হিমাচল প্রদেশের মান্ডিতে হিমাচল কিষাণ সভার ১৭তম জেলা সম্মেলন সউলি খাড্ডে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সম্মেলনে কৃষক ও বাগানচাষিদের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় এবং ভূমিহীন ও দরিদ্র কৃষকদের পাঁচ বিঘা জমি দেওয়া, তাদের দখলে থাকা বনভূমি তাদের নামে করা, জমি অধিগ্রহণের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং উন্নয়ন প্রকল্পে স্থানীয় যুবকদের কর্মসংস্থানের দাবি জানানো হয়। সম্মেলনের উদ্বোধন করেন কিষাণ সভার রাজ্য সাধারণ সম্পাদক ও প্রাক্তন বিধায়ক রাকেশ সিংহা।
সম্মেলনে বক্তারা বলেন, যেসব কৃষকের নিজস্ব চাষের জমি নেই, তাদের জমি দেওয়ার জন্য নীতি তৈরি করা উচিত। কিষাণ সভা দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষকদের পাঁচ বিঘা জমি দেওয়ার দাবি জানায়।
দীর্ঘদিন ধরে জমি দখলে থাকা কৃষকদের ভূমি অধিকার সংক্রান্ত বিষয়গুলিও নীতি তৈরি করে সমাধানের দাবি জানানো হয়। বিশেষভাবে তাদের দখলে থাকা বনভূমি তাদের নামে করার দাবি তোলে কিষাণ সভা। সংগঠনটি কৃষক ও গ্রামীণ পরিবারের ভূমি অধিকারের সঙ্গে এই দাবিকে যুক্ত করেছে।
ফোরলেন, জাতীয় সড়ক এবং অন্যান্য বড় প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের বিষয়টিও সম্মেলনে ওঠে। কিষাণ সভার বক্তারা দাবি করেন, প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা জমির ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
এই ধরনের প্রকল্পে স্থানীয় যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবিও জানানো হয়। কিষাণ সভার বক্তব্য, উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় পরিবারের স্বার্থও নীতি প্রণয়নের সময় বিবেচনায় রাখা উচিত।
পথভ্রষ্ট পশু ও বন্যপ্রাণীর কারণে কৃষকদের সমস্যার বিষয়টিও সম্মেলনে তোলা হয়। পাহাড়ি অঞ্চলে কৃষিকাজ করা কৃষকদের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সমস্যার সমাধানে সরকারের কাছে একটি সুনির্দিষ্ট নীতি তৈরির দাবি জানানো হয়।
কৃষির পাশাপাশি দুধ উৎপাদনকে উৎসাহিত করা এবং এর মাধ্যমে কৃষকদের ভালো আয় নিশ্চিত করার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথাও জানানো হয়।
বিদ্যুৎ সংক্রান্ত বিষয়ও সম্মেলনে ওঠে। কিষাণ সভা বাড়িতে স্মার্ট বিদ্যুৎ মিটার বসানো এবং বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
নবনির্বাচিত জেলা সভাপতি কুশাল ভারদ্বাজ স্মার্ট মিটার এবং বিদ্যুৎ বোর্ডের বেসরকারিকরণ নিয়ে সংগঠনের বিরোধিতার কথা জানান। কিষাণ সভা বিষয়টিকে গ্রাহক ও কৃষকদের সঙ্গে যুক্ত দাবি হিসেবে তুলে ধরে পরবর্তী সময়ে আন্দোলন চালানোর কথা জানিয়েছে।
স্মার্ট মিটারিং নিয়ে কেন্দ্র সরকারের পক্ষ থেকে ভিন্ন তথ্য দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, রিভ্যাম্পড ডিস্ট্রিবিউশন সেক্টর স্কিম অর্থাৎ আরডিএসএস-এর অধীনে দেশের ২৮টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে স্মার্ট মিটারিংয়ের কাজ অনুমোদন করা হয়েছে।
মন্ত্রকের মতে, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকল্পের অধীনে সারা দেশে ৫.২৮ কোটি স্মার্ট মিটার বসানো হয়েছে। সরকারের বক্তব্য, স্মার্ট মিটারের মাধ্যমে গ্রাহকরা প্রায় বাস্তব সময়ে বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য পান এবং বিল পরিশোধ ও রিচার্জের মতো পরিষেবা ডিজিটাল মাধ্যমে ব্যবহার করতে পারেন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, স্মার্ট মিটারিংয়ের একটি উদ্দেশ্য বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলির বিলিং এবং রাজস্ব সংগ্রহের সক্ষমতা উন্নত করা। বিদ্যুৎ মন্ত্রক সংসদে জানিয়েছিল, স্মার্ট মিটারিং এবং অন্যান্য সংস্কারের পর দেশে এগ্রিগেট টেকনিক্যাল অ্যান্ড কমার্শিয়াল অর্থাৎ এটিঅ্যান্ডসি ক্ষতি ২০২১ অর্থবর্ষের ২১.৯১ শতাংশ থেকে কমে ২০২৫ অর্থবর্ষে ১৫.০৪ শতাংশ হয়েছে।
সরকার আরও জানিয়েছে, স্মার্ট মিটারিং সংক্রান্ত মানদণ্ডের নথিতে তথ্য সুরক্ষা এবং সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
হিমাচল কিষাণ সভা এর আগেও স্মার্ট মিটারিংয়ের কয়েকটি দিক নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। ২০২৬ সালের আগস্টে সুন্দরনগরে কিষাণ সভা স্মার্ট মিটারিং প্রকল্পের বিরুদ্ধে স্মারকলিপি দিয়ে প্রকল্পটি বন্ধ করার দাবি জানিয়েছিল।
সংগঠনটি মিটারের খরচ, গ্রাহকদের ওপর সম্ভাব্য আর্থিক বোঝা, বিদ্যুৎ কর্মীদের কর্মসংস্থান এবং গ্রাহকদের তথ্যের নিরাপত্তার মতো বিষয় তুলেছিল।
মান্ডির সম্মেলনে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো মৌলিক পরিষেবার বিষয়ও ওঠে। কিষাণ সভার বক্তারা গ্রামীণ এলাকায় এই পরিষেবাগুলিকে শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। কৃষক ও গ্রামীণ পরিবারের জন্য মৌলিক পরিষেবার প্রাপ্যতাকে কৃষি অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করে সংগঠনটি এই ক্ষেত্রগুলিতে উন্নত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায়।
দুধ উৎপাদন বাড়ানো এবং কৃষকদের দুধের উপযুক্ত দাম দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় ছিল। কিষাণ সভা দুধ কেনার উন্নত ব্যবস্থা করার দাবি জানায়। পাশাপাশি পশুপালনকারী গ্রামীণ পরিবারগুলির সমস্যাগুলি দূর করার কথা বলা হয়। পথভ্রষ্ট পশুর সমস্যার সমাধানকেও একই প্রসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সম্মেলনে সংগঠনগত স্তরেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৩ ও ১৪ অক্টোবর রামপুরে অনুষ্ঠিতব্য রাজ্য সম্মেলনের জন্য ৩০ জন প্রতিনিধিকে নির্বাচিত করা হয়েছে।
এছাড়া ৩১ সদস্যের নতুন জেলা কমিটি গঠন করা হয়েছে। কুশাল ভারদ্বাজকে সভাপতি, ভূপেন্দ্র সিংহকে সম্পাদক এবং যোগেন্দ্র ভালিয়াকে কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত করা হয়েছে।
সম্মেলনে কুশাল ভারদ্বাজ, মহেন্দ্র রানা, জগমেল ঠাকুর, প্রেম চৌধুরী এবং রীতা দেবী যৌথভাবে সভাপতিত্ব করেন।
সম্মেলনে রাকেশ সিংহা কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের কৃষিনীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কৃষকদের সামনে থাকা সমস্যাগুলি নিয়ে সংগঠনের পক্ষ থেকে পরবর্তী সময়েও আওয়াজ তোলার কথা বলেন তিনি।
তার বক্তব্য সম্মেলনে কিষাণ সভার পক্ষ থেকে উত্থাপিত দাবিপত্র এবং সংগঠনের রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ। এই দাবিগুলি নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত পরবর্তী প্রক্রিয়ায় স্পষ্ট হবে।
মাণ্ডি জেলা সম্মেলনে কিষাণ সভা জমি, বিদ্যুৎ, কর্মসংস্থান, ক্ষতিপূরণ, পথভ্রষ্ট পশু, দুধ কেনা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো বিভিন্ন বিষয় একসঙ্গে তুলেছে। সংগঠনটি ভূমিহীন কৃষকদের পাঁচ বিঘা জমি এবং তাদের দখলে থাকা বনভূমির অধিকারের দাবি সামনে রেখেছে। একই সঙ্গে স্মার্ট মিটারিং ও বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, কেন্দ্র সরকার স্মার্ট মিটারিংকে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার উন্নতি এবং গ্রাহকদের ডিজিটাল পরিষেবা দেওয়ার একটি ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করে আসছে।
অক্টোবরে অনুষ্ঠিতব্য রাজ্য সম্মেলনের দিকে কিষাণ সভার নজর রয়েছে। মান্ডি থেকে নির্বাচিত ৩০ জন প্রতিনিধি রামপুরের সম্মেলনে অংশ নেবেন। সেখানে কৃষক ও বাগানচাষিদের সঙ্গে যুক্ত বিষয় নিয়ে সংগঠনের পরবর্তী কৌশল নির্ধারণ করা হবে। মান্ডি জেলা সম্মেলনে উত্থাপিত দাবিগুলি রাজ্য স্তরে কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, তা পরবর্তী সম্মেলন এবং তার পরবর্তী সংগঠনগত কার্যকলাপে স্পষ্ট হবে।











