যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার জবাবে উপসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করার সতর্কবার্তা ইরানের, হরমুজ প্রণালী নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা জোরদার

অঞ্চলের কৌশলগত জ্বালানি স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরান, ওমান ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও আলোচনায় অগ্রগতির দাবি করেছেন।

ইরান সতর্ক করে দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবারও তাদের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর সামরিক হামলা চালায়, তাহলে তারা পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলগত জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করবে। ইরানের মতে, সম্ভাব্য পাল্টা পদক্ষেপের আওতায় তেল উৎপাদন কেন্দ্র, রিফাইনারি, বিদ্যুৎ গ্রিড এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো থাকতে পারে। এই বক্তব্যের পর বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেও ইরান জানিয়েছে, তাদের প্রথম অগ্রাধিকার এখনও কূটনৈতিক সমাধান। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে অঞ্চলে উত্তেজনা কমানো এবং যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক পদক্ষেপ থেকে বিরত রাখতে চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন।

ইরানের বক্তব্য অনুযায়ী, আলোচনার পথ খোলা থাকলে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত এড়ানো সম্ভব। তবে দেশটি আরও বলেছে, তাদের ওপর হামলা হলে তার জবাব আগের তুলনায় আরও বিস্তৃত ও কার্যকর হবে।

আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে সৌদি আরবও মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলে সামরিক পদক্ষেপ এড়িয়ে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলের অধিকাংশ দেশ বড় ধরনের যুদ্ধ এড়াতে চায়, কারণ এর সরাসরি প্রভাব বৈশ্বিক তেল সরবরাহ, বাণিজ্যিক সমুদ্রপথ এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির ওপর পড়তে পারে।

এদিকে হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে ইঙ্গিত মিলেছে। দুই দেশ জাহাজের নিরাপদ চলাচলের জন্য নতুন সামুদ্রিক পথের কাঠামো নিয়ে ঐকমত্যের ইঙ্গিত দিয়েছে এবং একটি যৌথ ঘোষণার প্রস্তুতি চলছে।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থার উদ্দেশ্য বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি নৌপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা। তবে নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে এখনও মতপার্থক্য রয়েছে। ইরান চায় জাহাজগুলো তাদের তত্ত্বাবধানে থাকা পথ ব্যবহার করুক, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়ার পক্ষে নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনায় ইতিবাচক অগ্রগতি হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হরমুজ-সংক্রান্ত চুক্তির অবস্থান আরও স্পষ্ট হতে পারে।

ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরান আলোচনা করতে চায় এবং তার মতে, একটি চুক্তি দুই দেশের স্বার্থেই হবে। তিনি আরও বলেন, সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে তিনি কূটনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দেন।

একটি জনসম্মুখের অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, তিনি যুদ্ধ চান না এবং মানুষের জীবন রক্ষার জন্য আলোচনাকেই উত্তম বিকল্প মনে করেন। তবে তিনি আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র একটি বড় সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিল, কিন্তু পরে আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেলে বা হরমুজ প্রণালীতে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশ্বের সামুদ্রিক তেল বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়ে পরিচালিত হয়। ফলে সামরিক সংঘাত বা নিরাপত্তা সংকট দেখা দিলে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়তে পারে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল প্রভাবিত হতে পারে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতা শুধু আঞ্চলিক দেশগুলোর জন্য নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে একটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় যুক্তরাষ্ট্র তাদের উন্নত THAAD ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রায় ৮০ শতাংশ ইন্টারসেপ্টর এবং প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার প্রায় অর্ধেক ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করেছে। তবে এই দাবির স্বাধীনভাবে নিশ্চিতকরণ হয়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি অঞ্চলে সামরিক তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে সহিংসতা কমে আসার পর লেবাননে বাস্তুচ্যুত ৮ লাখেরও বেশি মানুষ নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে গেছেন। তবুও বিপুল সংখ্যক মানুষ এখনও ত্রাণশিবির বা অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টার দিকে আন্তর্জাতিক মহলের নজর রয়েছে। হরমুজ প্রণালী নিয়ে চুক্তি হলে তা সামুদ্রিক বাণিজ্যে স্বস্তি আনতে পারে এবং দুই দেশের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি ও অন্যান্য বিরোধপূর্ণ বিষয় নিয়ে পরবর্তী আলোচনার পথ উন্মুক্ত হতে পারে।

অন্যদিকে, ইরানের কঠোর সতর্কবার্তা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আলোচনা ব্যর্থ হয়ে সামরিক পদক্ষেপ হলে তার প্রভাব শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈশ্বিক তেল বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপরও পড়তে পারে।

 

Leave a comment