বাড়ির বারান্দা কিংবা ছাদে জবা গাছ লাগিয়েছেন, কিন্তু দিনের পর দিন ফুলের দেখা নেই? আবার কখনও কুঁড়ি এলেও ফুল ফোটার আগেই ঝরে পড়ছে? এমন সমস্যা হলে শুধু সার দেওয়ার কথা ভাবলেই হবে না, গাছের সামগ্রিক পরিচর্যার দিকেও নজর দিতে হবে। জবা গাছে ফুল বাড়াতে কোন সার ব্যবহার করবেন, কীভাবে ছাঁটাই করবেন এবং কুঁড়ি ঝরে পড়ার কারণ কী হতে পারে, জেনে নিন সহজ কয়েকটি উপায়।
জবা গাছে ফুল ফোটাতে সর্ষের খোলের তরল সার
জৈব উপায়ে গাছের পুষ্টি জোগাতে সর্ষের খোল ব্যবহার করা হয়। এতে থাকা পুষ্টি উপাদান মাটির উর্বরতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। তবে সর্ষের খোল জলে ভিজিয়ে তৈরি তরল সার খুব ঘন করে বা অতিরিক্ত পরিমাণে দিলে গাছের ক্ষতি হতে পারে।
কীভাবে ব্যবহার করবেন?
সর্ষের খোল জলে ভিজিয়ে রাখলে তা ভালোভাবে পচতে দিন।
তৈরি তরল সার প্রয়োজনমতো জল মিশিয়ে পাতলা করুন।
গাছের গোড়ার মাটি সামান্য আর্দ্র থাকলে সার দিন।
কতটা সার দেবেন, তা টবের আকার ও গাছের অবস্থার উপর নির্ভর করবে।
সার দেওয়ার পরও ফুল না এলে গাছ পর্যাপ্ত রোদ পাচ্ছে কি না, তা পরীক্ষা করুন।
চা-পাতা ব্যবহার করতে পারেন, তবে সাবধানে
ব্যবহৃত চা-পাতা জৈব পদার্থের উৎস হতে পারে। কিন্তু সরাসরি ভেজা চা-পাতা বেশি পরিমাণে টবের মাটিতে জমিয়ে রাখলে ছত্রাক বা দুর্গন্ধের সমস্যা দেখা দিতে পারে।তাই চা-পাতা ব্যবহার করতে চাইলে চিনি ও দুধ মেশানো অবশিষ্টাংশ বাদ দিয়ে পরিষ্কার চা-পাতা অল্প পরিমাণে কম্পোস্টে মিশিয়ে পচিয়ে নিন। সরাসরি মাটিতে অতিরিক্ত চা-পাতা দেওয়ার বদলে পরিণত কম্পোস্ট ব্যবহার করাই ভালো।
কলার খোসা দিলেই কি ফুল বাড়বে?
কলার খোসায় পটাশিয়ামসহ কিছু খনিজ উপাদান থাকে। কিন্তু কাঁচা খোসা মাটিতে পুঁতে দিলেই গাছ সঙ্গে সঙ্গে সেই পুষ্টি পেয়ে যাবে, এমন নয়। খোসা পচতে সময় লাগে।কলার খোসা ব্যবহার করতে চাইলে ছোট টুকরো করে সরাসরি টবের মাটিতে বেশি পরিমাণে না দিয়ে কম্পোস্ট তৈরির উপাদান হিসেবে ব্যবহার করুন। গাছের ফুলের জন্য শুধু পটাশিয়াম নয়, অন্যান্য পুষ্টি উপাদানও সঠিক অনুপাতে থাকা জরুরি।
ডিমের খোসা ও কাঠের ছাই ব্যবহারে সতর্কতা
ডিমের খোসায় ক্যালসিয়াম থাকে। তবে খোসা গুঁড়ো করে মাটিতে দিলেই দ্রুত গাছের কাজে লাগবে, এমন নয়। এটি ভাঙতে ও পচতে অনেক সময় লাগতে পারে।অন্যদিকে, কাঠের ছাইয়ে পটাশিয়াম ও ক্যালসিয়ামের মতো খনিজ থাকতে পারে। কিন্তু অতিরিক্ত ছাই মাটির অম্ল-ক্ষারের ভারসাম্য বদলে দিতে পারে। তাই টবের মাটির প্রকৃতি না জেনে নিয়মিত ছাই ব্যবহার করা ঠিক নয়।
জবা গাছে অন্তত কয়েক ঘণ্টা রোদ পৌঁছনো জরুরি
জবা গাছ সাধারণত পর্যাপ্ত সূর্যালোক পেলে ভালোভাবে বেড়ে ওঠে এবং ফুল ধরতে সাহায্য পায়। গাছের পাতা সবুজ হলেও পর্যাপ্ত আলো না পেলে ফুলের সংখ্যা কম হতে পারে।সম্ভব হলে এমন জায়গায় টব রাখুন, যেখানে দিনে প্রায় ৫–৬ ঘণ্টা রোদ আসে। তবে গাছটি যদি দীর্ঘদিন ছায়ায় থাকে, তাহলে হঠাৎ প্রচণ্ড রোদে না রেখে ধীরে ধীরে বেশি আলোর সঙ্গে অভ্যস্ত করুন।
কুঁড়ি ঝরে পড়লে পোকার আক্রমণ পরীক্ষা করুন
জবা গাছে জাবপোকা, সাদা মাছি বা অন্যান্য রসচোষা পোকার আক্রমণ হলে কুঁড়ি দুর্বল হয়ে ঝরে যেতে পারে। কুঁড়ি কালচে হয়ে যাওয়া, পাতার নিচে ছোট পোকা দেখা কিংবা পাতায় আঠালো পদার্থ জমা—এগুলি পোকার উপস্থিতির লক্ষণ হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে যা করবেন:
পাতার নিচে ও কুঁড়ির গোড়ায় পোকা আছে কি না দেখুন।
আক্রান্ত ডাল ও কুঁড়ি সরিয়ে ফেলুন।
প্রয়োজনে গাছের জন্য উপযোগী নিমভিত্তিক পণ্য লেবেলের নির্দেশ অনুযায়ী ব্যবহার করুন।
প্রথমে পাতার অল্প অংশে পরীক্ষা করুন এবং প্রচণ্ড রোদে স্প্রে করা এড়িয়ে চলুন।
নিমতেল ব্যবহার করলেই সব ধরনের পোকা দূর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। গাছের সমস্যা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
অতিরিক্ত জল দেবেন না, গোড়ায় জল জমতে দেবেন না
জবা গাছের মাটি দীর্ঘক্ষণ ভিজে থাকলে শিকড়ে পচন ধরতে পারে। আবার মাটি একেবারে শুকিয়ে গেলে গাছের উপর চাপ পড়ে কুঁড়ি ঝরে যেতে পারে।টবের উপরিভাগের মাটি কিছুটা শুকিয়ে এলে জল দিন। টবের নিচে জল বেরোনোর ছিদ্র থাকা জরুরি। মাটি যদি শক্ত হয়ে যায়, তাহলে শিকড়ের ক্ষতি না করে উপরিভাগ আলতো করে আলগা করতে পারেন।জবা গাছের জন্য ঝুরঝুরে, জলনিকাশ ভালো এমন মাটি ব্যবহার করুন। মাটিতে পরিণত কম্পোস্ট মেশালে পুষ্টি জোগাতে সাহায্য করতে পারে।
ডাল ছাঁটাই করুন, তবে সঠিক সময়ে
জবা গাছের অতিরিক্ত লম্বা বা দুর্বল ডাল হালকা ছেঁটে দিলে নতুন শাখা গজানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে নির্বিচারে সব ডালের আগা কেটে দেওয়া উচিত নয়। অনেক জবা গাছে নতুন বৃদ্ধির ডালে ফুল আসে, তাই অতিরিক্ত ছাঁটাই করলে ফুল আসতে দেরি হতে পারে।পরিষ্কার ও ধারালো কাঁচি দিয়ে শুকনো, রোগাক্রান্ত কিংবা দুর্বল ডাল সরিয়ে দিন। গাছের অবস্থা বুঝে হালকা ছাঁটাই করুন এবং তারপর পর্যাপ্ত আলো, জল ও পুষ্টির ব্যবস্থা রাখুন।
জবা গাছের পাতা সবুজ, ডালপালাও বাড়ছে, অথচ ফুল ফুটছে না কিংবা কুঁড়ি ঝরে পড়ছে? এর পিছনে থাকতে পারে পর্যাপ্ত রোদ না পাওয়া, অনিয়মিত জল দেওয়া, পুষ্টির ভারসাম্যের অভাব অথবা পোকার আক্রমণ। গাছের গোড়ায় পচা জৈব সার, পরিমিত সর্ষের খোলের তরল সার এবং সঠিক পরিচর্যা কাজে আসতে পারে। পাশাপাশি দরকার পর্যাপ্ত সূর্যালোক, জলনিকাশের ব্যবস্থা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ডাল ছাঁটাই। তবে কোনও একটি সার দিলেই কয়েক দিনের মধ্যে ফুলে ভরে যাবে গাছ, এমন নিশ্চয়তা নেই।













