বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) এবং ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্কের জেরে ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) ও কংগ্রেসের মধ্যে রাজনৈতিক সংঘাত তীব্র হয়েছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা BJP-র প্রবীণ নেতা জেপি নাড্ডা কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের অভিযোগের জবাবে তাঁকে মিথ্যা বলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্সে একটি পোস্টে নাড্ডা ভোটার তালিকায় চিহ্নিত নামগুলির শ্রেণিবিন্যাসের তথ্য তুলে ধরে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর প্রচারের অভিযোগ করেন।
অন্যদিকে, SIR-কে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে নিশানা করেছিলেন খাড়গে। তাঁর অভিযোগ, ভারতীয় নাগরিকদের অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করার ফলে তাঁদের পরিচয় ও মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কংগ্রেস সভাপতি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার, পুলিশের পদক্ষেপ এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
এক্সে প্রকাশিত পোস্টে জেপি নাড্ডা বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কখনও ১৩.৩৯ কোটি ভারতীয়কে অনুপ্রবেশকারী বলেননি। তাঁর দাবি, নির্বাচন কমিশন স্পষ্ট করেছে যে এই নামগুলি চূড়ান্তভাবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়নি। বরং খসড়া ভোটার তালিকায় অনুপস্থিত, স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত, মৃত অথবা ডুপ্লিকেট হিসেবে এই নামগুলি চিহ্নিত করা হয়েছে।
নাড্ডার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২.৮০ কোটি নাম মৃত ব্যক্তিদের, ৬.৩০ কোটি নাম স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত ব্যক্তিদের, ৩.০১ কোটি নাম অনুপস্থিত ভোটারদের এবং ১.০২ কোটি নাম ডুপ্লিকেট এন্ট্রি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কংগ্রেসের অভিযোগ খারিজ করে নাড্ডা বলেন, এই পরিসংখ্যানকে অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা হিসেবে তুলে ধরা সঠিক নয়। তাঁর বক্তব্য, খসড়া ভোটার তালিকায় কোনও নাম চিহ্নিত হওয়া এবং কোনও ব্যক্তিকে বিদেশি নাগরিক বা অনুপ্রবেশকারী হিসেবে ঘোষণা করা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
খসড়া ভোটার তালিকা এবং চূড়ান্ত ভোটার তালিকার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কোনও ব্যক্তির নাম নির্দিষ্ট শ্রেণিতে চিহ্নিত হওয়ার অর্থ এই নয় যে তাঁর নাগরিকত্ব সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
SIR নিয়ে কংগ্রেসের সমালোচনা করে BJP নেতা বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং BJP-র জনপ্রিয়তাকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করে খারিজ করার চেষ্টা করছে বিরোধী দল। তিনি এই অবস্থানকে কংগ্রেসের রাজনৈতিক হতাশা বলে অভিহিত করেন।
নাড্ডা তাঁর বক্তব্যে গুজরাত, ত্রিপুরা এবং পশ্চিমবঙ্গের উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, গুজরাতে গত ৩১ বছর ধরে কংগ্রেস কোনও নির্বাচনে জয় পায়নি, ত্রিপুরায় ৩৩ বছর ধরে কংগ্রেসের কোনও মুখ্যমন্ত্রী হননি এবং পশ্চিমবঙ্গে ৫৪ বছর ধরে দলটি জয় পায়নি।
এই পরিসংখ্যান তুলে ধরে নাড্ডা যুক্তি দেন, কংগ্রেসের নির্বাচনী চ্যালেঞ্জকে শুধুমাত্র SIR-এর সঙ্গে যুক্ত করে দেখা যায় না। তাঁর মতে, দলের রাজনৈতিক পারফরম্যান্স এবং জনসমর্থনের দিকে কংগ্রেসের নজর দেওয়া উচিত।
কংগ্রেসের বিরুদ্ধে নেতিবাচক রাজনীতির অভিযোগ তুলে নাড্ডা বলেন, বিভ্রান্তিকর প্রচারের মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করা যায় না। তিনি বিহার, উত্তরপ্রদেশ এবং মহারাষ্ট্র-সহ একাধিক রাজ্যের উল্লেখ করে দাবি করেন, নির্বাচনে ভোটাররা কংগ্রেসকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
নাড্ডা রাহুল গান্ধী এবং কংগ্রেসকে SIR-কে কেন্দ্র করে বিভ্রান্তি ছড়ানোর পরিবর্তে জনগণের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করার আহ্বান জানান। BJP এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটের (NDA) প্রতি জনসমর্থন রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
ভবিষ্যতের নির্বাচনের প্রসঙ্গে নাড্ডা বলেন, ২০২৯ সালে NDA আবারও বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করবে। সম্ভাব্য নির্বাচনী পরাজয় নিয়েও তিনি কংগ্রেসকে আক্রমণ করেন।
কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে SIR-কে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় সরকারকে নিশানা করেছিলেন। তাঁর অভিযোগ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে ১৩.৩ কোটি ভারতীয়কে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করায় ভারতীয় নাগরিকদের অপমান করা হয়েছে।
নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে খাড়গে ভোটার তালিকায় কথিত অনিয়ম এবং প্রতিবাদ জানানোর অধিকারের বিষয়টি উত্থাপন করেন। তাঁর আরও অভিযোগ, নির্ধারিত প্রতিবাদস্থল হিসেবে দিল্লির যন্তর মন্তর ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ এবং বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচন কমিশন এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেন। তাঁর অভিযোগ, সরকারের কাছে প্রশ্ন তোলা ব্যক্তিদের আটক, পুলিশের পদক্ষেপ এবং অন্যান্য চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে।
খাড়গে বলেন, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং নাগরিকদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরার প্রশ্নে বিরোধীরা পিছিয়ে আসবে না। তাঁর বক্তব্যে নির্বাচনী স্বচ্ছতা, ভোটারদের অধিকার এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার স্বাধীনতার বিষয়গুলি প্রাধান্য পায়।
SIR-এর পূর্ণরূপ স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন। এটি ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া। এর উদ্দেশ্য ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা এবং তালিকায় থাকা ভুল, পুনরাবৃত্তি ও অযোগ্য এন্ট্রি চিহ্নিত করা।
এই প্রক্রিয়ায় অনুপস্থিত, স্থানান্তরিত, মৃত এবং ডুপ্লিকেট ভোটারদের নাম চিহ্নিত করা হতে পারে। তবে কোনও নাম চিহ্নিত করা এবং চূড়ান্ত তালিকা থেকে তা বাদ দেওয়ার মধ্যে প্রক্রিয়াগত পার্থক্য রয়েছে। প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ভোটাররা তাঁদের তথ্য যাচাই বা সংশোধনের সুযোগ পেতে পারেন।
বিতর্কের মূল বিষয় হল, ভোটার তালিকা সংশোধন এবং নির্বাচনী স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া কীভাবে কার্যকর করা হচ্ছে। BJP-র বক্তব্য, এই উদ্যোগের লক্ষ্য ভোটার তালিকা সংশোধন করা। অন্যদিকে, কংগ্রেস প্রক্রিয়াটির বাস্তবায়ন এবং রাজনৈতিক ব্যবহারের বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
SIR নিয়ে জেপি নাড্ডা এবং মল্লিকার্জুন খাড়গের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে BJP ও কংগ্রেসের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য আবারও সামনে এসেছে। BJP কংগ্রেসের অভিযোগকে ভুল ও বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করেছে। অন্যদিকে, কংগ্রেস ভোটারদের অধিকার এবং গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
আগামী দিনে এই বিতর্কের কেন্দ্রে থাকতে পারে নির্বাচন কমিশনের সংশোধন প্রক্রিয়া, ভোটার তালিকার পরিসংখ্যান এবং রাজনৈতিক দলগুলির প্রতিক্রিয়া। বর্তমানে উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে।












