খেসারি ডাল—দাম কম, প্রোটিন-সহ নানা পুষ্টি উপাদানের উৎস। অথচ এই ডালই একসময় স্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত খাওয়ার সঙ্গে জড়িত ছিল ল্যাথিরিজম, যে রোগে কোমরের নীচের অংশ দুর্বল হয়ে যাওয়া, অসাড়তা এমনকি পক্ষাঘাতের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। কেন এই ডাল নিয়ে এত ভয় তৈরি হয়েছিল? পরে কীভাবে বদলাল পরিস্থিতি? রইল বিস্তারিত।
কেন নিষিদ্ধ হয়েছিল খেসারি ডাল?
খেসারি ডাল, যা লাখোলি ডাল নামেও পরিচিত, একসময় দেশের দরিদ্র মানুষের কাছে সস্তায় পুষ্টির গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিল। কিন্তু এতে থাকা ODAP (Beta-ODAP) নামের একটি নিউরোটক্সিক অ্যামিনো অ্যাসিড নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।বিশেষ করে যখন দীর্ঘদিন ধরে সুষম খাবারের পরিবর্তে প্রচুর পরিমাণে খেসারি ডালের উপর নির্ভর করা হত, তখন স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা যেত। এই কারণেই ১৯৬১ সালে ভারতে এর চাষ ও বিক্রির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কী এই ল্যাথিরিজম?
খেসারি ডালের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যে রোগটির নাম জড়িয়ে আছে, সেটি হল ল্যাথিরিজম। এটি একটি স্নায়বিক সমস্যা, যার ক্ষেত্রে প্রধানত শরীরের নীচের অংশ আক্রান্ত হতে পারে।
দীর্ঘদিন অতিরিক্ত পরিমাণে খেসারি ডাল খাওয়ার ফলে—
পায়ে দুর্বলতা দেখা দিতে পারে
হাঁটাচলায় সমস্যা হতে পারে
কোমরের নীচের অংশে অসাড়তা তৈরি হতে পারে
গুরুতর ক্ষেত্রে পক্ষাঘাতও হতে পারে
তবে এখানে মূল বিষয় হল দীর্ঘদিন অতিরিক্ত গ্রহণ এবং অপুষ্টির পরিস্থিতি। শুধুমাত্র একবার বা অল্প পরিমাণে খাওয়ার সঙ্গে এমন ঝুঁকিকে এক করে দেখা ঠিক নয়।
খেসারি ডালে কোন উপাদান নিয়ে এত উদ্বেগ?
এই ডালে থাকা ODAP-কেই মূলত ঝুঁকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। অতিরিক্ত ODAP গ্রহণ স্নায়ুর উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।বিশেষত যে সমস্ত মানুষ দীর্ঘদিন ধরে প্রায় একমাত্র খাবার হিসেবে খেসারি ডালের উপর নির্ভর করতেন এবং একইসঙ্গে অপুষ্টিতে ভুগতেন, তাঁদের ঝুঁকি বেশি ছিল।
২০১৬ সালে বদলাল পরিস্থিতি
দীর্ঘ কয়েক দশক পর খেসারি ডাল নিয়ে নতুন করে গবেষণা শুরু হয়। বিজ্ঞানীরা এমন কিছু জাত তৈরি করেন, যেগুলিতে আগের তুলনায় ODAP-এর পরিমাণ কম।২০১৬ সালে কম নিউরোটক্সিনযুক্ত নির্দিষ্ট কিছু জাতের চাষের অনুমোদন দেওয়া হয়। একইসঙ্গে ডাল প্রক্রিয়াকরণ এবং পরিমিত পরিমাণে খাওয়ার মাধ্যমে ঝুঁকি কমানোর বিষয়টিও সামনে আসে।অর্থাৎ, আজকের পরিস্থিতিকে ১৯৬০-এর দশকের নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সরাসরি তুলনা করলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
কেন এখনও খেসারি ডাল নিয়ে আলোচনা?
খেসারি ডালের সবচেয়ে বড় সুবিধা হল এর কম দাম এবং খরা সহ্য করার ক্ষমতা। ডালের উৎপাদন কমে গেলে কিংবা দাম বেড়ে গেলে এটি সস্তা বিকল্প হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।বিশেষ করে পূর্ব ভারতের কিছু অঞ্চলে ঐতিহ্যগতভাবে এই ডাল খাওয়ার চল রয়েছে। তবে খাদ্যতালিকায় এটিকে একমাত্র ডালের উৎস না রেখে বৈচিত্র্যপূর্ণ ও সুষম খাবার রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে খেসারি ডাল কি একেবারেই খাওয়া যাবে না?
বিষয়টি এতটা সরল নয়। বর্তমানে অনুমোদিত কম-ODAP জাত এবং নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ক্ষেত্রে আগের মতো সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার পরিস্থিতি নেই। তবে কোনও নির্দিষ্ট খাবার অতিরিক্ত পরিমাণে বা দীর্ঘদিন ধরে খাওয়ার আগে স্থানীয় খাদ্যনির্দেশিকা ও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মেনে চলাই নিরাপদ।
একসময় অত্যন্ত সস্তা ও পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে পরিচিত খেসারি ডাল ভারতে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কারণ, অতিরিক্ত ও দীর্ঘদিন খাওয়ার সঙ্গে ‘ল্যাথিরিজম’ নামে স্নায়বিক অসুস্থতার যোগ পাওয়া যায়। তবে পরবর্তী সময়ে কম নিউরোটক্সিনযুক্ত কিছু জাত ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের বিষয়টি সামনে আসে।













