হিমাচল প্রদেশে বর্ষার বৃষ্টিতে আবারও জনজীবন ব্যাহত হয়েছে। সোলান জেলার পরওয়ানু, ধর্মপুর, জাবলি ও চক্কি মোড়সহ আশপাশের এলাকায় ভারী বৃষ্টির কারণে নালা ও খাড্ড উপচে পড়ে জল ও কাদা আবাসিক এলাকা এবং দোকানে ঢুকে পড়েছে। পরওয়ানুর একাধিক এলাকায় বাড়ি ও দোকানে ঢোকা জল আটকাতে বাসিন্দাদের চেষ্টা করতে হয়েছে। প্রশাসন মানুষকে বৃষ্টির সময় অপ্রয়োজনীয়ভাবে বাইরে না বেরোনোর এবং নদী-নালা ও ভূমিধসপ্রবণ এলাকা থেকে দূরে থাকার আবেদন জানিয়েছে।
বৃষ্টির প্রভাব সোলান জেলার পাহাড়ি ঢাল ও প্রধান মহাসড়ক-সংলগ্ন এলাকাগুলিতে বেশি দেখা যাচ্ছে। পরওয়ানুতে প্রবল বৃষ্টির পর একাধিক নালা উপচে পড়ে এবং জলের সঙ্গে ভেসে আসা কাদা বিভিন্ন স্থানে জমে যায়। এর ফলে স্থানীয় যোগাযোগপথেও যান চলাচল ব্যাহত হয়। একাধিক বাড়ি ও দোকানে জল ঢুকে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এই ঘটনাগুলিতে এখনও পর্যন্ত কোনো প্রাণহানির খবর নেই।
ধর্মপুরের কাছে জাবলি এলাকাতেও বৃষ্টিতে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ফোরলেন থেকে নেমে আসা জল বেশ কয়েকটি দোকানে ঢুকে পড়ে। দোকানদারদের জলের মধ্যেই সামগ্রী বাঁচানোর চেষ্টা করতে হয়। হঠাৎ জল জমে যাওয়ায় বাজার এলাকায় পরিস্থিতি বিশৃঙ্খল হয়ে ওঠে। স্থানীয়ভাবে সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির কথাও জানা গেছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব প্রশাসনের রিপোর্টের পরই স্পষ্ট হবে।
অন্যদিকে, চণ্ডীগড়-শিমলা জাতীয় সড়ক-৫-এ চক্কি মোড়ের কাছে পাহাড় থেকে ক্রমাগত মাটি ও কাদা রাস্তায় পড়ায় যান চলাচলের গতি কমেছে। ধসের কারণে ফোরলেনের একটি লেন প্রভাবিত হয় এবং যানবাহনকে সীমিত জায়গা দিয়ে চলাচল করতে হয়েছে। ফলে মহাসড়কে যানবাহন ধীরগতিতে চলেছে এবং কয়েকটি স্থানে যানজটের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় রাস্তায় ফের মাটি ও কাদা পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কালকা-শিমলা ফোরলেন হিমাচলকে চণ্ডীগড় ও সমতল এলাকার সঙ্গে যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। পর্যটন মরসুম এবং দৈনন্দিন যাতায়াতের কারণে এই রাস্তায় যানবাহনের চাপ থাকে। বৃষ্টির সময় পাহাড় থেকে পাথর ও মাটি পড়ে অল্প সময়ের জন্যও একটি লেন বন্ধ হলে যানবাহনের সারি তৈরি হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতেও চালকদের ধীরগতিতে চলাচল করতে হচ্ছে। প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দলগুলি সড়কের পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে।
রাজ্যের অন্যান্য অংশেও বৃষ্টির প্রভাব রয়েছে। রাজ্য জরুরি পরিচালন কেন্দ্রের ৩ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টা পর্যন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী, হিমাচল প্রদেশে ১১০টি রাস্তা বন্ধ ছিল। এর মধ্যে মান্ডিতে ৫১টি, কুল্লুতে ২২টি, শিমলায় ৮টি, সিরমৌরে ৮টি, চম্বায় ৭টি, কাংড়ায় ৭টি, উনায় ৪টি, সোলানে ২টি এবং লাহৌল-স্পিতিতে ১টি রাস্তা রয়েছে। বৃষ্টি ও ভূমিধসের কারণে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও পানীয় জল সরবরাহ ব্যবস্থাও প্রভাবিত হয়েছে।
একই রিপোর্ট অনুযায়ী, রাজ্যে ১৯৮টি বিদ্যুৎ বিতরণ ট্রান্সফরমার অচল ছিল। এর মধ্যে শিমলায় ৫৩টি এবং সোলানে ৬৫টি ট্রান্সফরমার প্রভাবিত হয়েছে। চম্বায় ৩৫টি, কুল্লুতে ২৬টি, হামিরপুরে ২৩টি, সিরমৌরে ১১টি এবং মান্ডিতে ৮টি ট্রান্সফরমার প্রভাবিত হয়েছে। এছাড়া বৃষ্টির কারণে ৫৬টি পানীয় জল সরবরাহ প্রকল্পও প্রভাবিত হয়েছে। ফলে টানা বৃষ্টির প্রভাব শুধু সড়কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বিদ্যুৎ ও পানীয় জলের মতো জরুরি পরিষেবাতেও এর প্রভাব পড়েছে।
শিমলাতেও বৃষ্টির প্রভাব অব্যাহত রয়েছে। ভারতীয় আবহাওয়া বিভাগের শিমলা কেন্দ্রের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ৩ ও ৪ সেপ্টেম্বর বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ৫ ও ৬ সেপ্টেম্বরও আকাশ মেঘলা থাকার সঙ্গে মাঝারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে আগামী দিনগুলিতেও পাহাড়ি এলাকায় বৃষ্টির পরিস্থিতি অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে এবং আগে থেকেই সংবেদনশীল ঢাল ও সড়কে ভূমিধসের ঝুঁকি থাকতে পারে।
আবহাওয়ার পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসন কসৌলি মহকুমার বাসিন্দাদের বিশেষ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভারী বৃষ্টির সময় নদী-নালা, খাড্ড, ভূমিধসপ্রবণ স্থান এবং অন্যান্য সংবেদনশীল এলাকার কাছে যাওয়া এড়াতে হবে। কসৌলি, ধর্মপুর, চক্কি মোড় ও পরওয়ানু এলাকায় পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা হচ্ছে। জরুরি পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
এই বৃষ্টিপর্বে পাহাড়ি ঢাল থেকে হঠাৎ মাটি ও পাথর পড়ার বিষয়টি উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। হিমাচল প্রদেশে গত কয়েক বছরে বর্ষার সময় ভূমিধসের কারণে মহাসড়ক ও যোগাযোগপথ বারবার প্রভাবিত হয়েছে। তাই সড়কপথে যাতায়াতের আগে আবহাওয়া ও যান চলাচলের পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে কালকা-শিমলা সড়কে চলাচলকারী চালকদের চক্কি মোড় এবং অন্যান্য সংবেদনশীল অংশে অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
চলতি বর্ষা মরসুমে হিমাচল প্রদেশে বৃষ্টি ও সংশ্লিষ্ট দুর্যোগের প্রভাব ইতিমধ্যেই দেখা গেছে। ৩০ জুন থেকে ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সমন্বিত রিপোর্টে দুর্যোগ-সম্পর্কিত ঘটনায় ২৬১ জনের মৃত্যু এবং ৪৭১ জনের আহত হওয়ার তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনাও অন্যতম কারণ ছিল।
এই মুহূর্তে সোলান ও পরওয়ানু এলাকায় প্রশাসনের অগ্রাধিকার জলমগ্ন এলাকার নজরদারি, রাস্তা থেকে মাটি ও কাদা সরানো এবং যান চলাচল নিরাপদ রাখা। পাহাড়ি এলাকায় বৃষ্টির সময় পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। কোনো স্থানে কিছু সময়ের জন্য যান চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার পর ফের মাটি পড়ে রাস্তা বন্ধ হতে পারে। তাই যাত্রীদের ধৈর্য ধরতে এবং পুলিশ-প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলতে বলা হয়েছে।
আগামী তিন দিনও বৃষ্টির পরিস্থিতি অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা থাকায় বিশেষ করে নিচু এলাকায় জল জমা এবং পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিধসের ঝুঁকি থাকতে পারে। প্রশাসন আবহাওয়া পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত সংবেদনশীল স্থান থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে। মহাসড়ক দিয়ে যাতায়াতকারী চালকদের দ্রুতগতিতে গাড়ি না চালানো, রাস্তায় হঠাৎ মাটি পড়লে সতর্কতার সঙ্গে গাড়ি চালানো এবং প্রয়োজনে নিরাপদ স্থানে থামার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
হিমাচল প্রদেশে চলতি বৃষ্টির প্রভাব সড়ক, বিদ্যুৎ, পানীয় জল এবং স্থানীয় ব্যবসার ওপরও পড়েছে। পরওয়ানু ও জাবলিতে দোকানে জল ঢুকে পড়া এবং চক্কি মোড়ের কাছে ফোরলেনে মাটি পড়ে যান চলাচল ব্যাহত হওয়া এর উদাহরণ। আগামী দিনগুলিতে বৃষ্টির পরিস্থিতি বিবেচনায় মানুষকে সতর্ক থাকতে এবং জরুরি প্রয়োজন ছাড়া যাতায়াত এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।












