চারজনকে হত্যার মামলায় পরিস্থিতিজনিত প্রমাণের ভিত্তিতে যাবজ্জীবন বহাল রাখল হাই কোর্ট

চারজনকে হত্যার মামলায় প্রত্যক্ষদর্শী না থাকলেও শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য পরিস্থিতিজনিত প্রমাণের ভিত্তিতে দোষ প্রমাণ সম্ভব বলে রায় দিয়েছে হাই কোর্ট। নিম্ন আদালতের দোষী সাব্যস্ত করার রায় পর্যালোচনার পর আদালত অভিযুক্তদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রেখেছে।
চারজনকে হত্যার মামলায় পরিস্থিতিজনিত প্রমাণের ভিত্তিতে যাবজ্জীবন বহাল রাখল হাই কোর্ট
Photo Credit / Attribution: Google

চারজনকে হত্যার মামলায় প্রত্যক্ষদর্শী না থাকলেও শুধুমাত্র সেই কারণে অভিযুক্তকে খালাস দেওয়া যায় না বলে রায় দিয়েছে হাই কোর্ট। আদালত বলেছে, যদি পরিস্থিতিজনিত প্রমাণের সম্পূর্ণ শৃঙ্খল শক্তিশালী, নির্ভরযোগ্য এবং এমন হয় যে অপরাধ ছাড়া অন্য কোনো যৌক্তিক সম্ভাবনা অবশিষ্ট না থাকে, তাহলে সেই ভিত্তিতেই অপরাধ প্রমাণ করা সম্ভব। এই ভিত্তিতে হাই কোর্ট নিম্ন আদালতের দেওয়া দোষী সাব্যস্ত করার রায় এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রেখেছে।

শুনানির সময় প্রতিরক্ষা পক্ষের দাবি ছিল, হত্যাকাণ্ডের কোনো প্রত্যক্ষদর্শী নেই। তাই শুধুমাত্র পরিস্থিতিজনিত প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া সমীচীন নয়। তারা প্রমাণের কথিত অসঙ্গতি এবং প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত ঘটনার বিবরণ নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

এর বিরোধিতা করে প্রসিকিউশন জানায়, প্রত্যক্ষদর্শী না থাকলেই প্রসিকিউশনের মামলা দুর্বল হয়ে যায় না। তদন্তে সংগৃহীত অন্যান্য প্রমাণ পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত এবং ঘটনাক্রমের পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে। প্রসিকিউশনের দাবি, মামলার সব পরিস্থিতিই অভিযুক্তদের দিকেই নির্দেশ করে।

মামলার শুনানিতে হাই কোর্ট পরিস্থিতিজনিত প্রমাণ বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করে। আদালত জানায়, এ ধরনের মামলায় প্রতিটি পরিস্থিতিকে পৃথকভাবে মূল্যায়নের পাশাপাশি এটিও দেখতে হবে যে সব পরিস্থিতি মিলিয়ে এমন একটি পূর্ণাঙ্গ প্রমাণশৃঙ্খল তৈরি হয়েছে কি না, যা অভিযুক্তদের সম্পৃক্ততা ছাড়া অন্য কোনো যৌক্তিক সম্ভাবনা অবশিষ্ট রাখে না।

আদালত আরও স্পষ্ট করে যে, ফৌজদারি মামলায় প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যই দোষ প্রমাণের একমাত্র ভিত্তি নয়। বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, ঘটনাক্রম, উদ্ধার হওয়া আলামত, পরিস্থিতিজনিত তথ্য এবং অন্যান্য প্রমাণ যদি পরস্পরকে সমর্থন করে, তাহলে সেগুলোর ভিত্তিতেও আদালত অপরাধ প্রমাণ করতে পারে।

এই মামলায় নিম্ন আদালত উপলব্ধ প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের দোষী সাব্যস্ত করে এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। এর বিরুদ্ধে অভিযুক্তরা হাই কোর্টে আপিল করেন। আপিলের মূল যুক্তি ছিল, হত্যাকাণ্ডের কোনো প্রত্যক্ষদর্শী ছিল না।

হাই কোর্ট নিম্ন আদালতের রায় এবং নথিভুক্ত প্রমাণ পর্যালোচনার পর আপিল খারিজ করে এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখে। আদালতের রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, গুরুতর অপরাধের মামলায় প্রত্যক্ষদর্শীর অনুপস্থিতিতেও শক্তিশালী পরিস্থিতিজনিত প্রমাণ প্রসিকিউশনের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতিজনিত প্রমাণের মামলায় আদালত পরীক্ষা করে দেখে প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত সব পরিস্থিতি পরস্পরের সঙ্গে এমনভাবে সংযুক্ত কি না, যাতে সেখান থেকে অপরাধ সম্পর্কে স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়। কোনো একটি দুর্বল পরিস্থিতির পরিবর্তে সম্পূর্ণ প্রমাণশৃঙ্খলকে একত্রে মূল্যায়ন করা হয়।

চারজনকে হত্যার এই মামলায় হাই কোর্টের রায় একই আইনি নীতির ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে। আদালত উপলব্ধ নথি ও প্রমাণ পর্যালোচনার পর নিম্ন আদালতের রায়ে হস্তক্ষেপের কোনো ভিত্তি খুঁজে পায়নি।

এই রায়ের ফলে দোষী সাব্যস্তদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল থাকবে। আদালতের বিস্তারিত রায়ে পরিস্থিতিজনিত প্রমাণের মূল্যায়ন এবং প্রত্যক্ষদর্শীর অনুপস্থিতিতেও অপরাধ প্রমাণের আইনি ভিত্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

Leave a comment