Hetampur Rajbari: সত্যজিৎ রায়ের সিনেমার স্মৃতি বুকে নিয়ে ধ্বংসের মুখে ঐতিহাসিক হেতমপুর রাজবাড়ি, মিলবে কি হেরিটেজের মর্যাদা?

সত্যজিৎ রায়ের ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’ সহ একাধিক সিনেমার শ্যুটিংয়ের স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে বীরভূমের হেতমপুর রাজবাড়িতে। জরাজীর্ণ এই ঐতিহাসিক ভবনকে হেরিটেজ ঘোষণার দাবি উঠেছে।

বীরভূমের দুবরাজপুরের কাছে অবস্থিত হেতমপুর রাজবাড়ি আজ সময়ের সাক্ষ্য বহন করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। একসময়ের রাজকীয় ঐতিহ্য আর জৌলুস অনেকটাই হারিয়েছে। বিশাল প্রাসাদের দেওয়ালে ধরেছে ভাঙন, কড়ি-বরগায় বাসা বেঁধেছে ঘুণ। কোথাও খসে পড়ছে পলেস্তরা, কোথাও আবার ভবনের বিভিন্ন অংশ ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে।স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবেই এই ঐতিহাসিক স্থাপত্য আজ এমন বেহাল দশায় পৌঁছেছে।

সত্যজিৎ রায়ের সিনেমার স্মৃতি জড়িয়ে এই রাজবাড়িতে

হেতমপুর রাজবাড়ির সঙ্গে বাংলা চলচ্চিত্রেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। জানা যায়, কিংবদন্তি পরিচালক সত্যজিৎ রায় তাঁর জনপ্রিয় ছবি ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’-এর একটি গানের দৃশ্যের শ্যুটিং করেছিলেন এই রাজবাড়িতে।এছাড়াও মৃণাল সেনের ‘মৃগয়া’ সহ একাধিক সিনেমার শ্যুটিংয়ের স্মৃতিও এই রাজবাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। ফলে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছেও হেতমপুর রাজবাড়ির ঐতিহাসিক গুরুত্ব যথেষ্ট।

হারিয়ে গিয়েছে রাজকীয় দিনের অনেক স্মৃতি

রাজবাড়ির নবম প্রজন্মের সদস্য বৈশাখী চক্রবর্তীর কথায় উঠে এসেছে হারিয়ে যাওয়া সেই সময়ের স্মৃতি। ছোটবেলায় পরিবারের কাছ থেকে রাজবাড়ির অতীত, রাজাদের জীবনযাপন এবং সিনেমার শ্যুটিং নিয়ে নানা গল্প শুনেছেন তিনি।একসময় রাজবাড়ির শেষ রাজাবাবু মাধবীরঞ্জনকে ঘিরেও ছিল নানা স্মৃতি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে রাজপাটের অবসান হয়েছে। হারিয়ে গিয়েছে রাজকীয় পরিবেশ। এমনকী রাজবাড়ির সিংহদুয়ারে থাকা ঐতিহ্যবাহী বিদেশি ঘড়িটিও আজ আর চলে না।পুরনো দিনের গল্প বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের একটাই আক্ষেপ—সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজবাড়িকে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি।

হেরিটেজ ঘোষণার দাবি স্থানীয়দের

রাজবাড়ির বর্তমান পরিস্থিতি দেখে উদ্বিগ্ন স্থানীয় বাসিন্দারাও। তাঁদের দাবি, এই ঐতিহাসিক ভবনটি দ্রুত সংস্কার করা হোক এবং সরকারি উদ্যোগে হেরিটেজ হিসেবে সংরক্ষণ করা হোক।স্থানীয়দের মতে, এই রাজবাড়ির সঙ্গে শুধু একটি পরিবারের ইতিহাস নয়, জড়িয়ে রয়েছে বীরভূমের ঐতিহ্য এবং বাংলা চলচ্চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি। তাই অবহেলায় এটি ধ্বংস হয়ে গেলে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সম্পদ হারিয়ে যাবে।

সরকারের তরফে কী জানানো হয়েছে?

হেরিটেজ মর্যাদার বিষয়ে সরকারি স্তরে এখনও কোনও লিখিত আবেদন জমা পড়েনি বলে জানা গিয়েছে। সংশ্লিষ্ট এক সরকারি আধিকারিকের বক্তব্য, লিখিতভাবে আবেদন পাওয়া গেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের কথা বিবেচনা করা হবে।অর্থাৎ, এখন স্থানীয়দের দাবি এবং সরকারি উদ্যোগ—এই দুইয়ের দিকেই তাকিয়ে হেতমপুর রাজবাড়ি।

ইতিহাসের পাতায় হেতমপুরের নাম

যুদ্ধে হাতেম খান জয়লাভ করার পর পুরস্কার হিসেবে রাঘবপুর তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। এরপর রাঘবপুরের নাম পরিবর্তিত হয়ে হাতেমপুর হয় এবং সময়ের সঙ্গে সেই নামই পরিবর্তিত হয়ে বর্তমানের হেতমপুরে পরিণত হয়েছে।

বীরভূমের হেতমপুর রাজবাড়ি শুধু একটি পুরনো প্রাসাদ নয়, বাংলার ইতিহাস ও চলচ্চিত্র জগতের বহু স্মৃতির সাক্ষী। সত্যজিৎ রায়ের সিনেমার শ্যুটিং থেকে শুরু করে মৃণাল সেনের ‘মৃগয়া’-র স্মৃতি—এই রাজবাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একাধিক ঐতিহাসিক অধ্যায়। কিন্তু দীর্ঘদিনের অবহেলায় আজ জরাজীর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রাসাদটি। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, দ্রুত সংস্কার করে হেতমপুর রাজবাড়িকে হেরিটেজ ভবনের মর্যাদা দেওয়া হোক।

Leave a comment