ইরান হরমুজ প্রণালী খোলার প্রস্তাব দিলেও পারমাণবিক সমঝোতা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অস্বীকৃতি

ইরান হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালুর প্রস্তাব দিয়ে সামুদ্রিক অবরোধ প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে, তবে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতা ছাড়া তা প্রত্যাখ্যান করেছে। উভয় পক্ষের অবস্থান ভিন্ন থাকায় কূটনৈতিক অচলাবস্থা অব্যাহত রয়েছে।

ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সামনে একটি নতুন প্রস্তাব উপস্থাপন করে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া এবং সামুদ্রিক অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতা ছাড়া এ প্রস্তাব গ্রহণ করা সম্ভব নয়, যার ফলে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইরান প্রথমবারের মতো ইঙ্গিত দিয়েছে যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলতে তারা প্রস্তুত থাকতে পারে। তবে এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান আলোচনা ও নির্ধারিত শর্তের ওপর নির্ভরশীল হবে। নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনজন ইরানি কর্মকর্তা এই সম্ভাব্য প্রস্তাবের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে আহ্বান জানিয়েছে যে তারা যেন অঞ্চলে আরোপিত সামুদ্রিক অবরোধ প্রত্যাহার করে, যাতে আন্তর্জাতিক তেল ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পারে।

ইরানের নতুন কূটনৈতিক প্রস্তাবে তিনটি প্রধান শর্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের অবসান এবং ভবিষ্যতে হামলা না করার নিশ্চয়তা প্রদান। দ্বিতীয়ত, সামুদ্রিক অবরোধ তুলে নিয়ে হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করা। তৃতীয়ত, এর পর পারমাণবিক কর্মসূচি ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা শুরু করা। ইরানের অবস্থান অনুযায়ী, প্রথমে আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, এরপর পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনা সম্ভব।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার প্রশাসন এই প্রস্তাব গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সিএনএন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষের মত অনুযায়ী, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সমাধান ছাড়া সামুদ্রিক অবরোধ প্রত্যাহার করা হলে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দুর্বল হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, নিরাপত্তা ও পারমাণবিক কর্মসূচি—উভয় বিষয়ের সমাধান একসঙ্গে হতে হবে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রধান বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু পারমাণবিক কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, ইরান অন্তত ২০ বছরের জন্য তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত রাখবে এবং প্রায় ৪৪০ কিলোগ্রাম সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে হস্তান্তর করবে। ইরান এই দাবিগুলোকে অতিরিক্ত এবং অযৌক্তিক বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।

এর আগে ইরান একটি প্রস্তাবে জানিয়েছিল যে পাঁচ বছর পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখা হবে এবং পরবর্তী পাঁচ বছর সীমিত বেসামরিক ব্যবহারের অনুমতি থাকবে। এছাড়া ইউরেনিয়াম মজুদ কমানো এবং তার অর্ধেক রাশিয়ার কাছে হস্তান্তরের কথা বলা হয়েছিল, বাকি অর্ধেক ইরানে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। এই প্রস্তাব ২৬ এপ্রিল পাঠানো হলেও যুক্তরাষ্ট্র তা গ্রহণ করেনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান তাদের কৌশলে পরিবর্তন আনছে এবং নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রথমে যুদ্ধ ও উত্তেজনা হ্রাসে জোর দিচ্ছে, এরপর পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল বিষয়গুলো আলোচনায় আনতে চায়। তবে যুক্তরাষ্ট্র ২৭ এপ্রিল এই সংশোধিত প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেছে।

এই পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও প্রকাশ পেয়েছে। রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পদক্ষেপের সমালোচনা করে একে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য গুরুতর বলে উল্লেখ করেছে। ফ্রান্স জানিয়েছে, আলোচনায় অগ্রসর হতে ইরানকে তাদের অবস্থানে নমনীয়তা আনতে হবে। জার্মানি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছে, ওয়াশিংটন এই পরিস্থিতিতে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমান সামুদ্রিক অবরোধের ফলে ইরানের তেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত হয়েছে। একটি ডেটা অ্যানালিটিক্স সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ইরানের কাছে প্রায় ২২ দিনের তেল মজুদ অবশিষ্ট রয়েছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ইরানকে উৎপাদন কমাতে হতে পারে, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তেলের কূপগুলোর ওপর পড়তে পারে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সম্প্রতি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এই বৈঠকে দুই দেশ কৌশলগত অংশীদারিত্ব এবং বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছে। ইরান রাশিয়ার সমর্থনকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারের কথা জানিয়েছে।

 

Leave a comment