বৈশ্বিক বাণিজ্য সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ভারত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে একাধিক বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করেছে। এই চুক্তিগুলোর মাধ্যমে ভারত তার কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান জোরদার করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পাদিত বাণিজ্য চুক্তিটি তাৎক্ষণিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি। এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ফারওয়া আমেরের মতে, এই বাণিজ্য আলোচনা দীর্ঘ সময় ধরে চলছিল এবং উভয় দেশের মধ্যে একাধিক দফায় আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে সময় লেগেছে এবং এই প্রক্রিয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সম্প্রতি সম্পন্ন হওয়া একটি বড় বাণিজ্য চুক্তির পর যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলে পরিবর্তন দেখা যায় বলে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন। কিছু বিশ্লেষক এই চুক্তিকে “মাদার অফ অল ডিলস” বলে উল্লেখ করেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত ও অর্থনৈতিক দিক থেকে ক্ষতির আশঙ্কা করে দ্রুত ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা চূড়ান্ত করেছে বলে মত দেওয়া হয়েছে।
ফারওয়া আমের এই চুক্তির সময় নির্ধারণকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, ভারত-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির পরপরই ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির বাস্তবায়ন শুরু হওয়া থেকে বোঝা যায় যে বৈশ্বিক শক্তিগুলো ভারতের বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এমন পরিস্থিতি এড়াতে চেয়েছে যাতে ভারত ইউরোপের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে রাশিয়া সম্পর্কিত ভারতের অবস্থানও আলোচনায় এসেছে। ফারওয়া আমেরের মতে, রাশিয়া ভারতের জন্য একটি সংবেদনশীল বিষয়। ভারত তার তেল আমদানি কাঠামোতে পরিবর্তন এনে রাশিয়া থেকে তেল কেনা কমিয়েছে, তবে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে ছিন্ন করতে চায় না। এটি ভারতের বহু-মুখী কূটনৈতিক নীতির প্রতিফলন, যেখানে দেশটি কোনো একটি জোটের ওপর নির্ভরশীল থাকে না।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ ওয়েন্ডি কাটলারের মতে, এই বাণিজ্য চুক্তির ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের অবস্থান আরও স্পষ্ট হবে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের তুলনায় ভিন্ন শর্তে একটি চুক্তি পেয়েছে। এর ফলে আঞ্চলিক নেতৃত্বের পাশাপাশি বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে ভারতের ভূমিকা বৃদ্ধি পাবে।

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে। প্রযুক্তি, উৎপাদন, প্রতিরক্ষা ও সরবরাহ শৃঙ্খলসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন পর্ব শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহল জানিয়েছে।
নীতি আয়োগের সদস্য অরবিন্দ বিরমানি এই প্রেক্ষাপটে বলেছেন, আত্মনির্ভর ভারতের অর্থ একা চলা নয়। তার মতে, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি প্রতিযোগিতামূলক একীভূকরণের জন্য প্রয়োজনীয়। তিনি বলেছেন, সহযোগিতার জন্য উভয় পক্ষের অংশগ্রহণ জরুরি এবং এই ক্ষেত্রে দ্বিতীয় পক্ষও এগিয়ে এসেছে।
অরবিন্দ বিরমানির মতে, এই চুক্তি ভারতের রপ্তানি, বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এর ফলে ভারতীয় কোম্পানিগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়বে এবং বৈদেশিক বিনিয়োগে গতি আসবে। তিনি বলেন, ভারত এখন সুরক্ষাবাদী নীতির বাইরে এসে উন্মুক্ত বাণিজ্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, ভারত ইতোমধ্যে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করেছে এবং অন্যান্য কয়েকটি দেশের সঙ্গে আলোচনা অগ্রসর পর্যায়ে রয়েছে। এসব চুক্তির লক্ষ্য অধিকাংশ পণ্যের ওপর শুল্ক হ্রাস বা বিলোপ করা।
নীতি আয়োগের সদস্য সেমিকন্ডাক্টর ও বিরল খনিজ সম্পদের ওপর সরকারের বিশেষ গুরুত্বের কথাও উল্লেখ করেছেন। তিনি এগুলোকে কৌশলগত অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মধ্যে এসব খাতে ভারতের সক্রিয় নীতিকে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।










