বেতন। কিন্তু সেই অর্থ দিয়ে বাড়ি-গাড়ি নয়, তিনি কিনেছেন বই। বছরের পর বছর নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে বিক্রি করেছেন সম্পত্তি, কাটিয়েছেন সাদামাটা জীবন। আজ তাঁর গড়া লাইব্রেরিতে রয়েছে ২০ লক্ষেরও বেশি বই। আর সেই অনন্য অবদানের জন্যই পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হয়েছেন কর্নাটকের অঙ্কে গৌড়া।

শৈশব থেকেই বই ছিল তাঁর নেশা

কর্নাটকের মান্ডিয়া জেলার একটি ছোট গ্রামে বড় হয়ে ওঠেন অঙ্কে গৌড়া। কৃষিকাজের পাশাপাশি পড়াশোনা করতেন তিনি। ছোটবেলায় যখন অন্য শিশুরা খেলনা বা মিষ্টির জন্য টাকা চাইত, তখন গৌড়া চাইতেন বই কেনার জন্য। পরিবারের সদস্যরাও হয়তো বুঝতে পারেননি, বইয়ের প্রতি সেই আকর্ষণই একদিন তাঁকে ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে দেবে।

এক শিক্ষকের অনুপ্রেরণায় বদলে যায় জীবন

ছাত্রজীবনে স্বাধীনতা সংগ্রামী, সমাজসংস্কারক ও আধ্যাত্মিক নেতাদের জীবনী পড়তে পড়তে জ্ঞানের জগতে ডুবে যান গৌড়া। এক শিক্ষক তাঁকে বই সংগ্রহের জন্য উৎসাহিত করেন। সেই থেকেই শুরু হয় বিরল বই সংগ্রহের নেশা। পরে তিনি বিএ এবং কন্নড় ভাষায় এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষার প্রতি এই অনুরাগই ভবিষ্যতের বৃহৎ স্বপ্নের ভিত্তি তৈরি করে দেয়।

বাস কন্ডাক্টরের চাকরি, কিন্তু লক্ষ্য ছিল বই সংগ্রহ

স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে বাস কন্ডাক্টর হিসেবে চাকরি শুরু করেন তিনি। সীমিত আয়ের মধ্যেও বই কেনাই ছিল তাঁর প্রধান অগ্রাধিকার। পরে এক প্রাক্তন শিক্ষকের পরামর্শে আবার উচ্চশিক্ষায় ফিরে যান। কন্নড় সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পরও বই সংগ্রহের নেশা আরও বেড়ে যায়।

আয়ের সিংহভাগ খরচ হয়েছে বই কেনায়

পরবর্তী সময়ে তিনি প্রায় ৩৩ বছর একটি চিনিকলে টাইমকিপার হিসেবে কাজ করেন। নিজের আয়ের দুই-তৃতীয়াংশ, পরে প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বই কেনার জন্য ব্যয় করতে শুরু করেন। শুধু চাকরির আয় নয়, গরু পালন, দুধ বিক্রি এবং বিমা এজেন্ট হিসেবে অতিরিক্ত কাজ করে যে অর্থ উপার্জন করতেন, তার বড় অংশও বই কেনার পেছনেই খরচ করতেন।

বাড়িতে আর জায়গা না থাকায় জন্ম নেয় ‘পুস্তক মানে’

ক্রমশ তাঁর সংগ্রহ এতটাই বড় হয়ে ওঠে যে বাড়ির প্রতিটি কোণ বইয়ে ভরে যায়। একসময় প্রায় ৫০ হাজার বই জমে গেলে নতুন জায়গার প্রয়োজন দেখা দেয়। ঠিক সেই সময় শিল্পপতি হরি খোদায় তাঁর সংগ্রহ দেখে মুগ্ধ হন। গৌড়ার একমাত্র অনুরোধ ছিল—একটি গ্রন্থাগার নির্মাণ করা। সেই স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে আসেন খোদায়। পরে কর্নাটক সরকারও সহযোগিতা করে।

২০ লক্ষ বইয়ের বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার

বর্তমানে ‘পুস্তক মানে’ ১৫,৮০০ বর্গফুটেরও বেশি এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এখানে রয়েছে ২০টিরও বেশি ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক ভাষার ২০ লক্ষের বেশি বই। সাহিত্য, বিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন, পুরাণ, প্রযুক্তি থেকে শুরু করে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার বই—সবই রয়েছে এই সংগ্রহে। পাশাপাশি রয়েছে ১,৮৩২টি দুর্লভ পাণ্ডুলিপি, ৫,০০০ অভিধান এবং হাজার হাজার পুরনো সংবাদপত্র ও সাময়িকী।

কোনও সদস্যপদ নেই, নেই প্রবেশমূল্যও

এই গ্রন্থাগারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এখানে প্রবেশ করতে কোনও টাকা লাগে না। নেই কোনও সদস্যপদ বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য। যে কেউ এসে নিজের পছন্দের বই পড়তে পারেন। জ্ঞানকে সবার কাছে পৌঁছে দেওয়াই অঙ্কে গৌড়ার একমাত্র লক্ষ্য।

লাইব্রেরিতেই কাটে পরিবারের জীবন

গৌড়া, তাঁর স্ত্রী বিজয়লক্ষ্মী এবং ছেলে সাগর লাইব্রেরির ভেতরেই থাকেন। মেঝেতে ঘুমান, সাধারণ খাবার খান এবং নিজেরাই বই পরিষ্কার ও সংরক্ষণের কাজ করেন। এখনও প্রায় আট লক্ষ বই বস্তাবন্দি অবস্থায় রয়েছে, যেগুলোকে তালিকাভুক্ত ও সংরক্ষণ করার কাজ চলছে।

পদ্মশ্রী সম্মানে স্বীকৃতি পেলেন ‘বইয়ের মানুষ’

২০২৬ সালে পদ্মশ্রী সম্মান পেয়ে জাতীয় স্তরে আলোচনায় আসেন অঙ্কে গৌড়া। সাক্ষরতা ও শিক্ষার প্রসারে তাঁর অনন্য অবদানের জন্য তাঁকে ‘অপরিচিত বীর’ হিসেবে সম্মানিত করা হয়েছে। পুরস্কার পাওয়ার পরও তিনি জানিয়েছেন, তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল শিশুদের হাতে বই তুলে দেওয়া এবং পড়াশোনার সুযোগ সৃষ্টি করা।

কর্নাটকের এক প্রাক্তন বাস কন্ডাক্টর জীবনের সঞ্চয়, জমি এবং আরাম-আয়েশ ত্যাগ করে গড়ে তুলেছেন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার। ২০ লক্ষেরও বেশি বই নিয়ে তাঁর ‘পুস্তক মানে’ আজ জ্ঞানের তীর্থস্থান। সেই অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন পদ্মশ্রী সম্মান।

Leave a comment