আখের রস সবুজ, কিন্তু চিনি সাদা কেন? কীভাবে বদলে যায় রং, ভেজাল চেনার সহজ উপায়ও জানুন

আখের রস সবুজ হলেও চিনি সাদা হয় কীভাবে? জানুন চিনি তৈরির পরিশোধন, মোলাসেস আলাদা করার প্রক্রিয়া এবং ভেজাল চিনি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

আখ চিবিয়ে খেলে বা আখের রসের গ্লাস হাতে নিলে চোখে পড়ে তার সবুজাভ রং। কিন্তু সেই আখ থেকেই তৈরি চিনি হয় ঝকঝকে সাদা! তাহলে মাঝের প্রক্রিয়ায় ঠিক কী ঘটে? আখের রসের রং কোথায় চলে যায়? চিনি কি সত্যিই কোনও রাসায়নিক দিয়ে সাদা করা হয়? এই প্রশ্নগুলির উত্তর লুকিয়ে রয়েছে চিনি তৈরির পরিশোধন প্রক্রিয়ায়।

প্রথম ধাপেই আখ থেকে বের হয় রস

চিনি তৈরির শুরুতে যন্ত্রের সাহায্যে আখ মাড়াই করে তার রস বের করা হয়। সদ্য বের করা আখের রসের মধ্যে শুধু চিনি থাকে না। এর সঙ্গে বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ উপাদান, ময়লা, রঙিন যৌগ ও অন্যান্য অশুদ্ধিও থাকে। তাই সরাসরি এই রস থেকেই সাদা চিনি তৈরি করা সম্ভব নয়।প্রথমে রসকে বিভিন্ন পরিশোধন প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এর ফলে অপ্রয়োজনীয় উপাদান আলাদা হতে শুরু করে।

পরিশোধনের পর রস হয়ে যায় ঘন সিরাপ

পরিশোধিত আখের রসকে গরম করা হয়। তাপের ফলে রসের জল ধীরে ধীরে বাষ্প হয়ে বেরিয়ে যায় এবং রস ঘন হয়ে সিরাপের মতো আকার নেয়।

এরপর আরও প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে এই সিরাপ থেকে চিনির স্ফটিক বা দানা তৈরি করা হয়।

সাদা হওয়ার আসল রহস্য কোথায়?

চিনির দানা তৈরি হওয়ার সময় তার সঙ্গে একটি গাঢ় রঙের তরলও থাকে। একে বলা হয় মোলাসেস। এই মোলাসেসেই আখের রসের বেশ কিছু রঙিন উপাদান থাকে।সেন্ট্রিফিউজের মতো যন্ত্রের সাহায্যে চিনির দানা ও মোলাসেস আলাদা করা হয়। মোলাসেসের আবরণ সরে যাওয়ার পর চিনির দানা অনেক বেশি সাদা দেখায়। পরবর্তী পরিশোধন ও রং কমানোর ধাপের ফলে চিনি আরও সাদা ও উজ্জ্বল হতে পারে।

চিনি তৈরিতে কি রাসায়নিক ব্যবহার হয়?

চিনি শিল্পে পরিশোধনের বিভিন্ন ধাপে চুন, সালফার ডাইঅক্সাইড, ফসফরিক অ্যাসিড প্রভৃতি উপাদান ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। কিছু শোধনাগারে রং ও অশুদ্ধি কমানোর জন্য অ্যাক্টিভেটেড কার্বন বা অন্যান্য ফিল্টারিং পদ্ধতিও ব্যবহার করা হয়।তবে কোনও নির্দিষ্ট উপাদান ব্যবহৃত হলেই চিনি ‘বিষাক্ত’ হয়ে যায়—এমন ধারণা সঠিক নয়। খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত উপাদানের মাত্রা ও অনুমোদিত প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ।

সাদা চিনি মানেই কি ভেজাল?

একেবারেই নয়। চিনির সাদা রং তার পরিশোধন প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক ফল হতে পারে। শুধু বেশি সাদা বা চকচকে দেখাচ্ছে বলেই সেটিতে ভেজাল রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক নয়।তীব্র অস্বাভাবিক গন্ধ, প্যাকেটের অস্বাভাবিকতা বা অন্য কোনও সন্দেহজনক বৈশিষ্ট্য নজরে এলে সতর্ক হওয়া যেতে পারে। তবে চোখ, গন্ধ বা রং দেখে ভেজাল নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা সম্ভব নয়।

জল দিয়ে চিনি পরীক্ষা করা যায়?

অনেক সময় বাড়িতে জল দিয়ে চিনি পরীক্ষা করার কথা বলা হয়। এক গ্লাস জলে চিনি মিশিয়ে জল ঘোলা হচ্ছে কি না বা তলায় কোনও অবশিষ্ট পদার্থ জমছে কি না, তা লক্ষ্য করার পরামর্শ দেওয়া হয়।কিন্তু এই ধরনের ঘরোয়া পরীক্ষা ভেজাল নিশ্চিত করার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নয়। চিনির মধ্যে কোনও অস্বাভাবিক পদার্থ রয়েছে বলে সন্দেহ হলে নির্ভরযোগ্য পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করানোই বেশি কার্যকর।

কেনার সময় কী কী দেখবেন?

চিনি কেনার সময় কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা ভালো—

প্যাকেট অক্ষত রয়েছে কি না দেখুন।

উৎপাদন ও মেয়াদ সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করুন।

প্যাকেটের লেবেল ও খাদ্য-নিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্য পড়ুন।

অস্বাভাবিক গন্ধ বা অন্য কোনও সন্দেহজনক বৈশিষ্ট্য থাকলে ব্যবহার না করাই ভালো।

শুধুমাত্র অতিরিক্ত সাদা রং দেখে ভেজাল বলে ধরে নেবেন না।

ভেজালের গুরুতর সন্দেহ থাকলে অনুমোদিত পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়াই নিরাপদ।

আখের রস সাধারণত সবুজ বা সবুজাভ রঙের হলেও সেই আখ থেকেই তৈরি চিনি দেখতে একেবারে সাদা। এর নেপথ্যে রয়েছে চিনি তৈরির সময় পরিশোধন, মোলাসেস আলাদা করা এবং রং কমানোর বিভিন্ন ধাপ। তবে চিনির সাদা রং দেখেই সেটিকে ভেজাল বলা যায় না। ভেজাল নিয়ে সন্দেহ হলে প্যাকেটের তথ্য যাচাই করার পাশাপাশি প্রয়োজনে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়।

Leave a comment