আইআইটি কানপুরের ৯,০০০ কোটি টাকার তহবিল সংগ্রহ অভিযান শুরু

আইআইটি কানপুরের ‘গ্রেটার দ্যান আস’ অভিযানে ২০২৯ সালের মার্চের মধ্যে ১ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৯,০০০ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য। সূচনাতেই ৪,১৫৫ কোটি টাকার অনুদানের প্রতিশ্রুতি মিলেছে।
আইআইটি কানপুরের ৯,০০০ কোটি টাকার তহবিল সংগ্রহ অভিযান শুরু
Photo Credit / Attribution: Google

ভারতে আধুনিক প্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও উদ্ভাবনকে এগিয়ে নিতে ভারতীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান (আইআইটি) কানপুর ‘গ্রেটার দ্যান আস’ (Greater Than Us) নামে তাদের সর্ববৃহৎ তহবিল সংগ্রহ অভিযান শুরু করেছে। এই অভিযানের লক্ষ্য ২০২৯ সালের মার্চের মধ্যে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৯,০০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করা। ১৪ অক্টোবর নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং এই অভিযানের সূচনা করেন। প্রতিষ্ঠানটির দাবি অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিক সূচনার সময়ই প্রাক্তন শিক্ষার্থী, দাতা, কর্পোরেট অংশীদার এবং সরকারের পক্ষ থেকে মোট ৪,১৫৫ কোটি টাকা অনুদানের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গিয়েছে। এই অর্থ গবেষণার পরিকাঠামো শক্তিশালী করা, মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহায়তা, বিশেষজ্ঞ শিক্ষকদের নিয়োগ এবং নতুন প্রযুক্তিভিত্তিক সংস্থার বিকাশে ব্যবহার করা হবে।

আইআইটি কানপুরের এই উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু তহবিল সংগ্রহ নয়। গবেষক ও শিক্ষার্থীদের নতুন ধারণাকে পরীক্ষাগার থেকে বাস্তব প্রযুক্তি, পণ্য এবং বাণিজ্যিক সমাধানে রূপান্তরের উপযোগী ব্যবস্থা গড়ে তোলাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য। প্রতিষ্ঠানটি ডিপ-টেক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, সাইবার নিরাপত্তা, ড্রোন এবং মেডিক্যাল টেকনোলজির মতো ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এই ক্ষেত্রগুলিতে গবেষণার জন্য উন্নত যন্ত্রপাতি, বিশেষ প্রশিক্ষণ, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন হয়। এই অভিযান থেকে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে সেই চাহিদা পূরণের পরিকল্পনা রয়েছে।

‘গ্রেটার দ্যান আস’ অভিযানকে তিনটি প্রধান স্তম্ভে ভাগ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রথম স্তম্ভ ‘ফাউন্ডেশন’, যার লক্ষ্য গবেষণা এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামো শক্তিশালী করা। দ্বিতীয় স্তম্ভ ‘ট্যালেন্ট’, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থী, গবেষক, শিক্ষক এবং উদ্ভাবনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সহায়তা করা হবে। তৃতীয় স্তম্ভ ‘ফ্রন্টিয়ার’-এর লক্ষ্য ভবিষ্যতের উন্নত প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা বাড়ানো এবং পরীক্ষাগারে তৈরি জ্ঞানকে বাস্তব ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা। এই তিনটি ক্ষেত্রকে একত্রিত করে গবেষণা, শিক্ষা, প্রযুক্তির বিকাশ এবং উদ্যোগপতিত্বকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।

অভিযানের সূচনায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং দেশীয় প্রযুক্তি বিকাশ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রতিরক্ষা সংস্থা, বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি শিল্পের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, চালকবিহীন প্ল্যাটফর্ম, উন্নত সেন্সর, সাইবার নিরাপত্তা এবং মহাকাশভিত্তিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা শক্তিশালী করা জরুরি। প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে দেশীয় গবেষণার গুরুত্ব বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে আইআইটির মতো প্রতিষ্ঠানগুলির ভূমিকা শুধু শিক্ষাদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; নতুন প্রযুক্তি তৈরি এবং দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী সমাধান উদ্ভাবনেও তারা অবদান রাখতে পারে।

অভিযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল আধুনিক গবেষণা পরিকাঠামো তৈরি। আইআইটি কানপুরের পরিকল্পনায় কেন্দ্রীয় গবেষণা পরিকাঠামোর জন্য ৫২৪ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন বিভাগের গবেষকরা উন্নত বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে পারবেন। আধুনিক গবেষণায় অনেক ক্ষেত্রে ব্যয়বহুল যন্ত্র, নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ এবং বিশেষ প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রয়োজন হয়। এই সংস্থানগুলি একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার অধীনে उपलब्ध হলে বিভিন্ন বিষয়ের গবেষকরা একই পরিকাঠামো ব্যবহার করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারবেন। এতে সময় ও সম্পদের ব্যবহার উন্নত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন গবেষণা ক্ষেত্রের মধ্যে সহযোগিতা বাড়তে পারে।

এই গবেষণা পরিকাঠামোর অধীনে সেমিকন্ডাক্টর ও ডিভাইস প্রসেসিংয়ের যন্ত্রপাতি, ক্লিন রুম এবং আধুনিক স্পেকট্রোস্কোপি ও মাইক্রোস্কোপি সুবিধা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, যোগাযোগ ব্যবস্থা, যানবাহন, শিল্পযন্ত্র এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জামে সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এই ক্ষেত্রে গবেষণার জন্য চিপ ও ইলেকট্রনিক যন্ত্র তৈরি, সেগুলির গঠন বিশ্লেষণ এবং কার্যক্ষমতা পরীক্ষা করার বিশেষ পরিকাঠামো প্রয়োজন। উন্নত পরীক্ষাগারের মাধ্যমে গবেষকরা নতুন উপাদান ও যন্ত্র নিয়ে পরীক্ষা করতে পারবেন। এর ফলে দেশীয় ইলেকট্রনিক্স ও উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নতুন সমাধান বিকাশের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বৈজ্ঞানিক গণনার উন্নয়নের জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং পরিকাঠামোও এই অভিযানের অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে। এর জন্য প্রায় ২০০ কোটি টাকার একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে উন্নত গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট (GPU)-ভিত্তিক কম্পিউটিং ক্ষমতা ব্যবহার করা হবে।

AI মডেল প্রশিক্ষণ, বড় ডেটাসেট বিশ্লেষণ, আবহাওয়া ও ভৌত ব্যবস্থার সিমুলেশন এবং জটিল বৈজ্ঞানিক সমস্যার সমাধানের জন্য বিপুল কম্পিউটিং ক্ষমতা প্রয়োজন। সাধারণ কম্পিউটারে অনেক বড় গবেষণার কাজ শেষ করতে বেশি সময় লাগতে পারে। উন্নত কম্পিউটিং ব্যবস্থা এই ধরনের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে সাহায্য করতে পারে।

আইআইটি কানপুরে এই পরিকাঠামো তৈরি হলে বিভিন্ন বিভাগের গবেষকরা তাঁদের পরীক্ষা ও গণনার জন্য উন্নত সংস্থান পাবেন। মেশিন লার্নিং, কম্পিউটার ভিশন, ভাষাভিত্তিক AI, বৈজ্ঞানিক মডেলিং এবং ইঞ্জিনিয়ারিং সিমুলেশনের মতো ক্ষেত্রে এর ব্যবহার হতে পারে। তবে শুধু ব্যয়বহুল কম্পিউটার সরবরাহ করাই যথেষ্ট নয়। কার্যকর ব্যবহারের জন্য প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞ, উপযুক্ত সফটওয়্যার, বিদ্যুৎ এবং রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থাও প্রয়োজন। এই পরিকাঠামোর বাস্তব সুফল নির্ভর করবে গবেষকদের কাছে এর সহজলভ্যতা এবং ব্যবহারের মাত্রার উপর।

কোয়ান্টাম প্রযুক্তিও আইআইটি কানপুরের অন্যতম অগ্রাধিকার। কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, কোয়ান্টাম যোগাযোগ এবং কোয়ান্টাম সেন্সরের মতো ক্ষেত্রগুলি দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। এই প্রযুক্তিগুলিতে প্রচলিত কম্পিউটিংয়ের থেকে আলাদা বৈজ্ঞানিক নীতি ব্যবহার করা হয়। ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট ধরনের গণনা, নিরাপদ যোগাযোগ এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল পরিমাপের ক্ষেত্রে এগুলির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকতে পারে।

তবে এই প্রযুক্তির ব্যবহারিক প্রয়োগ নির্ভর করে একাধিক বৈজ্ঞানিক ও ইঞ্জিনিয়ারিং চ্যালেঞ্জের সমাধানের উপর। গবেষণা এগিয়ে নিতে বিশেষ যন্ত্রপাতি, নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষাগার এবং বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের প্রয়োজন। এই ক্ষেত্রে গবেষণাকে শক্তিশালী করা এবং নতুন প্রতিভাদের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।

এই উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হল শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা বাড়ানো। আইআইটি কানপুরের পরিকল্পনায় বৃত্তি, ডক্টরাল ফেলোশিপ এবং শিক্ষার সুযোগের জন্য বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা রয়েছে। উচ্চ প্রযুক্তিগত শিক্ষায় ভর্তি হওয়ার পরও অনেক শিক্ষার্থীকে থাকা, পড়াশোনা এবং গবেষণার খরচ বহন করতে হয়। আর্থিক সহায়তা পেলে যোগ্য শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া এবং গবেষণায় মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। ডক্টরাল ফেলোশিপ গবেষকদের দীর্ঘ সময় ধরে নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক সমস্যা নিয়ে কাজ করতে সাহায্য করতে পারে। যেসব ক্ষেত্রে আবিষ্কার বা প্রযুক্তিগত সমাধানে পৌঁছতে কয়েক বছর সময় লাগে, সেখানে এই সহায়তা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষক ও গবেষণা বিশেষজ্ঞদের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করাও এই অভিযানের অন্যতম অংশ। আধুনিক গবেষণার জন্য পরীক্ষাগার ও যন্ত্রপাতির পাশাপাশি জটিল সমস্যার সমাধান, শিক্ষার্থীদের দিকনির্দেশনা এবং নতুন গবেষণা কর্মসূচি তৈরিতে সক্ষম বিশেষজ্ঞদের প্রয়োজন। ফ্যাকাল্টি চেয়ার, তরুণ শিক্ষকদের জন্য সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক স্তরের বিশেষজ্ঞদের আমন্ত্রণ জানানোর মতো পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি তার শিক্ষাগত পরিবেশ উন্নত করতে চায়। এর ফলে শিক্ষার্থীরা নতুন প্রযুক্তি ও গবেষণা পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। একই সঙ্গে শিল্প ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সহযোগিতার সুযোগও বাড়তে পারে।

আইআইটি কানপুরের এই অভিযানে উদ্যোগপতিত্বের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারকে বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তর করতে গবেষণার পাশাপাশি প্রযুক্তির কার্যকারিতা যাচাই, প্রোটোটাইপ তৈরি, নিরাপত্তা ও গুণমান পরীক্ষা এবং বাজারের চাহিদা বোঝার প্রয়োজন হয়। এরপর উৎপাদন, বিনিয়োগ, বিপণন এবং ব্যবসা পরিচালনার মতো বিষয় সামনে আসে। শিক্ষার্থী ও গবেষকদের এই প্রক্রিয়া বুঝতে এবং তাঁদের প্রযুক্তিগত ধারণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করার পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।

এই উদ্দেশ্যে আইআইটি কানপুরের প্রাক্তন শিক্ষার্থী রাহুল গৌতম নোয়ডা ক্যাম্পাসে গৌতম স্কুল অফ ইনোভেশন অ্যান্ড এন্টারপ্রেনারশিপ (G-SINE) প্রতিষ্ঠার জন্য ১৮০ কোটি টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অভিযানের সূচনাকালে এই বিষয়ে একটি সমঝোতাপত্রে স্বাক্ষর করা হয়। প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসা গড়ে তুলতে সক্ষম উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব তৈরি করা। এর আওতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল স্বাস্থ্য, জৈবপ্রযুক্তি, ড্রোন এবং উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তির উপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

G-SINE-এ পূর্ণকালীন শিক্ষক এবং ডিগ্রি কোর্স চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর প্রধান কর্মসূচি হিসেবে ২০২৭ সালের জুলাইয়ে টেকনোলজি অ্যান্ড এন্টারপ্রেনারশিপে MBA চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য প্রযুক্তিগত জ্ঞানের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনার দক্ষতাকে যুক্ত করা। ইঞ্জিনিয়ারিং বা বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তিগত সমস্যার সমাধান তৈরিতে দক্ষ হলেও বিনিয়োগ সংগ্রহ, বাজারের চাহিদা বোঝা, পণ্যের ব্যবসায়িক মডেল তৈরি এবং সংস্থা পরিচালনার জন্য তাঁদের অতিরিক্ত প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হতে পারে। প্রস্তাবিত স্কুল এই ব্যবধান কমাতে কাজ করবে।

নোয়ডা ক্যাম্পাসে প্রস্তাবিত ডিপ-টেক হাবের সঙ্গে সমন্বয় করে G-SINE শিক্ষার্থীদের নতুন প্রযুক্তিভিত্তিক পণ্য তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় সংস্থান দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এর মাধ্যমে গবেষকরা পরীক্ষাগারে তৈরি ধারণাকে আরও উন্নত করতে এবং বাস্তব পরিস্থিতিতে তার কার্যকারিতা যাচাই করতে পারবেন। বাজারে প্রযুক্তিপণ্য আনার আগে তার কর্মক্ষমতা, খরচ, নির্ভরযোগ্যতা এবং ব্যবহারিক উপযোগিতা যাচাই করা জরুরি। ডিপ-টেক ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়ায় বেশি সময় ও বিনিয়োগ লাগতে পারে। তাই গবেষণা পরিকাঠামো এবং উদ্যোগপতিত্বের প্রশিক্ষণ একসঙ্গে পাওয়া নতুন স্টার্টআপগুলির কাজে আসতে পারে।

আইআইটি কানপুরের স্টার্টআপ ইনকিউবেশন অ্যান্ড ইনোভেশন সেন্টার (SIIC) এই উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, এই কেন্দ্রের মাধ্যমে এখনও পর্যন্ত ৫৭১টি স্টার্টআপকে ইনকিউবেশন সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ইনকিউবেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে নতুন ব্যবসাকে প্রাথমিক পর্যায়ে পরামর্শ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিকাশের সুযোগ দেওয়া হয়। গবেষণাভিত্তিক স্টার্টআপগুলির জন্য এই সহায়তা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কারণ পণ্য তৈরি এবং তার ব্যবহারিক কার্যকারিতা প্রমাণ করতে তাদের অতিরিক্ত সময় ও সংস্থানের প্রয়োজন হয়।

অভিযানের ‘ফ্রন্টিয়ার’ অংশের লক্ষ্য ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি নিয়ে মৌলিক গবেষণাকে বাস্তব ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত করা। এই বিভাগে AI, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, ড্রোন, মেডিক্যাল টেকনোলজি এবং পরিবেশগত স্থায়িত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এই অংশের জন্য প্রাথমিকভাবে ১,০০০ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইতিমধ্যেই ১,৫৫৬ কোটি টাকার অনুদানের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গিয়েছে। এই অর্থ সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি ক্ষেত্রগুলিতে গবেষণা ও উন্নয়নের পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে ব্যবহার করা হতে পারে।

সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ডিজিটাল ব্যবস্থা, তথ্য এবং নেটওয়ার্ক সুরক্ষিত রাখার চ্যালেঞ্জ বাড়ছে। সরকারি পরিষেবা, ব্যাঙ্কিং, শিল্প, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সাইবার হামলা প্রতিরোধের প্রয়োজনও বাড়ছে। এই ক্ষেত্রে গবেষণার মধ্যে নিরাপত্তার দুর্বলতা শনাক্ত করা, সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি এবং ডিজিটাল পরিকাঠামো শক্তিশালী করার মতো বিষয় রয়েছে। আইআইটি কানপুরে এই গবেষণাকে উৎসাহ দেওয়া হলে প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞ এবং নতুন প্রযুক্তিগত সমাধান তৈরিতে সহায়তা মিলতে পারে।

ড্রোন ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাও এই অভিযানের আওতায় রয়েছে। নজরদারি, কৃষি, বিপর্যয় মোকাবিলা, শিল্পক্ষেত্রে পরিদর্শন, পণ্য সরবরাহ এবং প্রতিরক্ষার কাজে ড্রোন ব্যবহার করা যায়। তবে নির্ভরযোগ্য ড্রোন ব্যবস্থা তৈরি করতে শুধু উড়তে সক্ষম যন্ত্র তৈরি করাই যথেষ্ট নয়। এর জন্য সেন্সর, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, যোগাযোগ, নেভিগেশন, শক্তি ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত প্রযুক্তিরও উন্নয়ন প্রয়োজন। এই ক্ষেত্রে গবেষণা ও শিল্পের মধ্যে সহযোগিতা বাড়লে স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী প্রযুক্তিগত সমাধান তৈরির সুযোগ বাড়তে পারে।

প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে দেশীয় প্রযুক্তির বিকাশও এই অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় চালকবিহীন প্ল্যাটফর্ম, উন্নত সেন্সর, তথ্য বিশ্লেষণ, সাইবার নিরাপত্তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ছে। এই ক্ষেত্রগুলিতে দেশের অভ্যন্তরে গবেষণা ও উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়লে গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা তৈরিতে সহায়তা মিলতে পারে। আইআইটি কানপুরের মতো প্রতিষ্ঠান বৈজ্ঞানিক দক্ষতা সরবরাহ করতে পারে। প্রতিরক্ষা সংস্থা ও শিল্পের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে গবেষণাকে বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব। তবে প্রতিরক্ষার কাজে ব্যবহারের আগে যেকোনও প্রযুক্তির পরীক্ষা, নিরাপত্তা এবং নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করা জরুরি।

মেডিক্যাল টেকনোলজিও প্রতিষ্ঠানটির অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে। স্বাস্থ্য পরিষেবায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, পরীক্ষার ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্য সমাধান তৈরি করতে ইঞ্জিনিয়ারিং, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও কম্পিউটিংয়ের সমন্বিত জ্ঞান প্রয়োজন। গবেষণার মাধ্যমে নতুন যন্ত্রের প্রোটোটাইপ তৈরি এবং তার কার্যকারিতা যাচাই করা যেতে পারে। ডিজিটাল স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে তথ্য বিশ্লেষণ, রোগ শনাক্তকরণে সহায়তা এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার প্রাপ্যতা বাড়ানোর প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা সম্ভব। তবে এই ধরনের গবেষণার বাস্তব সুফল নিশ্চিত করতে উন্নত ব্যবস্থাগুলির প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা এবং সেগুলি বাস্তব স্বাস্থ্য চাহিদা পূরণ করছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি।

আইআইটি কানপুরের পরিকল্পনায় ক্যাম্পাসের পরিকাঠামো উন্নয়নও রয়েছে। এর আওতায় শিক্ষার্থীদের জন্য চারটি নতুন ছাত্রাবাস তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রতিটি ছাত্রাবাসে প্রায় ১,০০০ জন শিক্ষার্থীর থাকার ব্যবস্থা থাকবে। পাশাপাশি ৯৬টি ফ্যাকাল্টি আবাসন এবং মানসিক স্বাস্থ্য ও কল্যাণ কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রস্তাব রয়েছে।

উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আবাসিক পরিকাঠামো শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবন ও পড়াশোনার পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পর্যাপ্ত ছাত্রাবাসের ব্যবস্থা থাকলে ক্যাম্পাসে থাকা শিক্ষার্থীরা সুবিধা পেতে পারেন। অন্যদিকে, শিক্ষকদের জন্য উন্নত আবাসনের ব্যবস্থা বিশেষজ্ঞদের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করা এবং তাঁদের ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে।

মানসিক স্বাস্থ্য ও কল্যাণ কেন্দ্রের পরিকল্পনাও এই উদ্যোগের অন্তর্ভুক্ত। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সময় পড়াশোনা, পরীক্ষা, প্রকল্প এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবন নিয়ে শিক্ষার্থীদের চাপ তৈরি হতে পারে। এই ধরনের কেন্দ্রের উদ্দেশ্য প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের পরামর্শ ও সহায়তা দেওয়া। এর মাধ্যমে শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক কল্যাণের দিকেও নজর দেওয়া সম্ভব হবে।

আইআইটি কানপুরের অধিকর্তা অধ্যাপক মণীন্দ্র আগরওয়ালের মতে, এই অভিযানের উদ্দেশ্য হল প্রতিষ্ঠানের পরবর্তী উন্নয়ন পর্বের জন্য সংস্থান সংগ্রহ করা এবং সেইসব শিক্ষার্থী ও গবেষকদের উপর বিনিয়োগ করা, যাঁরা ভবিষ্যতে নতুন আবিষ্কার, প্রযুক্তি এবং সংস্থা গড়ে তুলতে পারেন। অভিযানের সূচনার আগেই ৪,১৫৫ কোটি টাকার অনুদানের প্রতিশ্রুতি পাওয়া প্রতিষ্ঠানটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে অনুদানের প্রতিশ্রুতি পাওয়া, বাস্তবে অর্থ হাতে আসা এবং তা খরচ করার মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে। তাই অভিযানের অগ্রগতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে প্রকৃতপক্ষে সংগৃহীত অর্থ, প্রকল্পগুলির অবস্থা এবং সেগুলির ফলাফল বিবেচনা করতে হবে।

২০২৯ সালের মার্চের মধ্যে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য আইআইটি কানপুরের পরিকল্পনার পরিসর তুলে ধরে। এই অর্থ গবেষণা পরিকাঠামো, বৃত্তি, শিক্ষক ও গবেষকদের সহায়তা, ছাত্রাবাস এবং প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোগপতিত্বের উন্নয়নে ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে। নির্ধারিত সময় ও সংস্থানের মধ্যে পরিকল্পনাগুলি বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থীরা গবেষণার আরও সুযোগ পেতে পারেন এবং পরীক্ষাগারে তৈরি প্রযুক্তিকে বাস্তব ব্যবহারে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ হতে পারে।

‘গ্রেটার দ্যান আস’ অভিযানের মাধ্যমে আইআইটি কানপুর গবেষণা, শিক্ষা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং উদ্যোগপতিত্বকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এর লক্ষ্য প্রতিষ্ঠানের পরিকাঠামো সম্প্রসারণের পাশাপাশি এমন প্রতিভা ও প্রযুক্তিগত সমাধানকে উৎসাহ দেওয়া, যা দেশের বৈজ্ঞানিক ও শিল্পগত সক্ষমতা বাড়াতে পারে। AI, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, সাইবার নিরাপত্তা, ড্রোন এবং মেডিক্যাল টেকনোলজিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে ভবিষ্যতে নতুন গবেষণা ও স্টার্টআপের সুযোগ তৈরি হতে পারে। অভিযানের অগ্রগতি নির্ভর করবে নির্ধারিত লক্ষ্য অনুযায়ী কতটা অর্থ বাস্তবে সংগ্রহ করা যায়, প্রকল্পগুলি কত দ্রুত এগোয় এবং গবেষণায় তৈরি প্রযুক্তি সমাজ ও শিল্পের চাহিদা কতটা পূরণ করতে পারে তার উপর।

Leave a comment