পৃথিবীর আবহাওয়ার অন্যতম প্রভাবশালী প্রাকৃতিক ঘটনা এল নিনোকে ঘিরে ফের উদ্বেগ বাড়ছে। জুন মাসের শুরুতেই প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা এল নিনোর নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে। এর ফলে কৃষি, জলসম্পদ এবং মৌসুমি বৃষ্টিপাতের উপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে চিন্তিত বিজ্ঞানী থেকে শুরু করে কৃষক সমাজও। তবে এই আশঙ্কার মধ্যেই ভারতের জন্য কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিয়েছে ভারত মহাসাগরের আবহাওয়াগত পরিস্থিতি।
এল নিনোর সীমা ছাড়াল সমুদ্রের তাপমাত্রা
সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে দেখা গিয়েছে, এল নিনো ৩.৪ সূচক +০.৮১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। সাধারণত +০.৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করলেই এল নিনোর প্রভাব সক্রিয় বলে ধরা হয়। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার ভারসাম্যে বড়সড় পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
কী এই এল নিনো?
এল নিনো হল মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। স্বাভাবিক অবস্থায় এই অঞ্চলের জল তুলনামূলক শীতল থাকে। কিন্তু বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনের কারণে যখন সমুদ্রের উপরিভাগ দ্রুত উষ্ণ হতে শুরু করে, তখন এল নিনোর সৃষ্টি হয়। এর প্রভাব শুধু প্রশান্ত মহাসাগরেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আবহাওয়াকেও প্রভাবিত করে।
ভারতের জন্য কেন উদ্বেগের কারণ?
ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর সঙ্গে এল নিনোর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সাধারণত এল নিনো সক্রিয় থাকলে ভারতীয় উপমহাদেশে বৃষ্টিপাত কমে যায়। এর ফলে খরা, জলসংকট, কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদন হ্রাস এবং খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
‘ভারতীয় এল নিনো’ কী?
আবহাওয়া বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ইন্ডিয়ান ওশান ডায়াপোল বা IOD। এটি ভারত মহাসাগরের পশ্চিম ও পূর্ব অংশের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার পার্থক্যের উপর নির্ভর করে তৈরি হয়। আবহাওয়াবিদদের একাংশ একে ‘ভারতীয় এল নিনো’ বলেও উল্লেখ করেন, কারণ এটি ভারতীয় বর্ষার উপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
পজিটিভ IOD কেন আশার খবর?
যখন ভারত মহাসাগরের পশ্চিম অংশের জল বেশি উষ্ণ এবং পূর্ব অংশ অপেক্ষাকৃত শীতল থাকে, তখন তাকে পজিটিভ IOD বলা হয়। এই পরিস্থিতিতে ভারত ও পূর্ব আফ্রিকার দিকে আর্দ্রতা বৃদ্ধি পায় এবং বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনাও বাড়ে। ফলে এল নিনোর কারণে যে বৃষ্টির ঘাটতি তৈরি হতে পারে, তার কিছুটা ক্ষতিপূরণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
অগাস্ট-সেপ্টেম্বরে বদলাতে পারে চিত্র
বর্তমানে IOD সূচক নিরপেক্ষ অবস্থায় থাকলেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আবহাওয়া মডেল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে অগাস্ট ও সেপ্টেম্বরে পজিটিভ IOD তৈরি হতে পারে। যদি সেই পূর্বাভাস সত্যি হয়, তাহলে ভারতের বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত আর্দ্রতা প্রবেশ করতে পারে এবং এল নিনোর নেতিবাচক প্রভাব অনেকটাই প্রশমিত হতে পারে।
বিশ্বজুড়ে বাড়ছে চরম আবহাওয়ার আশঙ্কা
বিজ্ঞানীদের মতে, এল নিনো কেবল ভারতের জন্য নয়, গোটা বিশ্বের জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ুগত ঘটনা। এর ফলে কোথাও ভয়াবহ খরা, কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যা, আবার কোথাও তীব্র তাপপ্রবাহ এবং দাবানলের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে এই ধরনের ঘটনাগুলির প্রভাব আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ফের শক্তিশালী হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে এল নিনো। আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের মতে, এই জলবায়ুগত ঘটনা বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহ, খরা, বন্যা এবং দাবানলের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে ভারতের জন্য আশার আলো দেখাচ্ছে পজিটিভ ইন্ডিয়ান ওশান ডায়াপোল (IOD), যা এল নিনোর বিরূপ প্রভাব কিছুটা কমাতে সক্ষম হতে পারে।











